গল্প: নোলক

রাজারাম তুই কি মন বুঝবার পারোস? ক তো আমার মন অহন কি চাইতাছে? প্যাকপ্যাক কন্ঠে কি কয় রাজাহাঁস, তা বুঝতে বুঝতেই পোস্টমাস্টার সাইকেলের ক্রিংক্রিং শব্দ করে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে।
কোহিনূর এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে খামটা নেয়। পোস্টমাস্টার গটগট শব্দ করে সাইকেল চড়িয়ে চলে যায় দৃশ্যসীমার বাইরে।
কোহিনূরদের ঘরের সাথে লাগোয়া জাম্বুরা গাছটিতে এবার বেশ ফুল ধরেছে। দুপুরের তপ্ত রোদে যখন বাড়ি খাঁ খাঁ করে, তখন পুরো উঠোন মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে। কোহিনূর বারান্দার জলচৌকির ওপর বসে খামের ভাঁজ খুলে চিঠি পড়তে শুরু করে।
রুইতন চিঠি পাঠিয়েছে। বিদেশ যাওয়ার কয়েকদিন আগেই কোহিনূরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু এখনো তাকে শ্বশুরবাড়িতে তুলে নেয়নি। চিঠির কাগজে মুখ এনে কোহিনূর যেন রুইতনের শরীরের গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করে।
লাঠি ভর করে কোহিনূরের বৃদ্ধা দাদি এসে পাটাতনে বসে। কোহিনূর বোবা দাদিকে খুশিতে জানান দেয় রুইতন চিঠি পাঠিয়েছে সামনে বড় ঈদেই রুইতন দ্যাশে এসে কোহিনূরকে শ্বশুর বাড়ি উঠিয়ে নিয়ে যাবে।কোহিনূর আনন্দে গড়াগড়ি খায়। দাদি ছলছল চোখে তাকায় তার দিকে।
মা মরা কোহিনূরের এই দাদিই সুখে দুঃখের সঙ্গি।ছোট্ট ভাই সজল পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে সারাদিন টু টু করে বেড়ায়, বাজানের সাথেও কাজে যায়না।বাজান যে কত করে তারে কয়,অথচ কে শুনে কার কথা।
কোহিনূর খুশিতে বাড়িঘর ঝাট দেয়, বসন্তের কোকিল ডেকে যায় উঠানের শেষ কোনার বেল গাছটায় বসে।কোহিনূর খুশির খবর তাকেও শুনায়।রুইতনের জন্য শীমের দানা শুকিয়ে রাখে,নিজেদের জমিতে চাষ করা আতপ চাল কলসি ভরে রাখে,কুমড়ো বড়ি বানিয়ে শুকায় আবার সিরিজ পিঠা, সাজের পিঠা বানায়,রুইতন
আসলেই যেনো ভেজে দিতে পারে।সজলকে দিয়ে শাশুড়ীর জন্য ফিরোজা রঙ্গের শাড়ি,পান খাওয়ার জন্য সুপারি, গাছের পাকা পেঁপে আর মুরগির জোল রান্না করে তাদের খোঁজ নেয় কোহিনূর।
শাশুড়ীও ফিরতি কত কি দিয়ে দেয়।কোহিনূর সেইগুলি দাদিরে দেখায় আনন্দে পুলকিত হয় তার দেহ মন।কনু চাচার মেয়ে রূপালি আসে তার সাথে কথা বলতে, তার কানে কথা পাড়ায় কোহিনূর, রুইতন আসবে।একটা ক্যালেন্ডার আইনা দিতে কয় তারে।
ঘরের ক্যালেন্ডার সজল ছিড়ে ঘুন্ডি না কি বানাইছে।রূপালি ক্যালেন্ডার দিয়ে গেলে কোহিনূর ক্যালেন্ডারে দাগ কেটে রাখে।বাপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কৌচায় জমা করে। দুই তিনটা ছাত্র পড়ায় আর হাঁস মুরগী বাড়িয়ে পালে যেনো রুইতন জামাই আদর থেকে বঞ্চিত না হয়। কোহিনূরের মা বেঁচে থাকলে এমন চিন্তা আর করতে হতোনা তার।
কোহিনূর ক্যালেন্ডারের দিকে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকায় এই রমজান ঈদের পরেই বড় ঈদ আসবে। আর মাত্র দুই তিন মাস তারপর স্বামীর সংসারে যাবে কোহিনূর।
এর মাঝে বেশ কদিন কেটে যায় রুইতনের চিঠি আসেনা।তবে তা নিয়ে তেমন চিন্তা করে না কোহিনূর। ভাবে হয়ত বাড়ি আসার চিন্তায় চিঠি লেখার সময় পায়না রুইতন।
একদিন সজলকে নিয়ে উপজেলার বড় মার্কেটে গিয়ে একটা সাইকেল কিনে নিয়ে আসে কোহিনূর। মায়ের গলার সোনার হার বেচে দেয় সে।তবুও রুইতনের কথা ভেবে আত্মতৃপ্তি আসে তার।
সজলকেও ধরতে দেয়না এই সাইকেল। অতিযত্নে রেখে দেয় সে, কোনো ধূলিবালি জমতেই দেয়না।তা নিয়ে কয়েকবার যে সজলের সাথে তার ঝগড়া হয়ে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছে সে।
রোজার ঈদ শেষ হয় কোহিনূরের ভেতরে কেমন যেনো করে এই বুঝি রুইতন এলো বলে।এর মাঝে সজলকে কয়েকবার শ্বশুর বাড়িতে পাঠায় কোহিনূর তাদের খোঁজ খবর নিতে।
বড় ঈদের এক সাপ্তাহ বাকি আর। কোহিনূরের ঘুম আসেনা কখন আসবে রুইতন কিংবা একটা চিঠি যদি সে দিতো কয় তারিখ আসবে বলে। ঘর থেকে বের হতে পারে না কোহিনূর, গ্রামের মানুষ সব্বাই জেনে গেছে এই গ্রামের জামাই বিদেশ থেকে আসবে।নানান জন নানান কথা শুনায়।কোহিনূর ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়।বড় ঈদ পাড় হয়। কোহিনূরের মন মানেনা।একদিন লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে উঠে।রুইতনের খোঁজ নিতে, গিয়ে দ্যাখে বাড়িতে মহাৎসব চলে। কোহিনূরকে দ্যাখে দুই একজন আড় চোখে তাকায়।কেমন লজ্জায় নুইয়ে পড়ে নতুন বউটির মতো। বাড়ির উঠোনে আসতেই শুনে রুইতনের গলা।গমগম শব্দ করে হাসছে কি নিয়ে।আর তাতেই বুকের ভেতর টা কেমন মোচড় দিয়ে উঠে তার।
রুইতন তাকে দ্যাখে ঘাবড়ে গেলেও কোহিনূর দৃষ্টি চলে যায় তার হাতের দিকে।নতুন মেহেদির রঙ দেখে শিউরে ওঠে কোহিনূর। সে কিছু বোঝার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সদ্য বিবাহিতা এক নারী!
কোহিনূরের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। শ্বশুরবাড়ির উঠোনটা যেন দুলে ওঠে। তার প্রতীক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন নিষ্ঠুর বিদ্রুপ হয়ে ছুটে আসে তার দিকে।

