জুমুআর বয়ান হোক বিষয়ভিত্তিক

ইমরান নাজির , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ৮ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৪৮ বার

সপ্তাহের সর্বোত্তম দিন হল জুমুআর দিন। সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে মানুষ মসজিদে না আসলেও শুক্রবারে সবাই মসজিদে আসে জুমুআর নামাজ পড়তে এবং নামাজের পাশাপাশি খতীব সাহেবের জুমুআর বয়ান শুনতে। অনেকে সমাজের প্রচলিত কোনো ওয়াজ-মাহফিলে না গিয়ে থাকলেও জুমুআর দিন মসজিদের খতীব সাহেবের বয়ান শোনার জন্য আগেভাগে মসজিদে চলে আসে। কিন্তু তারা আশা-ভরসা নিয়ে আসার পর যখন দেখে মসজিদের খতীব সাহেবের বয়ানটা মানসম্মতহীন এবং সময়োপযোগী না তখন তারা হতাশ হয়। ভীষণ কষ্ট পায়। জুমুআ’র দিন মসজিদে আলোচনা বা বয়ান করতে হয় বেশির চেয়ে বেশি আধাঘণ্টা বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। কিন্তু এই অল্প সময়ের আলোচনাটাও যদি খতীব সাহেব সংক্ষিপ্তাকারে বিষয়ভিত্তিক না করেন তাহলে মসজিদের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসল্লিরা আর কোথায় কার কাছে গিয়ে দ্বীনী আলোচনা শ্রবণ করবে? মসজিদের খতীব সাহেব আলোচনার শুরুতে কুরআনুল কারীম থেকে যে আয়াতটা তিলাওয়াত এবং যে হাদীসটা পড়েন, কেবল ঐ হাদীস এবং আয়াতের শানে নুযূল, তাফসীর, প্রেক্ষাপট, আয়াত নাজিল হওয়ার আগে এবং পরের অবস্থা, আয়াত নাজিল হওয়ার পরে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা এবং তাদের মধ্যকার পরিবর্তন, আয়াতের বর্তমান প্রেক্ষাপট কী, আয়াত থেকে উদঘাটিত মাসআলা এবং ফজিলত ইত্যাদি সম্পর্কে মুসল্লীদের সামনে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেন তাহলে আলোচনার সময় ফুরিয়ে যায়। কিন্তু গ্রামগঞ্জের মসজিদের খতীব সাহেবরা তিলাওয়াতকৃত আয়াত এবং হাদীসের বিষয়ভিত্তিক আলোচনা না করে, মনগড়া এবং দ্বীনী বিষয়ে বানোয়াট কথাবার্তা বলে বয়ানের মূল্যবান সময়টা পার করে দেন। এতে করে মসজিদের যুব-শিক্ষিত শ্রেণির মুসল্লীরা হতাশ হন। বয়ানের মধ্যে একবার উত্তর মেরু থেকে এক কথা বলেন, আরেকবার দক্ষিণ মেরু থেকে একটা বলেন! খতীব সাহেব ‘ঠিক’ বলতে বললে মুসল্লীরা ঠিক বলে, তিনি ‘বেঠিক’ বলতে বললে মুসল্লীরাও ‘বেঠিক’ বলে! অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, খতীব সাহেব বলছেন আর মুসল্লিরা শুনছে। খতীব সাহেব জানেন না তিনি কী বলছেন আর মুসল্লীরাও জানে না তারা কী শুনছে! এই হল বর্তমান গ্রামাঞ্চলের মসজিদের খতীব সাহেবদের অবস্থা।
কুরআনুল কারীমের মধ্যে মানবজীবনের বিভিন্ন বিধিবিধান সংবলিত পাঁচশত আয়াত রয়েছে। চাইলে খতীব সাহেবরা এগুলো থেকে এক জুমুআয় একটা আয়াতের তাফসীর করতে পারেন। এতে করে সাধারণ মুসল্লীরাও দ্বীন সম্পর্কে কিছু শিখতে এবং জানতে পারবে। কিন্তু তারা এসব বিষয় নিয়ে মোটেও আলোচনা করছেন না। কেন করছেন না সেটা নিয়ে ভাবা এখন সময়ের দাবি।
আমার মনে হচ্ছে, সময়ের অভাবে হোক কিংবা গাফিলতির কারণে হোক, নিয়মিত তাদের কুরআন-হাদীস অধ্যয়ন করা হয় না বিধায়, তারা জুমুআর বয়ানের মধ্যে এই ডাল থেকে এককথা ঐ ডাল থেকে দুই কথা বলে আলোচনা শেষ করে দেন। বিষয়ভিত্তিক আলোচনা পেশ করতে ব্যর্থ হন। আর জুমুআতে আলোচ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে যদি ঐ বিষয়ের ওপর মোতালাআ তথা অধ্যয়ন করে না আসা হয়, তাহলে তো তিনি মুসল্লীদের সামনে আলোচ্য বিষয়ের ওপর পূর্ণাঙ্গ এবং যথাযথভাবে আলোচনা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হবেন। এটাই স্বাভাবিক। এমনকি মুসল্লীদের সমালোচনা ও অসন্তুষ্টি কুড়াতেও বাধ্য হবেন।
আর সমাজের মানুষদেরকে কুরআন-হাদীস বুঝিয়ে দ্বীনের পথে আনতে হলে জুমুআর দিন মসজিদে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা বা বয়ান পেশ করার কোনো বিকল্প নেই। আর বিষয়ভিত্তিক আলোচনা বা বয়ান করতে হলে অবশ্য খতীব সাহেবদেরও নিয়মিত কুরআন-হাদীস অধ্যয়নের কোনো বিকল্প নেই।
তাই, মসজিদের একজন সাধারণ মুসল্লী হিসেবে জুমুআর দিন মসজিদের খতীব সাহেবদেরকে কুরআন ও হাদীস থেকে তথ্যনির্ভর, বিষয়ভিত্তিক এবং সময়োপযোগী বয়ান করার অনুরোধ জানাই।
লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ সদস্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
