ঈদ ও পারিবারিক বন্ধন
বাংলার দিগন্তজোড়া মাঠের ওপর যখন শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ এক ফালি হাসির মতো ঝুলে থাকে, তখন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে মিলনের এক অমোঘ বংশীধ্বনি। ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আমাদের শেকড়ের টানে ফেরার এক আদিম ব্যাকুলতা, যান্ত্রিক জীবনের ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে আত্মার আত্মীয়দের সান্নিধ্যে অবগাহন করার এক পরম লগ্ন। আমাদের ব্যস্ত জীবনে আমরা একেকজন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে পড়ি, কিন্তু ঈদ সেই বিচ্ছিন্নতার প্রাচীর ভেঙে আমাদের আবার এক করে দেয় এক অভিন্ন প্রীতির বন্ধনে। এই বন্ধন রক্তের, এই বন্ধন স্মৃতির, আর এই বন্ধন পরম মমতার। পরিবারের প্রতিটি মানুষ যখন একসাথে দস্তরখানে বসে, তখন সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে স্বর্গীয়। মা-বাবার স্নিগ্ধ হাসিমুখ আর ছোটবেলার সেই চঞ্চল স্মৃতির ভিড়ে জীবনের সকল ক্লান্তি যেন নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়। ঈদের চাঁদ যেন সেই সংকেত বয়ে আনে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দিনশেষে আমাদের ফেরার একটি জায়গা আছে, যাকে আমরা ‘ঘর’ বলি।
বর্তমানে এই ঘরের টান এতটাই তীব্র যে, প্রতি বছর ঈদের সময় দেশের নাড়ি নক্ষত্র যেন স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানীর দিকে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ঈদে ঢাকা ও এর আশেপাশের শিল্পাঞ্চলগুলো থেকে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামের অভিমুখে যাত্রা করে। গণমাধ্যম এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল জনস্রোতের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সড়কপথে, ২৫ শতাংশ নৌপথে এবং বাকিরা ট্রেন ও অন্যান্য উপায়ে যাতায়াত করে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিভিন্ন বাৎসরিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঈদের আগে ও পরে সাত দিনের এই সংক্ষিপ্ত সময়ে যাতায়াতকারী মানুষের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং এটি প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের ব্যাকুলতা আর শেকড়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসার এক গাণিতিক দলিল।
তবে এই আনন্দের যাত্রার মুদ্রার উল্টো পিঠটি বড্ড করুণ এবং উদ্বেগজনক। প্রতি বছরই ঘরমুখো মানুষের এই ঢল সামলাতে গিয়ে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হয়। সীমিত সামর্থ্যের তুলনায় যাত্রীর চাপ কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় রেলের টিকিট যেন সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়ায়। বাসের কাউন্টারগুলোতে দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর কালোবাজারির দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের আনন্দকে ম্লান করে দেয়। সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো অনিরাপদ যাতায়াত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে, ট্রাকের ওপর কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চে করে মানুষের এই যাত্রা অনেক সময় শেষ হয় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অদক্ষ চালকদের কারণে অকালে ঝরে যায় কত প্রাণ, ভেঙে যায় কত পরিবারের স্বপ্ন। এই সমস্যা সমাধানে সরকারের পরিকল্পিত এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। মহাসড়কগুলোতে লেনের সংখ্যা বাড়ানো, রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নৌপথে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি অবৈধ পরিবহন বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। পরিবহন খাতের আধুনিকায়ন এবং বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে যদি ঢাকার ওপর মানুষের এই অতিনির্ভরতা কমানো যায়, তবেই হয়তো আগামী দিনের ঈদযাত্রা হবে স্বস্তির ও নিরাপদ।
মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের আনন্দ অনেক সময় মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর পকেটের টানাপোড়েনে যেখানে নিত্যদিনের ডাল-ভাত জোগাড় করাই কষ্টসাধ্য, সেখানে নতুন জামা আর সেমাই-চিনির আয়োজন এক বিশাল পরীক্ষার নাম। বাবার মলিন পাঞ্জাবি আর মায়ের পুরোনো শাড়ি যখন হাসিমুখ দিয়ে ঢাকা পড়ে, তখন সেখানে ফুটে ওঠে ত্যাগের এক অনন্য মহিমা। আর্থিক অনটন থাকলেও মনের কোণে জমানো সুপ্ত বাসনা থাকে—অন্তত একবার গ্রামে গিয়ে বুড়ো মা-বাবার পা ছুঁয়ে সালাম করা। শহরের এক চিলতে ভাড়া বাসায় কৃত্রিম আলোর নিচে ঈদ কাটানোর চেয়ে গ্রামের কাদা-মাটির গন্ধ মাখা মেঠোপথে হেঁটে বেড়ানোর আকাঙ্খা বাঙালির অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। সেখানে ডাল-ভাতও যেন অমৃত হয়ে ধরা দেয়, যদি পরিবারের সবাই মিলে একসাথে হওয়া যায়। এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা আর না পাওয়ার বেদনার ওপর যখন পারিবারিক ভালোবাসা জয়ী হয়, তখনই ঈদের প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়।
কিন্তু সবার ভাগ্য সেই পরম আনন্দটুকু বয়ে আনে না। ভিড়ের মিছিলে যখন সবাই আপনজনের কাছে ফেরে, তখন কিছু মানুষ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বা ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে কেবল অন্যদের আনন্দ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কারো পেশাগত দায়িত্বের প্রয়োজনে ঘরে ফেরা হয় না, কেউবা দূর প্রবাসে একাকী নিভৃতে চোখের জল মোছে। আবার এমনও অনেকে আছে যাদের ফেরার মতো কোনো ঘর নেই, নেই কোনো প্রিয় মুখ যে তাদের জন্য পথের দিকে চেয়ে থাকবে। তাদের জন্য এই উৎসব কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র। তবে হে বন্ধু, তোমার যদি ঘরে ফেরা না হয়, তবে মনে রেখো—বিশাল এই আকাশটাই হয়তো তোমার ছাদ, আর পৃথিবীর প্রতিটি আর্ত মানুষই তোমার স্বজন। যাদের ঘর নেই, তাদের হৃদয়ই হোক ঈশ্বরের ঘর। ভালোবাসা তো কেবল চার দেয়ালের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না, তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণায়। তাই এই ঈদে যারা একাকী, তাদের একাকীত্ব যেন সহমর্মিতার আলোয় আলোকিত হয়। মিলনের এই মহোৎসবে কেউ যেন নিজেকে পরিত্যক্ত মনে না করে, কারণ দিনশেষে আমরা সবাই সেই এক পরম সত্তার অভিমুখে ধাবমান যাত্রী। উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি কোণে, মিটে যাক সব ভেদাভেদ।
তানজিম হোসেন
লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইল:01759546060
ই-মেইল:tanjimhossen2705@gmail.com

