শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সংখ্যার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানও কি বাড়ছে?

Author

তোরসা আহমেদ

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৪০ বার

২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬০ এর অধিক। বলতেই হয়, আমাদের এই উন্নয়নশীল দেশে আর যাই হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব নেই। রাস্তার পাশে, অলিতে গলিতে কত কত বিশ্ববিদ্যালয়! ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির অবিরাম হর্নের শব্দ, পাশের স্টিলের দোকানে নিরন্তর ধাতুর টং টং শব্দ আর তার পাশেই আছে একটি মস্ত বড়ো সাইনবোর্ড যাতে বড়ো বড়ো করে লেখা “অমুক বিশ্ববিদ্যালয়”। বিষয়টা এমন যে একটা সাইনবোর্ড এনে টাঙিয়ে দিলেই সেটা হয় গেলো নতুন এক পাঠদানের জায়গা। সেটি আদৌ পাঠদানের জন্য উপযুক্ত কোনো জায়গা কি না, তা কি কখনো বিবেচনায় আনা হয়? বিবেচনায় আনা হয় কি যে সেই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা আছে কিনা?

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোই কি একটি জাতির ক্রেডিট হতে পারে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেই কি শিক্ষার গুণগত মান বাড়ে, নাকি কমে? এই বৃহৎ সংখ্যার পেছনে চাপা পড়ে যায় কার্যকরী শিক্ষাব্যবস্থা।

শিক্ষার গুণগত মান নির্ভর করে কিছু বিষয়ের উপর। যেমন : দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, সুসংগঠিত পাঠ্যক্রম, এবং সর্বোপরি একটি সুস্থ পাঠদানের পরিবেশ। কিন্তু যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির ফলে আমরা ভুলেই যাই যে আমাদের জ্ঞানের প্রদীপ গুলো জ্বালানোর, দক্ষ জাতি গড়ার কারিগর আসবে কোথা থেকে, কীভাবেই বা নিশ্চিত হবে সুস্থ পাঠদানের পরিবেশ। এক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত( Student-Teacher Ratio – STR) বিষয়টা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে STR যত কম হবে ততই তা স্ট্যান্ডার্ড হবে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি-এর STR এর হিসাব অনুযায়ী প্রতি ৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন করে শিক্ষক থাকেন। MIT তে প্রতি ৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন করে শিক্ষক থাকেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি তে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন করে শিক্ষক থাকেন।

কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর চিত্র কি এমন? এখানে হাতে গোনা কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এই অনুপাত ৪০ :১ কিংবা ৫০ :১ এ বিদ্যমান। যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি! কেন? কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার তুলনায় আমাদের পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব। আবার বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে দেখা যায় অনেক পদ খালি পড়ে থাকে। ১ জন শিক্ষককে যখন একসাথে ৪০/৫০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাতে হয়, তখন ওই পাঠদান কতটুকু কার্যকরী সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তার ওপর সময়ের স্বল্পতা আর ১ দিনে ৪/৫টা করে ক্লাস তো আছেই। প্রতিটা শিক্ষার্থীর কথা শোনার সময় নেই। আর একজন শিক্ষার্থী স্বাচ্ছন্দ্যে প্রশ্নই বা কীভাবে করবে?

আমাদের গবেষণা খাতে বিনিয়োগ সবসময়ই কম। কারণ আমাদের অর্থের জন্য সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়। তার উপর দিয়ে এই বাড়তি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর বাজেট মেটাতে গিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিষয়টি ভালো ভাবেই পরিলক্ষিত যে, একটি দেশে যথেচ্ছভাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুললে কেবল একটা নয়, অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আবার এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক এর চাহিদা মেটাতে দক্ষ শিক্ষক বাছাই করার প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়। কারণ এখানে দক্ষতার চেয়ে সংখ্যার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এসব শিক্ষক এর ভুল পাঠদানও হতে পারে শিক্ষার্থীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সৃজনশীল মানসিকতা তৈরি এবং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির পথে অন্তরায়। এই পুরো বিষয়টা অনেকটা “Butterfly Effect ” এর মতো কাজ করে।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই জনসংখ্যার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় কম। উদাহরণ স্বরূপ – ফিনল্যান্ড, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর-এর কথা বলা যায়। কিন্তু এসব দেশ QS Ranking এ সবসময় ১-৫ এর মধ্যে থাকে। তারা আমাদের মতো মোড়ে মোড়ে, অলি গলিতে বিশ্ববিদ্যালয় খোলে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দিতে হলে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানই তা পারছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীর কাছে সোনা রুপা দিয়ে পূর্ণ এক খনির মতো। একজন শিক্ষার্থী তা খনন করবে, অন্বেষণ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশাল সমুদ্রের মতো, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ভ্রমণ করবে, অজানাকে জানবে, রহস্যকে উন্মোচন করবে, মননকে বিকশিত করবে। সবাই একই রকম পরিবেশ থেকে উঠে আসে না। স্কুল-কলেজগুলোতে সবাই সমান সুযোগ-সুবিধাও পায় না। অনেকের মধ্যেই বিভিন্নরকম প্রতিভা থাকে কিন্তু সুযোগের অভাবে তা বিকশিত হতে পারে না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার প্রত্যাশা থাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। সুবিশাল সুযোগের জোগান দিয়ে থাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আমরা কি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একজন শিক্ষার্থীর পাঠদানের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারছি? আমরা কি পারছি এই বিশাল সুমদ্রকে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও অন্বেষণময় ক্ষেত্র হিসেবে সাজাতে, যেখানে প্রতিটি আত্মা বিকাশ লাভ করবে?

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!