শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

মসজিদে শিশুদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার অনুচিত

Author

রাইহান উদ্দিন , তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৪৭ বার

রমজান মাস, দুই ঈদ ও জুমার দিনে উৎসবমুখর পরিবেশ পেয়ে বড়দের পাশাপাশি মসজিদে ছুটে আসে শিশু-কিশোররা। পাশাপাশি সচরাচর নামাজে না আসা উঠতি বয়সের কিশোরদেরও দেখা যায় এ সময় মসজিদমুখী হতে। বাবা, দাদা-নানা ও ভাইয়ের হাত ধরে পাঞ্জাবি-টুপি পরে শিশুরা নামাজের জন্য মসজিদে চলে আসে। বাংলার ঐতিহ্যের এটি একটি চোখ জুড়ানো দৃশ্য। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই শিশুদের আল্লাহর ঘরের সঙ্গে পরিচয় করানো ও নামাজের জন্য অভ্যন্ত বানানো নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কেননা শিশুকালে যে জিনিসে অভ্যাস হয়, পরে তা করা সহজ হয়। এ জন্যই হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা তোমাদের বাচ্চাদের সাত বছর বয়স থেকেই নামাজের নির্দেশ দাও। আর যখন ১০ বছর বয়সে উপনীত হবে, তখন তাদের নামাজে অবহেলায় শাস্তি প্রদান করো।’ (আবু দাউদ ৪৯৫)

কিন্তু সমাজের অধিকাংশ বয়োবৃদ্ধ মুসল্লিদের মাঝে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, শিশুদের মসজিদে নেওয়া যাবে না কিংবা নেওয়া গেলেও তাদের সবার পেছনে দাঁড় করাতে হবে। তারা যদি কখনো দুষ্টুমি করে তবে তাদের কঠোর ভাষায় ধমকাতেও দেখা যায় অনেককে। এই কোমলমতি শিশুদের সঙ্গে এমন রূঢ় আচরণের ফলে মসজিদের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়। আর অভিভাবকরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান। অথচ হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববিতে নামাজ আদায়রত অবস্থায় তার নাতিন্বয় হাসান ও হুসাইন (রা.) তার ঘাড়ে চড়ে বসতেন। এমনকি তাদের এ খেলায় যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সেই কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদায় বিশেষ সময় অতিবাহিত করতেন। সাহাবিরাও তা প্রত্যক্ষ করতেন।

তবে শিশুদের মসজিদে নেওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়ত নির্ধারিত কিছু নিয়ম-নীতি রয়েছে। একেবারে অবুঝ শিশুদের মসজিদে আনা নিষেধ। যেমন-তিন-চার বছরের বাচ্চা। এসব বাচ্চারা লাফালাফি, সৌড়াদৌড়ি, নামাজির সামনে দিয়ে অতিক্রম, পেশাব-পায়খানা ইত্যাদি করে মসজিদের আদবের খেলাফ করে। এ কারণেই তাদের ব্যাপারে হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন। হজরত ওয়াসিলা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের মসজিদকে অবুঝ শিশু ও পাগলদের থেকে দূরে রাখো, তদ্রূপ ক্রয়-বিক্রয়, বিচার-আচার, উচ্চস্বর, দণ্ডদান ও তরবারি কোষমুক্ত করা থেকে বিরত থাকো।’ (ইবনে মাজাহ ৭৫০)

বুঝ হয়েছে, এমন নাবালেগ শিশুদের ব্যাপারে বিধান হলো, যদি শিশু একজন হয়, তাহলে তাকে বড়দের কাতারেই সমানভাবে দাঁড় করাবে। এ ক্ষেত্রে বড়দের নামাজের কোনো অসুবিধা হবে না। একাধিক শিশু হলে সাবালকদের পেছনে পৃথক কাতারে দাঁড় করানো সুন্নত। তবে হারিয়ে যাওয়া বা দুষ্টুমি করার আশঙ্কা হলে, বড়দের কাতারেও মুসল্লিদের মাঝে মাঝে দাঁড়াতে পারবে। (আল-বাহরুর রায়েক ১/৬১৮)

অনিয়মিত উঠতি বয়সী কিশোরদের একটা অংশ নামাজে সঠিক নিয়ম-কানুন এবং মসজিদের আদব না জানার কারণে তাদেরকে অনেক সময় নামাজের মধ্যে হাসাহাসি বা বাচ্চাদের মতো ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। মসজিদে ছোটরা বা নিয়ম-কানুন না জানা কিশোররা এলে দুষ্টুমি করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই তারা নামাজে এলে তাদেরকে পাশে নিয়ে নামাজে দাঁড়ান, তাদের আলাদাভাবে দাঁড়াতে দেবেন না। তারা আলাদাভাবে দাঁড়ালে দুষ্টুমি করবে, বড়দের সঙ্গে একত্রে দাঁড়ালে দুষ্টুমি করার সুযোগ পাবে না। সেই সঙ্গে তাদের আদর-স্নেহ দিয়ে বুঝিয়ে বলুন, মসজিদে হাসাহাসি-দুষ্টুমি করলে মসজিদের পবিত্রতা এবং মুসল্লিদের মনোযোগ নষ্ট হয়। দেখবেন তারা চুপ থাকবে। আমরা তা না করে উল্টো তাদের ধমক দিই, কখনো বা মসজিদ থেকে তিরষ্কার করে বের করে

দিতেও দেখা যায়। এতে শিশু-কিশোররা মসজিদ বিমুখ হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ছোটদের দয়া আর বড়দের শ্রদ্ধা করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত না। (সহিহ মুসলিম) তুরস্কের অধিকাংশ মসজিদগুলোতে একটা কথা লেখা আছে। কথাটি হলো ‘জনাব, নামাজ পড়ার সময় যদি পেছনের সারি থেকে বাচ্চাদের হাসির শব্দ না আসে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাপারে ভয় করুন।’

শিশু-কিশোররা অনুকরণকারী হয়ে থাকে। তাই আমাদের উচিত হবে শিশু বয়স থেকেই তাদের ভালো বিষয়ে অভ্যাস গড়ে তোলা। তাহলেই তারা বড় হয়ে একজন সৎ মানুষ ও খোদাভীরু হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

সবকিছুর পর আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কেমন প্রজন্ম রেখে যেতে চাই। যে শিশু আজ মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে ইমামের তাকবির শুনছে, কাল সেই হবে কাতারের অগ্রভাগের মুসল্লি। আজ যে কিশোর অপ্রস্তুতভাবে দাঁড়িয়ে নামাজের নিয়ম শিখছে, আগামী দিনে সেই সমাজকে পথ দেখাবে। তাই তাদের ভুলকে সম্ভাবনা হিসেবে ভেবে দেখাই আমাদের দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন আমাদের সামনে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। তিনি শিশুদের দূরে ঠেলে দেননি, বরং স্নেহ দিয়ে কাছে টেনেছেন। মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থান নয়, এটি চরিত্র গঠনের পাঠশালা। সেখানে শিশুরা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, তবে তা ভবিষ্যতের ইমানি দৃঢ়তায় রূপ নেবে। কঠোরতা নয়, প্রজ্ঞা। বিরক্তি নয়, ভালোবাসা। তিরস্কার নয়, সহমর্মিতা। এই হোক আমাদের আচরণ। তাহলেই মসজিদভিত্তিক এক সুস্থ, খোদাভীরু ও সুশৃঙ্খল প্রজন গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!