বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

হারিয়ে যাচ্ছে শহরের মানবতা

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ পাঠ: ১৪ বার

ভোর শহর জেগে ওঠে ইঞ্জিনের গর্জনে, গাড়ির হর্নে, মানুষ ছুটে যায় অফিসে, বাজারে, স্কুলে। সবাই ব্যস্ত, তাড়াহুড়া করে চলছে কোনো লক্ষ্যের যাত্রায়। একসময় এই শহরগুলো ছিল মানুষের মিলনের জায়গা, পাড়ার আড্ডা, বাড়ির পাশের প্রতিবেশী, একে অপরের খোঁজ নেওয়া, এক কাপ চা ভাগাভাগি করা ছিল প্রতিদিনের রুটিন। কিন্তু এখন শহর যেন ইস্পাতের এক অরণ্য; দালান বেড়েছে, মানুষ ছোট হয়ে গেছে। এ শহরে আজ আলো আছে, শব্দ আছে, কিন্তু মানবতার উষ্ণতা ক্রমেই নিভে যাচ্ছে।

শহর একসময় ছিল মানুষের তৈরি সমাজ, এখন তা হয়ে গেছে মানুষের তৈরি মেশিন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তির বিকাশ আর প্রতিযোগিতার চাপ শহরকে পরিণত করেছে ‘বেঁচে থাকার জায়গায়’। মানুষ এখন আর মানুষ নয়, বরং একটি উৎপাদনশীল ইউনিট, যার মূল্য তার পেশা, পদ বা আয় দিয়ে মাপা হয়।

সামাজিক সম্পর্কগুলো এখন লেনদেন নির্ভর। শহরের মানুষ একাকী হয়ে পড়ছে জনসমুদ্রের মাঝেও। জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মূল্যবোধের জায়গায়। আজ কে কত উপার্জন করে, কোন এলাকায় থাকে, কোন গাড়িতে চলে- এসবই তার সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড। মানুষের চরিত্র, সততা বা সহমর্মিতা এগুলো আর তেমন মূল্য পায় না। এই অর্থকেন্দ্রিক সমাজে মানবতা জায়গা হারাচ্ছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক- এই ভার্চুয়াল দুনিয়া মানুষকে দিয়েছে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের সুবিধা, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে বাস্তব সংযোগের উষ্ণতা। শহরের তরুণরা এখন শত শত ‘অনলাইন বন্ধু’র মালিক, কিন্তু একাকীত্বে পাশে বসার মতো মানুষ নেই। অনলাইন সহানুভূতির যুগে সবাই অন্যের দুঃখে মন্তব্য দেয়, কিন্তু নিজের পাশের কষ্টের খবর রাখে না। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে স্ক্রিনের মাধ্যমে, বিচ্ছিন্ন করেছে হৃদয়ের ভাষা থেকে।

শহরের মানসিক ও নৈতিক উন্নয়ন যে সামাজিক সংস্কৃতির অংশ, সেখানে মানসিক উন্নয়ন, যেখানে ভালোবাসা, মায়া, সহানুভূতি, ক্ষমা- এসবই মানবিক গুণাবলি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। মানুষ এখন যন্ত্রের মতো আচরণ করছে। জীবনের চাপ, প্রতিযোগিতা, স্বার্থপরতা- এসবের ভিড়ে মানুষ নিজের ভেতরের মানুষটিকেই হারিয়ে ফেলছে। এ যেন এক অদ্ভুত সামাজিক অবস্থা, যেখানে দয়া আর সহানুভূতি অপ্রয়োজনীয় দক্ষতা হয়ে গেছে।

ফলাফল ভয়াবহ, মানুষ এখন কেবল নিজের জন্য বাঁচে, সমাজের সম্পর্কগুলো ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। সমাজে সহিংসতা, অপরাধ, হিংসা ও উদাসীনতা বাড়ছে। মানসিক রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অনেকে আত্মহত্যা করছে, কেউ মাদক বা ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নিচ্ছে। এর কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি মানবিক শূন্যতা। এ যেন ‘ইমোশনাল ব্যাঙ্করাপ্সি’। মানুষ এখন কেবল তথ্য, কাজ, সামাজিক স্ট্যাটাস- এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, মানবিক অনুভূতিগুলো হারিয়ে ফেলছে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজকে মানবিক শিক্ষা, সহমর্মিতা ও সহানুভূতির চর্চা বাড়াতে হবে। পারিবারিক সামাজিক বন্ধন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, পাঠচক্র- এসব মানুষকে একত্র করবে। নাগরিক পরিকাঠামোয় পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার, খেলার মাঠ, বৃদ্ধাশ্রম, পথচারী পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারে, কথা বলতে পারে, অনুভূতি ভাগাভাগি করতে পারে। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ইতিবাচক গল্প তুলে ধরতে হবে; মানুষের সাহায্যের গল্প, দয়ার গল্প, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর গল্প।

আমরা হয়তো একদিন চাইবো শহর গড়তে, কিন্তু যদি মানবতা না থাকে, তবে সেই শহরও মরুভূমি ছাড়া কিছুই নয়।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!