বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

ভালো গবেষক কখনও বেকার বসে থাকে না

Author

মোফাজ্জল হোসেন , ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৩ বার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ”গোল্ড মেডেলিস্ট” প্রাপ্ত ‘মো. সায়েদুর রহমান’, ছাত্রজীবন থেকেই প্রখর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। বর্তমানে তিনি মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গবেষণা, শিক্ষাদান, একাডেমিক লিডারশিপ এবং খেলাধুলার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র বা রিসার্চ ইন্টারেস্ট হলো- Entrepreneurship, HRM, Workforce Psychology, Burnout, Ethnicity এবং Higher Education in Bangladesh। তিনি বিশ্বাস করেন- “He was born to be a teacher”. তাঁর মতে, ‘গবেষণা শুধু জার্নালে ছাপানোর জন্য নয়। বরং গবেষণা মানুষকে সৎ এবং সমাজকে বুঝতে ও বদলাতে শেখায়।’ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন, ‘মোফাজ্জল হোসেন’
গবেষণা কী ও কত ধরণের হয়ে থাকে?
গবেষণা হল নতুন কিছু আবিষ্কার বা একটি সমস্যাকে গভীরভাবে বোঝার এবং বৈজ্ঞানিক  প্রমাণের ভিত্তিতে তার উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়া। গবেষণা কখনো অনুমান ভিত্তিক না বরং প্রমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিতে সহায়তা করে।
এর ধরন অনেক, তবে সহজে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যদি ভাগ করতে হয়, তাহলে উদ্দেশ্য অনুযায়ী গবেষণা হয় Basic (জ্ঞান বাড়ানোর জন্য) ও Applied (বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য)।
পদ্ধতি অনুযায়ী আছে Qualitative, Quantitative ও Mixed Method গবেষণা। আবার প্রকৃতি অনুযায়ী গবেষণা হতে পারে Exploratory, Descriptive ও Explanatory. সময় অনুযায়ী গবেষণা হল (Cross-Sectional ও Longitudinal)। এক্ষেত্রে আমাদের জেনে রাখা দরকার, অনেক সময় গবেষণা একাধিক ধরনকে সমন্বয় করে এগোয়।
একজন শিক্ষার্থীর গবেষণা কখন থেকে শুরু করা জরুরী?
এ নিয়ে অনেকের অনেক বক্তব্য আছে, তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত- বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম বছর থেকেই। এসময় গবেষণা মানে তখন Top Indexing জার্নাল পেপার লেখা না। গবেষণা মানে হলো- প্রশ্ন করতে শেখা, কেন-কিভাবে হয় এটা ভাবা, বইয়ের বাইরে চিন্তা করা। শুরুটা হতে পারে বই পড়া, প্রবন্ধ বিশ্লেষণ, ছোট অ্যাসাইনমেন্ট বা রিসার্চ-প্রজেক্ট আইডিয়া ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে। অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়- যে ছাত্র অনার্সে গবেষণামুখী হয়, সে মাস্টার্সে গিয়ে অনেক এগিয়ে থাকে। হ্যাঁ, তবে মাস্টার্সে যেয়ে যে কোন শিক্ষার্থীর গবেষণা পাব্লিকেশনে যাওয়া দরকার।
গবেষণায় নতুনদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়?
নান ধরনের সমস্যা- একেক জনের সমস্যা আবার একেক রকম হয়ে থাকে। খুব বাস্তব কথা সহজে যদি বলি- Research Interests এবং Research Gap খুঁজে বের করতে না জানা, ভালো research question না থাকা, Theory ব্যাবহার না করা, ইংরেজি লেখায় ভয়, সঠিক জার্নাল বাছাই করতে না জানা,
রিজেকশন সহ্য করতে না পারা এবং সুপারভাইজারের সঙ্গে কমিউনিকেশন গ্যাপ থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্বাস করুন- আমার নিজের প্রথম দিকের পেপারও বহুবার রিজেক্ট হয়েছে। কিন্তু রিজেকশনই আমাকে একজন ভালো গবেষক বানিয়েছে।
গবেষণায় তথ্য সংগ্রহ ও এনালাইসিসের জন্য কোন কোন টুলস বা কৌশল ব্যবহার করতে হয়?
এটা নির্ভর করে গবেষণার ধরনের উপর। যেমন, যদি কোন গবেষক Quantitative Research করে তাহলে তথ্য সংগ্রহের জন্য কমন হলো- Survey বা Questionnaire। কিন্তু কেউ যদি Qualitative Reserach করে তবে- Interview & Focus Group Discussion (FGD), Observation Secondary Data (Reports, Databases) ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। মাধ্যম হিসেবে গবেষক নিজে যেয়ে অথবা Google Forms বা KoboToolbox ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
আর Data analysis টুলস হিসেবে আমরা গবেষকরা ব্যবহার করি- SPSS, AMOS, SmartPLS, NVivo, Atlas.ti, R এবং Python এরকম আরও অনেক টুল আছে, যা গবেষকের প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে। আর আমি সব সময় শিক্ষার্থীদের এক কথাই বলি- টুলস নয়, গবেষণা প্রশ্নই টুলস নির্বাচন করে।
গবেষণা প্রকাশের নিয়মাবলী কী?
বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের অনেক গবেষক শুধু এই নিয়মাবলীর ভয়েই পেপার সাবমিট করেনা। অনেক নিয়মাবলী মানতে হয় তবে খুব কমন কিছু নিয়ম হলো- ভালো জার্নাল চিনতে শিখতে হবে। গবেষকের গবেষণার টপিক অনুযায়ী জার্নালের Aim & Scope মিলাতে হবে, জার্নালের অথর গাইডলাইনস খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। Plagiarism (SI and Ai index) একেবারে শূন্যের কাছাকাছি আনার চেষ্টা করতে হবে, এবং সব শেষে Reviewer-এর মন্তব্যকে সম্মান করতে হবে। একটা ভালো পেপার লিখতে বেশ  সময় লাগে (১.৫ থেক ৫ বছর পর্যন্ত), তাড়াহুড়া করলে গবেষণা হয় না।
গবেষণার ফলাফল বাস্তব ক্ষেত্রে কীভাবে কাজে লাগে?
গবেষণার ফলাফল বাস্তব জীবনে খুব সহজভাবেই কাজে লাগে। যদিও আমরা অনেক সময় সেটা বুঝে উঠতে পারি না। ধরুন, কোন এলাকায় বেকারত্ব কেন বাড়ছে, শিক্ষার্থীরা কেন পড়াশোনায় পিছিয়ে যাচ্ছে, বা কোন ব্যবসা কেন লোকসানে যাচ্ছে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসে গবেষণা থেকে। গবেষণার ফল দেখে সরকার নীতি বানায়, প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয়, আর মানুষ সমস্যার মূল কারণটা বুঝতে পারে। আমরা তো প্রায় বাংলাদেশ আর মালয়েশিয়ার তফাৎ খুজি- এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র গবেষণার মাধ্যমে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি বা ব্যবসা, সব জায়গায় গবেষণা আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয় এবং  নতুন ওষুধ, উন্নত শিক্ষা পদ্ধতি, লাভজনক ব্যবসার কৌশল- সবই গবেষণার ফল।
সহজ করে বললে, গবেষণা হলো আয়না, যেখানে সমাজ নিজেকে দেখে, ভুল শোধরায় এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়।
সমাজ, নীতিনির্ধারক বা সংশ্লিষ্ট খাতে গবেষণা কীভাবে প্রভাব ফেলে?
গবেষণা ছাড়া নীতি মানে- অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্ত। ভালো গবেষণা সরকারকে ডেটা দেয়,
এনজিওকে দিকনির্দেশনা দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম বদলায়, সমাজের অদৃশ্য সমস্যাকে দৃশ্যমান করে। সমস্যা হলো বাংলাদেশে গবেষণা অনেক সময় নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায় না।
ভালো গবেষক হয়ে ওঠার কৌশল?
এই পথ অনেক দীর্ঘ, কোনো শর্টকাট নেই। তবে কয়েকটা বিষয় আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিৎ, অসম্ভব বলতে কিছুই নেই। যেমন, মোটিভেশান ধরে রাখা,  নিয়মিত পড়া (অন্তত ১ পাতা হলেও), প্রশ্ন করা, ভালো মেন্টর খোঁজা, Rejection কে শিক্ষক বানানো, নৈতিকতায় আপসহীন থাকা। গবেষণা হলো দীর্ঘ জার্নি, ম্যারাথন-স্প্রিন্ট নয়।
গবেষনায় ক্যারিয়ার সম্ভাবনা কেমন?
বর্তমান যুগে সারা বিশ্বে গবেষণা খুব সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার, যদি আপনি ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক, কনসালটেন্সি, পলিসি রিসার্চ, আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট ম্যানেজারসহ আরও অনেক এবং ভারী কিছু পেশা গবেষনার জায়গা। আমিতো বলি- ‘পৃথিবীর ১০০ পার্সেন্ট মানুষই গবেষক- তারমধ্যে ২০% একাডেমিক এবং ৮০% প্রাক্টিক্যাল রিসার্চার।’ সত্যি বলতে,
ভালো গবেষক কখনো বেকার বা বসে থাকে না-সে শুধু জায়গা বদলায়।
নবীন গবেষকদের জন্য আপনার পরামর্শ কি হবে?
বেশিরভাগ সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্ন এটাই থাকে। আমি গবেষণা শিখছি এখনও এবং সেখান থেকে কিছু পরামর্শ শুধু নবীন না সবার উদ্দেশ্যেই বলি- গবেষণাকে ভয় পাবেন না, নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করবেন না এবং রাতারাতি নামকরা হতে চাইবেন না। গবেষণাকে ইবাদতের মতো নিন, একদিন দেখবেন- আপনার লেখা কারো সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে। সেই দিন বুঝবেন, গবেষণা কেন জরুরি।
লেখক: সভাপতি, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!