রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

গুপ্ত রাজনীতি: মুক্তির হাতিয়ার নাকি অন্ধকারের চোরাগলি?

Author

মো হাবিবুল্লাহ বাহার , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৮ বার

গুপ্ত রাজনীতি: মুক্তির হাতিয়ার নাকি অন্ধকারের চোরাগলি? (প্রকাশিত, ২৩ এপ্রিল ২০২৬,খোলা কাগজ)
গোপন রাজনীতি বা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স’ রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের অন্যতম জটিল, রহস্যময় ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়। সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে এবং রাষ্ট্রের কড়া নজরদারি এড়িয়ে পরিচালিত এই রাজনৈতিক ধারা কি সমাজের জন্য সুফল বয়ে আনে, নাকি তা শুধুই ধ্বংস আর নৈরাজ্য ডেকে আনে? রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এই প্রশ্নের কোনো একরৈখিক বা সরল উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির ভালো বা খারাপ হওয়াটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ওই রাষ্ট্রের চরিত্র, সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিবেশ এবং গোপন সংগঠনটির আদর্শ ও কার্যপদ্ধতির ওপর। এটি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা কখনো নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে, আবার কখনো সমাজকে ঠেলে দেয় সহিংসতা, অস্থিরতা এবং অবিশ্বাসের গভীর খাদে।
তাত্ত্বিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির উদ্ভব ঘটে মূলত ‘রাজনৈতিক শূন্যতা’ এবং তীব্র ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন’ থেকে। যখন কোনো রাষ্ট্রে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের সমস্ত বৈধ পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন ভিন্নমতাবলম্বীরা বাধ্য হয়ে আত্মগোপনে যায়। বিপ্লবী তত্ত্বে কার্ল মার্ক্স শ্রেণিসংগ্রামের কথা বললেও, এটি সুসংগঠিত রূপ পায় ভ্লাদিমির লেনিনের হাতে। লেনিন তাঁর “What Is to Be Done?” গ্রন্থে যে ‘ভ্যানগার্ড পার্টি’ বা অগ্রগামী দলের ধারণা দেন, তা মূলত একটি কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার বিপ্লবীদের দল যারা রাষ্ট্রীয় দমন এড়িয়ে গোপনে সংগঠিত থাকবে এবং উপযুক্ত সময়ে বিপ্লব সংঘটিত করবে। এখানে গোপনীয়তা কেবল কৌশল নয়, বরং টিকে থাকার মূল শর্ত। অন্যদিকে, উদার গণতান্ত্রিক তাত্ত্বিকরা এই ধারণার ঘোর বিরোধী। তাত্ত্বিক হান্না আরেন্ট রাজনৈতিক কর্মকে উন্মুক্ত পরিসরের (Public Space) সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, রাজনীতি হলো প্রকাশ্য দরকষাকষি, মতবিনিময় ও সমঝোতার জায়গা; সেখানে গোপনীয়তা মানেই হলো জনগণের প্রতি আস্থার চরম অভাব এবং জবাবদিহিতার মৃত্যু।
তবে ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, চরম সংকটময় মুহূর্তে এই গোপন রাজনীতিই নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অন্যতম প্রধান উপায় বা প্রয়োজনীয় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। যখন রাষ্ট্র চরম স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট বা ঔপনিবেশিক রূপ ধারণ করে এবং বৈধভাবে কথা বলার কোনো সুযোগই থাকে না, তখন এটি প্রতিরোধ গড়ে তোলার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফ্রান্সে গড়ে ওঠা ‘ফ্রেঞ্চ রেসিস্ট্যান্স’ ছিল একটি আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্ট, যা ইতিহাসে অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত। একইভাবে, ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বা ক্ষুদিরাম বসুর সশস্ত্র বিপ্লব ছিল এই আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিরই অংশ। সেসময় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন যখন বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন এই গোপন রাজনীতিই মানুষের মনে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়ে তুলেছিল। এমনকি বর্ণবাদ শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ (ANC) একসময় বাধ্য হয়েই আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়েছিল এবং সশস্ত্র শাখা গঠন করেছিল। এই গোপন প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত অমানবিক বর্ণবাদ অবসানে রাষ্ট্রকে বাধ্য করেছিল।
এই ইতিবাচক উদাহরণগুলোর পাশাপাশি আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির একটি ভয়ংকর অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা বিশেষত যেকোনো গণতান্ত্রিক বা আধা-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমাজের জন্য চরম ক্ষতিকর হতে পারে। প্রকাশ্য রাজনীতিতে নেতাদের প্রতিনিয়ত জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে নেতারা থাকেন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার একেবারেই বাইরে। তাদের কোনো সিদ্ধান্ত ভুল বা জনবিরোধী হলেও সাধারণ মানুষের তা সংশোধন করার কোনো সুযোগ থাকে না। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষ থেকে দূরে থাকতে থাকতে একসময় চরমভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা ‘ইকো চেম্বার’ বা নিজেদের তৈরি ভ্রান্ত ধারণার বৃত্তে আটকা পড়ে এবং জনমানুষের প্রকৃত চাওয়া-পাওয়া বুঝতে ব্যর্থ হয়।
গুপ্ত রাজনীতির এই অন্ধকার অধ্যায়ের আরও কিছু চরম নেতিবাচক কৌশল ও পরিণতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অন্য রাজনৈতিক দল বা সংগঠনে ছদ্মবেশে নিজেদের লোক অনুপ্রবেশ (Infiltration) করানো। তথ্য সংগ্রহ, অন্তর্ঘাতমূলক (Sabotage) কাজ বা অন্যান্য দলের ভেতর ভাঙন ধরানোর উদ্দেশ্যে গুপ্ত দলগুলো মূলধারার সংগঠনগুলোতে নিজেদের গুপ্তচর ঢুকিয়ে দেয়। এটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম অবিশ্বাসের জন্ম দেয় এবং সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ভেতর থেকে বিষাক্ত করে তোলে।
পাশাপাশি, আর্থিক তহবিলের জন্য অপরাধজগতের সাথে আঁতাত গুপ্ত রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা। সংগঠন পরিচালনা ও অস্ত্রশস্ত্রের বিশাল ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে এই দলগুলো অনেক সময় চাঁদাবাজি, অপহরণ, ব্যাংক ডাকাতি বা চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আদর্শিক রাজনীতির সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধজগতের (Organized Crime) একটি অশুভ মিত্রতা তৈরি হয়। এছাড়া, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এরা অনেক সময় সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে**। গুপ্ত আস্তানাগুলো লোকালয়ের ভেতর গড়ে তোলায় রাষ্ট্র যখন এদের দমনে সশস্ত্র অভিযান চালায়, তখন নিরীহ মানুষকে বিনা অপরাধে প্রাণহানি বা হয়রানির মতো চরম মূল্য চোকাতে হয়।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির একটি গভীর ও নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে। যারা দীর্ঘকাল আত্মগোপনে থাকেন, ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতা ও চাপের কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহবাতিকতা বা ‘প্যারানয়া’ কাজ করে, যাকে তাত্ত্বিকরা ‘প্যারানয়েড পলিটিক্স’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারা দলের ভেতরের বা বাইরের সামান্যতম ভিন্নমতও সহ্য করতে পারেন না। ফলে অনেক সময় আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোর ভেতরেই ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী অন্তর্দ্বন্দ্ব বা শুদ্ধি অভিযান (Internal Purge) দেখা যায়। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, যেসব দেশ মূলত আন্ডারগ্রাউন্ড বা সশস্ত্র রাজনীতির মাধ্যমে স্বাধীন বা মুক্ত হয়েছে, পরবর্তীতে সেখানে সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, গোপন রাজনীতির নেতারা প্রকাশ্য যুক্তিতর্ক ও বিতর্কের চেয়ে বলপ্রয়োগ ও একনায়কতন্ত্রে বেশি অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।
পরিশেষে বলা যায়, আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স নিজে থেকে কোনো মহৎ আদর্শ বা ভয়ংকর অপরাধ নয় এটি কেবলই একটি রাজনৈতিক কৌশল বা পদ্ধতি। কোনো দেশে যদি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং মতপ্রকাশের সুযোগ থাকে, তবে সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন দানবে পরিণত হয়, নাগরিকদের সমস্ত মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে বুটের তলায় পিষ্ট করে, তখন এই আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সই হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার শেষ অবলম্বন। তাই তো বলা হয়, “স্বৈরতন্ত্রে যা মুক্তির মশাল, গণতন্ত্রে তা ধ্বংসের দাবানল।” আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির মূল্যায়ন স্রেফ আবেগ দিয়ে নয়, বরং ইতিহাস, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয়েই করা উচিত।
হাবিবুল্লাহ বাহার,নির্বাহী সদস্য, শহী জিয়াউর রহমান হল সংসদ রাকসু।

লেখক: প্রচার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!