রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

যুবশক্তির বিকাশে দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতারও প্রয়োজন

Author

NAZMUL ISLAM FARUQUE

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৩০ বার

যুবশক্তির বিকাশে দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতারও প্রয়োজন

_____ মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ আজ বুঝতে শিখেছে—একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ। সেই উপলব্ধি থেকেই প্রতি বছর ১৫ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস। দিবসটির মূল বার্তা হলো, যুবসমাজকে এমন দক্ষতায় সমৃদ্ধ করা, যা তাদের কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে একটি প্রশ্ন আজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—দক্ষতা কি একাই যথেষ্ট? নাকি দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন নৈতিকতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ?

বাস্তবতা বলছে, দক্ষতার অভাব যেমন একটি জাতিকে পিছিয়ে দেয়, তেমনি নৈতিকতার অভাব দক্ষতাকেও বিপথে পরিচালিত করতে পারে। একজন মেধাবী প্রকৌশলী দুর্নীতিগ্রস্ত হলে উন্নয়নের কাঠামো দুর্বল হয়; একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ যদি প্রযুক্তিকে অপরাধের হাতিয়ার বানায়, তবে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ দক্ষতা তখনই কল্যাণকর, যখন তা নৈতিকতার আলোয় পরিচালিত হয়। এ কারণেই ইসলাম জ্ঞান ও কর্মদক্ষতার পাশাপাশি চরিত্র গঠনকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যার জন্য সে চেষ্টা করে।” (সূরা আন-নাজম: ৩৯)। এই আয়াত মুসলিম যুবকদের কর্মমুখী, অধ্যবসায়ী ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। আবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও উত্তম।” (সহীহ মুসলিম)। এখানে শক্তির অর্থ কেবল শারীরিক সক্ষমতা নয়; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, প্রজ্ঞা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক দৃঢ়তার সমন্বিত শক্তি।

ইসলামের ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, নবীজি (সা.) যুবকদের কেবল অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলেননি; তিনি তাদের ওপর নেতৃত্বের দায়িত্বও অর্পণ করেছিলেন। তরুণ সাহাবিদের শিক্ষা, প্রশাসন, কূটনীতি ও সামরিক নেতৃত্বে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—যোগ্যতা ও চরিত্র থাকলে বয়স কোনো বাধা নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশ আজ এক বিশাল যুবশক্তির অধিকারী। এই জনশক্তি দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা, আবার যথাযথ দিকনির্দেশনার অভাবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও হতে পারে। একদিকে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, অন্যদিকে বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, অনলাইন আসক্তি, ভোগবাদ এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়—যুবসমাজকে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাই কেবল সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, প্রয়োজন কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা, উদ্যোক্তা-মানসিকতা এবং জীবনঘনিষ্ঠ নৈতিক শিক্ষা।

এখানে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি কেবল পরীক্ষার ফলের দিকে নজর দেয়, পরিবার যদি কেবল পেশাগত সাফল্যকে গুরুত্ব দেয় এবং সমাজ যদি চরিত্রের চেয়ে বিত্তকে মূল্যায়ন করে, তবে দক্ষতার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। দক্ষতা তখনই জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়, যখন তা সততা, দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা এবং মানবকল্যাণের চেতনায় পরিচালিত হয়।

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি আমাদের শিক্ষা, উন্নয়ন ও মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। বাংলাদেশের যুবসমাজকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নৈতিক নেতৃত্বেরও অধিকারী হয়। কারণ একটি দক্ষ হাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু একটি দক্ষ ও নৈতিক হৃদয়ই পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে।

আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—দক্ষতা অর্জনের প্রতিটি প্রচেষ্টা হবে সৎ উপার্জন, মানবসেবা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে। দক্ষতা ও নৈতিকতার এই যুগলবন্দিই হতে পারে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

লেখক: সদস্য।
লিংক কপি হয়েছে!