কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চড়া মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি
AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির জগতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন থেকে শুরু করে জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সব ক্ষেত্রেই এর অবাধ ব্যবহার আজ দৃশ্যমান। তবে মানবরচিত প্রতিটি বড় আবিষ্কারের মতোই, এআই-এর এই চোখধাঁধানো সুফলের পেছনেও লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়। আর সেই অন্ধকার সবচেয়ে বেশি গ্রাস করছে আমাদের পরিবেশকে।
বর্তমানের ‘জেনারেটিভ এআই’ মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় শত শত কোটি প্যারামিটার যুক্ত কম্পিউটেশনাল শক্তির, যা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি করে। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, মডেলগুলো তৈরি হওয়ার পর প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে লক্ষাধিক ব্যবহারকারীর অনুরোধ প্রসেস করতে ডাটা সেন্টারগুলোতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বৈদ্যুতিক ব্যবহার। ২০২১ সালে গুগল ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু একটি বড় মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতেই যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, তা থেকে প্রায় ৫৫২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়।
বৈদ্যুতিক চাহিদার পাশাপাশি এআই মডেলগুলোর জন্য ব্যবহৃত শক্তিশালী হার্ডওয়্যারগুলো ঠাণ্ডা রাখতে প্রয়োজন হয় কোটি কোটি লিটার পানির। যুক্তরাজ্য সরকারের ডিজিটাল টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একটি ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এআই ডাটা সেন্টার বাৎসরিক প্রায় ২.৫ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করে; যা প্রায় ৮০,০০০ মানুষের বার্ষিক পানির চাহিদার সমান। ‘ডেটা সেন্টার ম্যাপ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বজুড়ে সক্রিয় ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ১১,৬০০ ছাড়িয়েছে। এই ব্যাপক সংখ্যক ডেটা সেন্টারের জন্য পানি ব্যবহৃত হচ্ছে বিপজ্জনক পরিমাণে।
ফলে জলবায়ু সংকটের এই যুগে বৈশ্বিক পানির উৎসের ওপর এটি এক বড় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
একইসাথে এই ডেটা সেন্টারগুলো থেকে নির্গত তাপ স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে; যা আশেপাশের অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান ও জনজীবনকে প্রভাবিত করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্যের মহামারী। এআই ডেটা সেন্টারগুলোর ইলেকট্রনিক বর্জ্যে প্রায়শই পারদ এবং সীসার মতো বিপজ্জনক পদার্থ থাকে। এই পদার্থগুলোর অনুপযুক্ত নিষ্কাশন মাটি এবং জল ব্যবস্থাকে দূষিত করছে।
এআই হার্ডওয়্যার তৈরিতে ব্যবহৃত মাইক্রোচিপগুলোর জন্য প্রয়োজন হয় বিরল খনিজ উপাদান। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) তথ্যমতে, এই খনিজ উত্তোলনে ব্যবহৃত ধ্বংসাত্মক খনি খনন পদ্ধতি মাটি ও পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
এআই আজ মানবজাতির সামনে এক বড় সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, অন্যদিকে পরিবেশগত বিপর্যয়। তবে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের দূরদর্শিতার ওপর। আন্তর্জাতিক মহলে সুস্পষ্ট নিয়ম-কানুন প্রণয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন-কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে এআই-কে একটি পরিবেশগত হুমকি থেকে টেকসই পৃথিবী গড়ার মিত্র হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব।
লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
