মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে?

Author

মোছাঃ মিথিলা খাতুন , সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৪ বার

ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে?
যুদ্ধ কি শুধু পরমাণু অস্ত্র, ড্রোন আর মিসাইল দিয়েই হবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন-না। ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর যুদ্ধটি হতে পারে আমাদের থালার ভাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। অর্থাৎ যে দেশের হাতে খাদ্যের এবং বীজের নিয়ন্ত্রণ থাকবে সেই দেশই শাসন করবে বিশ্বকে। আর এই অদৃশ্য যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কিছু জটিল নিয়মের আড়ালে, যার মধ্যে একটির নাম ট্রিপস বা মেধাস্বত্ব চুক্তি।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে যাচ্ছে। এটি যেমন আমাদের জন্য গর্বের, তেমনই এর সঙ্গে আসছে কিছু বড় আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তি অনুযায়ী, মেধাস্বত্ব বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষার কড়া নিয়মগুলো আমাদের মেনে চলতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে একে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের কৃষি ও বীজের সার্বভৌমত্ব হারানোর এক গভীর ষড়যন্ত্র।
আমাদের কৃষির দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইতিমধ্যে একটি নীরব পরিবর্তন ঘটে গেছে। একসময় হাজার হাজার জাতের দেশি ধান এবং সবজি ছিল। বাজারে আমরা যেসব বড় সাইজের বেগুন, টম্যাটো, শসা বা লাউ দেখি তার প্রায় ৮০-৯০ শতাংশই আসছে হাইব্রিড বীজ থেকে। এমনকি পোলট্রি ও মাছের খাদ্যের প্রধান উৎস যে ভুট্টা তার শতভাগই এখন হাইব্রিড। যদিও বেশি ফলন এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে আমাদের কৃষকরা দেশি বীজ ছেড়ে বহুজাতিক কোম্পানির প্যাকেটের বীজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
সমস্যাটি কেবল একটি বাণিজ্যিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে চলমান সিড পলিটিক্স বা বীজের রাজনীতি। আজ বীজের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে হাতেগোনা তিন-চারটি বহুজাতিক কোম্পানি। এটি এমন এক চতুর সুপরিকল্পিত কর্পোরেট চক্র, যেখানে তারা শুধু বীজ বিক্রি করে না। এমনভাবে বীজের ডিএনএ পরিবর্তন করে, যা কেবল
তাদেরই উৎপাদিত নির্দিষ্ট রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া বাঁচতে পারে না। ফলে কৃষক একবার এই চক্রে ঢুকলে বীজ এবং রাসায়নিক দুটির জন্যই ঐ কোম্পানির ওপর আজীবন নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
সিড পলিটিক্সের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বৈজ্ঞানিক অস্ত্র টার্মিনেটর প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে ল্যাবে তৈরি বীজ থেকে ফসল হলেও, সেই ফসলের ভেতরের বীজটি প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ্যা বা মৃত। বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে এই প্রযুক্তি সরাসরি নিষিদ্ধ হলেও, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো হাইব্রিড বীজের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ঠিক এই কাজটিই করে চলেছে, যা প্রকৃতিগতভাবেই কৃষকের বীজ রাখার এবং বিনিময়ের হাজার বছরের চিরাচরিত অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।
ভবিষ্যতে এই নির্ভরশীলতা কতটা সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে, তা কল্পনাতীত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনগুলোতে আমাদের এমন বীজের প্রয়োজন হবে যা তীব্র লবণাক্ততা বা খরা সহ্য করতে পারে। তখন এই সুপার-বীজগুলোর প্যাটেন্ট বা স্বত্ব যদি শুধু পশ্চিমা কর্পোরেটদের হাতে থাকে, তবে তারা আমাদের জীবন-মরণ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে যে কোনো কঠিন শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে।
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে খাদ্য হয়ে উঠবে একটি ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধাস্ত্র। কোনো দেশ যদি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় কোনো শক্তির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে, তবে বীজ সরবরাহ বন্ধ বা ধীরগতির করে দিয়ে সেই দেশে কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি করা অসম্ভব কিছু নয়। তবে এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের ‘বীজ সার্বভৌমত্ব’ অর্জন করতে হবে। আর এর জন্য প্রথমত, আমাদের সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন: ব্রি (BRRI) বা বারি (BARI)-কে আরো শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের বিজ্ঞানীরা যদি নিজেরাই দেশি জাতের ওপর কাজ করে জলবায়ু-সহিষ্ণু এবং উচ্চফলনশীল এমন বীজ আবিষ্কার করতে পারেন যা থেকে কৃষক নিজেই পরের বছর বীজ সংরক্ষণ করতে পারবেন, তবে কর্পোরেটদের প্যাটেন্ট করা বীজের বাজার এমনিতেই ধসে পড়বে। দ্বিতীয়ত, শুধু ল্যাবে নয়, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কমিউনিটি বীজ ব্যাংক গড়ে তুলতে হবে এবং হারিয়ে যাওয়া দেশি বীজগুলোর একটি সমৃদ্ধ জাতীয় জিন ব্যাংক অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, যেন বীজের জন্য ভবিষ্যতে জিম্মি হতে না হয়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থায় ট্রিপস চুক্তির ভেতরের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিংয়ের মতো আইনি সুরক্ষাকবচগুলো ব্যবহারের পূর্ণ প্রস্তুতি আমাদের নীতিনির্ধারকদের রাখতে হবে।
শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!