তিস্তা মহাপরিকল্পনা কি আলোর মুখ দেখবেই না?
তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন কি আকাঙ্ক্ষাই থেকে যাবে?
মোঃ ফজলুল হক
সময় এখন বর্ষাকাল। এ সময় নদীর থাকার কথা টইটম্বুর পানিতে ভরা, স্রোতের উচ্ছ্বাসে প্রাণবন্ত। অথচ উত্তরবঙ্গের প্রাণ তিস্তার বুকজুড়ে আজও ধু-ধু বালুরচর। বর্ষার মাঝামাঝি সময়েও নদীর এই হাহাকার শুধু একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়, এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং একটি অঞ্চলের মানুষের বঞ্চনার প্রতীক।
তিস্তায় পানি কেন কমে যায়, সেটি উত্তরবঙ্গের মানুষের অজানা নয়। সমাধানের পথও অজানা নয়। বহু বছর ধরে আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনাই হতে পারে নদীশাসন, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের একটি কার্যকর উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সমাধান জানা থাকার পরও বাস্তবায়নের পথে আমরা আর কতদিন অপেক্ষা করব?
তিস্তার মানুষ অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। গত বছর ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে ১০৫ কিলোমিটারজুড়ে মশাল প্রজ্বলন করে তারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। এর আগে ও পরে হয়েছে অবস্থান কর্মসূচি, লংমার্চ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ। এসব কর্মসূচি কোনো রাজনৈতিক প্রদর্শনী ছিল না, এগুলো বেঁচে থাকার আর্তনাদ। কারণ তিস্তার ভাঙন, খরা ও আকস্মিক বন্যার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে এই জনপদের মানুষ।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা, কৃষিতে সেচের সম্প্রসারণ, নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। বহু বছর ধরে এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি আজও দৃশ্যমান নয়।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা চীন সফর করেছেন। সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও চীন সফর শেষ করেছেন। উত্তরবঙ্গের মানুষ আশাবাদী ছিল, বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবার হয়তো নতুন গতি পাবে। কিন্তু সফর শেষে সেই প্রত্যাশার কোনো স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়নি। একইভাবে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জনাব ফখরুল ইসলাম আলমগীর লালমনিরহাট সফর করলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো বক্তব্য বা আশ্বাস মেলেনি। বছরের শুরুতেই কাজ শুরু হওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটিও বাস্তবে রূপ নেয়নি।
আরও বড় প্রত্যাশার জায়গা রয়েছে লালমনিরহাটের সন্তান, ত্রাণমন্ত্রী জনাব আসাদুল হাবিব দুলুকে ঘিরে। তিস্তার দাবিতে যিনি একসময় মশাল মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আজ তিনি সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী। তিস্তাপাড়ের মানুষ তাই তাঁর কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি আশার কথা শুনতে চায়। কারণ তিনি শুধু সরকারের প্রতিনিধি নন, এই জনপদেরও প্রতিনিধি। তাই তাঁর কণ্ঠে তিস্তার দাবি আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হবে এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
উত্তরবঙ্গের গণমানুষের কাছে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নদীভাঙনে প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার ভিটেমাটি হারায়। কেউ ঘর খুলে অন্য চরে নিয়ে যায়, কেউ আশ্রয় নেয় বাঁধের ওপর। কৃষক হারায় ফসল, জেলে হারায় মাছ, শিক্ষার্থী হারায় পড়াশোনার পরিবেশ। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, আবার বর্ষায় নিয়ন্ত্রণহীন বন্যায় শত শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। সীমাহীন আর্থিক ক্ষতি এবং শারীরিক এই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি যেন তিস্তাপাড়ের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্নগুলো তাই অনিবার্য। তিস্তা মহাপরিকল্পনা কি কেবল প্রতিশ্রুতি, সেমিনার, সভা আর মশাল মিছিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? যাঁরা একসময় এই দাবিতে রাজপথে ছিলেন, সরকারে এসেও কি তাঁরা একই দাবির বাস্তবায়নে নীরব থাকবেন? চীন সফরের পরও যদি তিস্তা নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসে, তবে উত্তরবঙ্গের মানুষ আর আশার আলো কোথায় খুঁজবে? বছরের পর বছর ধরে উচ্চারিত এই প্রকল্প কি শেষ পর্যন্ত কেবল আকাঙ্ক্ষাই হয়ে থাকবে?
আমরা বিশ্বাস করি, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। সরকার যদি আন্তরিক রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি নদী নয়, বদলে যাবে পুরো উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা। ভাঙন, খরা ও বন্যার পুনরাবৃত্ত ক্ষতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
উত্তরবঙ্গের মানুষ আর নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চায়। তারা আর অপেক্ষার গল্প শুনতে চায় না, তারা চায় নদীতে প্রাণ ফিরছে, কৃষকের মাঠে পানি ফিরছে, মানুষের জীবনে স্থিতি ফিরছে। বহু বছরের আন্দোলন, বহু বছরের দাবি এবং অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়। তিস্তা বাঁচলেই বাঁচবে উত্তরবঙ্গ।
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
ইমেইল: fozlulhoque880@gmail.com
