ইবি লেখক ফোরামের সঙ্গে এক বিকেল
কিছু বিকেল কোনো বিশেষ পরিকল্পনা ছাড়াই স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নেয়। ৩১ আগস্টের বিকেলটাও তেমনই। শুরুটা ছিল শপথের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে, আর শেষ হলো গ্রামের পথে ভ্যানযাত্রা, মাটির ভাঁড়ে মালাই চা, পোড়া রুটি, ফুচকা আর একগুচ্ছ গল্প-হাসিতে। বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির শপথ অনুষ্ঠিত হয় ৩১ আগস্ট, সোমবার। শপথ অনুষ্ঠান শেষে বিকেলটা যে এতটা আনন্দময় হয়ে উঠবে, তখন হয়তো কেউই ভাবেনি। অনুষ্ঠান শেষে সবাই মিলে ঝাল চত্বরে বসি চা-আড্ডায়। তখন বিকেল পাঁচটা। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরামের কেন্দ্রীয় পর্ষদ ২০২৬-২০২৭ কার্যবর্ষের সভাপতি এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপদেষ্টা মোঃ রুহুল আমিন ভাই। আরও উপস্থিত ছিলেন ইবি শাখার বর্তমান সভাপতি রবিউস সানি জোহা ভাই, সাধারণ সম্পাদক মোঃ মোজাহিদ হোসেন ভাইসহ ২০২৬-২০২৭ কার্যবর্ষের সকল কার্যনির্বাহী সদস্য। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলছিল নানা কথাবার্তা। একপর্যায়ে রুহুল আমিন ভাই কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটা শুনেই সবার মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হলো। কোথায় যাওয়া যায়, তা নিয়ে শুরু হলো দীর্ঘ আলোচনা। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে হরিনারায়ণপুরের মাটির ভাঁড়ে চা ক্যাফেতে যাওয়া হবে। সিদ্ধান্ত হয়ে যেতেই সবাই চলে গেলাম মেইন গেটে। সেখান থেকে তিনটি ভ্যান ঠিক করে রওনা হলাম হরিনারায়ণপুরের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ মেইন সড়ক ধরে চলার পর ভ্যান ঢুকে পড়ল সরু গ্রামের রাস্তায়। শহুরে ব্যস্ততা পেছনে ফেলে সামনে তখন গ্রামের শান্ত পরিবেশ। রাস্তার দুই পাশে সবুজের সমারোহ, কোথাও গাছপালা, কোথাও খোলা মাঠ। সব মিলিয়ে যাত্রাটাও হয়ে উঠেছিল উপভোগ্য। আমি, নাসাত, আজহার ও পিজুশ ছিলাম একই ভ্যানে। গল্প করতে করতে আর গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে কিছুদূর যাওয়ার পর আমাদের ভ্যানটি অন্যদের থেকে অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আমরা রাস্তা হারিয়ে ফেললাম। ভুল পথে গিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরতে লাগলাম। অন্যদিকে বাকিরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পরে ফোনে যোগাযোগ করে শেষ পর্যন্ত আমরা সঠিক পথ খুঁজে পেলাম এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। মাটির ভাঁড়ে চা ক্যাফেতে পৌঁছানোর পর শুরু হলো আসল আড্ডা। সবাই নিজেদের নানা অভিজ্ঞতা ও গল্প শেয়ার করতে লাগলেন। কখনো গম্ভীর কোনো অভিজ্ঞতার কথা, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক কোনো ঘটনা। গল্পের সঙ্গে যোগ হচ্ছিল হাসি-ঠাট্টা। লেখক ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্যদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে পুরো সময়টুকু যেন আরও আনন্দময় হয়ে উঠেছিল। এরই মধ্যে চলে এলো মাটির ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠা ঘন মালাই চা, সঙ্গে আগুনে পোড়া রুটি। গ্রামের সন্ধ্যার আবহে এই সাদামাটা আয়োজনটুকুও যেন অন্যরকম স্বাদ এনে দিল। এক হাতে চায়ের ভাঁড়, অন্য হাতে রুটি। আর সামনে একের পর এক গল্প। একেকজনের কথা, অভিজ্ঞতা আর হাসির শব্দে সময় কখন যে গড়িয়ে যাচ্ছিল, তা টেরই পাওয়া যাচ্ছিল না। চা-রুটির পর নাস্তার তালিকায় যোগ হলো ফুচকা। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটি গ্রুপ ছবিও তোলা হলো। নাস্তা আর আড্ডা শেষে সন্ধ্যায় আবার ভ্যানে করে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ফেরার সময়ও আমি, নাসাত, আজহার ও পিজুশ একই ভ্যানে ছিলাম। তবে এবার আর আমাদের ভ্যান পিছিয়ে ছিল না, বরং সবার আগে ছিল। ফেরার পথটাও কম আনন্দের ছিল না। চারজন মিলে গাইতে শুরু করলাম ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে। গ্রামের পথ, সন্ধ্যার আবহ আর আমাদের গান মিলিয়ে মুহূর্তটা বেশ অন্যরকম হয়ে উঠেছিল। ভ্যানচালক মামাও আমাদের আনন্দের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। অবশেষে আমরা এসে পৌঁছালাম মেইন গেটে। এরপর বাকিদের জন্য অপেক্ষা করলাম। সবাই আসার পর একে একে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম রুমে। দিনভর ক্লাস, লেখক ফোরামের সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম সহ নানা ব্যস্ততা আর ক্লান্তি ছিল। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের পর হঠাৎ করে হয়ে যাওয়া এই ছোট্ট সফর যেন সব ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল। ভাইদের স্নেহ, বন্ধুসুলভ আচরণ আর সবার আন্তরিকতায় বিকেলটা হয়ে উঠেছিল স্মরণীয়। লেখক ফোরামের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির যাত্রার শুরুতেই এমন একটি আনন্দঘন সময় আমাদের সম্পর্ককে আরও কাছের করে দিয়েছে। জীবনের নানা ব্যস্ততার ফাঁকে এমন কিছু বিকেল বারবার ফিরে আসুক।
