সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

​অস্বাভাবিক মৃত্যু যেখানে স্বাভাবিক

Author

Md Younus Ratul , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৫ বার

​অস্বাভাবিক মৃত্যু যেখানে স্বাভাবিক

​অপ্রতীম ছোট্ট শিশুর বয়স ১৩। গত শনিবার দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পাশের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় এই শিশুর মরদেহ। তার মা-বাবা কি এই ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখার জন্য তাকে লালন-পালন করেছিলেন? তার মতো হাজার হাজার শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু আমরা দেখি, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের কাছে এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমরা কি এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলাম? প্রশ্ন করেও তো লাভ নেই, উত্তর তো একটাই আসে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’ কিন্তু কবে? কবে আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পাব?

​একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কি চাই? খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এই সব মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমাদের জীবনের যদি কোনো নিরাপত্তাই না থাকে, তবে এসব অধিকার কি আদৌ উপভোগ করা যায়? প্রতিদিন খবরের পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ আর কত অস্বাভাবিক শব্দ। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা খবরের পাতা উল্টিয়েই যাচ্ছি, তাহলে এখনো কেন আমাদের স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য এত আকুতি জানাতে হচ্ছে? এই অস্বাভাবিক শব্দগুলো কেন মুছে যাচ্ছে না আমাদের দেশ থেকে? নীতি-নির্ধারকদের জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাওয়া যায় বিগত সরকার আইনশৃঙ্খলা কাঠামো ধ্বংস করে দিয়ে গেছে, যা ঠিক হতে কয়েক বছর লাগবে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও এই ‘কয়েক বছর’ আর শেষ হয় না। বাংলাদেশে এমন কোনো নাগরিক নেই যিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করতে পারেন। রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারকদের দায়িত্ব কি কেবল একটি করে খুন হওয়া, আর তারপরই প্রতিশ্রুতি দেওয়া যে খুব দ্রুত সময়ে খুনের বিচার হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? জনরোষের মুখে বলা এসব কথা আমরা বাস্তবে রূপ নিতে দেখি না।

​কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি বর্তমান দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর দশাকেই উন্মোচিত করে। তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পুলিশ সদর দপ্তরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলেও এই চরম নিরাপত্তাহীনতার চিত্রই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই এই ছয় মাসে সাতটি প্রধান ক্যাটাগরিতে সারাদেশে মোট ২১,৭৫৬টি মামলা হয়েছে, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় ৫২৮টি বেশি। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে খুনের ঘটনায় ১,৭৮৯টি মামলা হয়েছে (যা আগের ৬ মাসের চেয়ে ৯টি বেশি) এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১,১৬৫টিতে (যা আগের চেয়ে ১,০৭৫টি বেশি)। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। আর বাস্তবতার নিরিখে বহু অপরাধ থানায় নিবন্ধিতই হয় না; ফলে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি যে কাগজ-কলমের পরিসংখ্যানের চেয়েও কতটা ভয়াবহ, তা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ট্র্যাজেডির মতোই একের পর এক ঘটনায় প্রকাশ পাচ্ছে।

​সব ঘটনা হয়তো পত্রিকার পাতায় আসে না এবং সেগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা-সমালোচনাও করি না। কিন্তু আমাদের আড়ালে এরকম ঘটনা ঘটে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেশের এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা? দেশের মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা কোনো দিনই ছিল না। তাহলে এমন একটি ব্যর্থ পুলিশ বাহিনী কীভাবে আমাদের নিরাপত্তা দেবে? দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুনর্গঠন ও তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ আমরা দেখতে পাই না, যার ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়তই ঘটে যাচ্ছে এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা।

​জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর

পুলিশ বাহিনীর প্রতি মানুষের তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল, কারণ তারা সবসময় বিরোধী মতামত দমন এবং ক্ষমতাসীনদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। অথচ পুলিশের প্রধান কাজ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা ও অপরাধ দমন করা। কিন্তু এই মূল কাজের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের কোনো জোরালো পদক্ষেপ বা তাগিদ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের উচিত পুলিশ বাহিনীর প্রধান দায়িত্বের দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগী হওয়া। পুলিশ বাহিনীকে যদি আবারও শাসকদলের হাতের পুতুল বানিয়ে রাখা হয়, তবে আরও ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনোদিন স্বাভাবিক হবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ সাহায্যের জন্য পুলিশের কাছে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসে; তারা পুলিশের কাছে কোনো নিরাপত্তা অনুভব করে না। দেশে এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সেই মনোভাব, যার মাধ্যমে তারা পুলিশকে শুধু নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে সাধারণের জন্য অনিরাপদ করে তুলেছে। যার ফলে সাধারণ মানুষ পুলিশ বাহিনীর ওপর ন্যূনতম ভরসাও রাখতে পারছে না।

​একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের সুরক্ষা দিতে না পারলে অন্য কোনো উন্নয়নই অর্থবহ হতে পারে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বন্ধ না হলে স্বাভাবিক মৃত্যুর যে আকুতি আজ দেশজুড়ে, তা চিরকাল অরণ্যে রোদন হয়েই থাকবে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অতি দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি; অন্যথায় প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের দায় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।

​ইউনুচ রাতুল

লেখক/সংগঠক

প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক

বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, বেরোবি শাখা

মোবাইল: ০১৯২৬৮৫১৬০৪

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।