বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আত্মহত্যা প্রতিরোধে দরকার কাঠামোগত সংস্কার

Author

শামা মেহজাবিন , রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ১৪ বার

বাংলাদেশে আত্মহত্যা একটি অন্যতম সমস্যা। প্রতি বছর এদেশের বহু মানুষ আত্মহত্যার সফল বা বিফল চেষ্টা করে থাকেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী আত্মহত্যার হার শূণ্যের ঘরে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে?

যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে আগে বিশ্লেষণ করা দরকার সমস্যাটাকেই। কেন এই সমস্যাটি হচ্ছে, কোথা থেকে এর উদ্ভব, কেন এটি বাড়ছে বা কমছে ইত্যাদি সঠিকভাবে জানতে পারলে তবেই এর কার্যকরী সমাধান বের করা সম্ভব। তাই আত্মহত্যা বন্ধ করতে হলেও আমাদের আগে দেখতে হবে এটি কেন ঘটে।

জীবমাত্রই বেঁচে থাকতে চায়। জীবের সকল সংগ্রাম দিনশেষে ওই বেঁচে থাকার জন্যই। মানুষও জীবজগতের বাইরে নয়। কাজেই একজন মানুষ যখন চায় নিজের জীবনটাই নিজে নিজে শেষ করে দিতে, তখন সে জীব হিসেবে একটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেয়। যেই জীবনকে ধারণ করতে জীবের শত বিবর্তন, হাজারো সংগ্রাম, সেই জীবনকেই নিজ হাতে শেষ করে দিতে চাওয়াটা জীবকুলের মাঝে এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা বটে।

কিন্তু কীভাবে একজন মানুষের মানসিক অবস্থার এতো চরম অবনতি ঘটে যা তাকে এই অভাবনীয় কাজ করতে প্ররোচিত করে? এর আসলে কোনো একটি সহজ উত্তর নেই। মানুষের আত্মহত্যার পেছনে থাকতে পারে নানা বিচিত্র কারণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিবেশ।

প্রতিটি মানুষের আছে কিছু মৌলিক চাহিদা। এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হওয়া বা না হওয়া তার বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এগুলো যখন ঠিকমতো পূরণ হয় না, তখন তার কাছে বেঁচে থাকাটা একরকম বোঝা মনে হয়। এই পরিস্থিতি যদি দিনের পর দিন চলতে থাকে, তাহলে একসময় সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে। বিশেষত যদি তার উপর অন্যরা নির্ভরশীল থাকে, তবে সে তাদের চাহিদা মেটাতে না পারার ফলে অনুশোচনা, দুশ্চিন্তা, বিষন্নতায় ভুগতে থাকে। এই অনুভূতিগুলোই যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আত্মহত্যাকে একটা সহজ সমাধান বা পলায়নের পথ মনে হতে পারে।

নিজের সাথে গুরুতর কোনো অন্যায় হলেও অনেক সময় মানুষ আত্মহত্যা করে। এর পেছনেও রয়েছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কারণ। ভিকটিম যখন জানে তার সাথে হওয়া অন্যায়ের সুবিচার রাষ্ট্র তো করবেই না, উপরন্তু সমাজও তাকেই দোষারোপ করবে, তখন সে হতাশা ও লজ্জায় আত্মহত্যা করে।

শুধু নিজের কষ্ট নয়, অন্যের কষ্টও মানুষকে আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলতে পারে। একজন বিবেকবান, সহানুভূতিশীল মানুষ যখন দেখে তার চারপাশে নানা অন্যায়-অবিচার হচ্ছে, তখন তা তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কুপ্রভাব ফেলে। যখন সে দেখে এসব অন্যায়ের কোনো সুবিচার হচ্ছে না, তখন তার মানসিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। এজন্যই দেখা যায় যারা বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত, তারা অনেক সময় বিষন্নতায় ভোগে এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

এর পাশাপাশি রয়েছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজে যখন মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেয়া হয় না, সমাজবাসীর একে-অপরের প্রতি সহানুভূতি কম থাকে, মানসিক স্বাস্থ্যকে ট্যাবু বানানো হয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে হয়, তখন মানুষের মানসিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান যেমন কম, তেমনি কম সঠিক চিকিৎসার সুবিধা। অনেক মানসিক চিকিৎসকের ফি অত্যধিক বেশি যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। আবার অনেকে চিকিৎসার নামে করে ভন্ডামি।

এদেশের সমাজও দিন দিন কেমন যেন মার মার কাট কাট হয়ে যাচ্ছে। কেউ যদি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কষ্ট পায়, তবে তাকে সহানুভূতি দেখানোর বদলে উল্টো অপমান করা, বিদ্রূপ করা, তার অবস্থাকে গুরুত্ব না দেয়া, তার কষ্টকে অন্যের কষ্টের সাথে তুলনা করে ছোট করার প্রবণতা দেখা যায়৷ এমনকি কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা বা আত্মহত্যা করলে পর্যন্ত অনেকে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি তো দেখায়ই না, উল্টো সে কতো বড় পাপ করেছে, এর জন্য তার পরকালে কী কী শাস্তি হবে তার ফর্দ খুলে বসে।

অনেককে তো পরিবার ও সমাজ রীতিমতো নিজ হাতে ঠেলে আত্মহত্যার দিকে পাঠায়। এর একটি ভালো উদাহরণ হলো বোর্ড পরীক্ষার সময়গুলো। এ সময় যেসব শিক্ষার্থীর ফলাফল একটু খারাপ হয়, তাদের না সমাজ থেকে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখানো হয়, না পরিবার থেকে। উল্টো তাদের এমন অপমান-অপদস্থ করা হয়, অনেককে রীতিমতো নির্যাতন পর্যন্ত করা হয়, যে এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনেকে তা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। প্রতি বছর এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে কোনো সচেতনতা তৈরি হয় না। বরং মজার ব্যাপার হলো যে নিজ সন্তানদের যারা নিজেরাই কষ্ট দিয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে, তারাই আবার সন্তানের মৃত্যুর পর আহাজারি করে বেড়ায়।

অর্থাৎ, আত্মহত্যা শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থা সরাসরি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। এজন্যই যেই রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা মজবুত, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা আছে, তাদের মৌলিক অধিকার পূরণ হয়, সেই রাষ্ট্রে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো থাকে এবং এর ফলে সেখানে আত্মহত্যার হারও হয় কম। পক্ষান্তরে যেই রাষ্ট্রে এর বিপরীত অবস্থা বিদ্যমান, সেখানে আত্মহত্যার হারও বেশি।

এমতাবস্থায় আত্মহত্যাকে শূণ্যের ঘরে নামাতে দরকার সিস্টেমের সংস্কার। সমাজ থেকে নানা বৈষম্য চিহ্নিত করে দূর করা, সর্বস্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সকল প্রকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বেকারত্বের অভিশাপ দূর করা, দারিদ্র্য নিরসন করা ইত্যাদি পদক্ষেপ নিতে হবে। এর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বস্তরের নাগরিকের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে সরকারিভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হবে।

এই কাজগুলো কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়৷ আত্মহত্যাকে সত্যিই শূণ্যের কোঠায় নামাতে চাইলে এই কঠিন কাজগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

আত্মহত্যা শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এর পেছনে কাজ করে পারিপার্শ্বিক অবস্থা। সমাজ যখন অন্যায়-অবিচারে ছেয়ে যায়, তখন সমাজবাসীর মানসিক স্বাস্থ্যেরও বারোটা বাজে। আর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেই মানুষ আত্মহত্যা করে। তাই আত্মহত্যাকে যদি সরকার আসলেই শূণ্যের ঘরে নামাতে চায়, তবে রাষ্ট্রকে নাগরিকবান্ধব করে তুলতে হবে। এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ হাজার বছর বেঁচে থাকতে চায়।

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।