শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নদীভাঙনে জনপদ, স্থায়ী সমাধান কোথায়?

Author

নিয়ামুর রশিদ শিহাব , Global University Bangladesh

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৮ বার

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও প্রতি বছর বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুমে নদীভাঙন এক দানবীয় রূপ ধারণ করে লাখো মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মানচিত্র থেকে একেকটি জনপদ মুছে যাওয়ার এই ভয়ংকর বাস্তবতায় আজ দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত হাহাকার চলছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থেকে শুরু করে ঝালকাঠি, বাগেরহাটের রামপাল, চট্টগ্রামের রাউজান, বরিশালের বানারীপাড়া, পটুয়াখালীর গলাচিপা কিংবা গাইবান্ধার চরাঞ্চল সব জায়গাতেই নদীভাঙন আজ এক অনিবার্য ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর গতি প্রকৃতির পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নানা কার্যক্রম এই ভাঙনকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নদীভাঙনের যে ভয়াবহ ও হৃদয় বিদারক চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওয়ালজানি গ্রামে পদ্মার ভাঙনে প্রায় একশ মানুষের বসতি আজ চরম হুমকির মুখে। মুন্সি বাজার, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, কবরস্থান ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তীব্র স্রােতের মুখে তা টিকছে না। মাত্র এক সপ্তাহে বিলীন হয়েছে প্রায় ১১০ বিঘা আবাদি জমি, যার ফলে কৃষকদের জীবিকা আজ হুমকির মুখে। অন্যদিকে, ঝালকাঠির নলছিটিতে বিষখালী নদীর ভাঙনে ভবানীপুর ও ইসলামপুর এলাকার চারটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে শ্রেণিকক্ষ, দেয়ালে ফাটল ধরে চরম ঝুঁকিতে চলছে পাঠদান। একইভাবে পটুয়াখালীর গলাচিপায় বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর ভাঙনে পশ্চিম চর কাজল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদী থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে অবস্থান করছে। বাগেরহাটের রামপালে আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের তীব্র নদীভাঙনে শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। পাকা সড়ক, যাত্রী ছাউনি, এমনকি ২০২০ সালে ২১ লাখ টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত একটি বক্স কালভার্টও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কৃষি ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের ক্ষেত্র হালদার ভাঙনে চট্টগ্রামের রাউজানের বিনাজুরী, উরকিরচর, নোয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার জনপদ এবং আইডিএফ হালদা গবেষণা কেন্দ্র হুমকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকায় ৩৩ হাজার ভোল্টেজের একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক টাওয়ার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা পাঁচ ইউনিয়নের লক্ষাধিক গ্রাহককে বিদ্যুৎহীন করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নদী তীরবর্তী এলাকার অন্তত ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে ভাঙনে সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছে ফুলছড়ি উপজেলার আঙ্গারীদহ, উত্তর খাটিয়ামারি, চর চৌমোহন, সদর উপজেলার সীতাসতী ও সুন্দরগঞ্জের ভোরের পাখিসহ ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়াও ভাঙনের মুখে ৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভবন না থাকায় খোলা আকাশের নিচে চলছে ৮ বিদ্যালয়ের পাঠদান। ফলে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে চরের মানুষগুলো আজ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই প্রলয়ংকরী পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে হলে কেবল ভাঙন-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণ, বেড়িবাঁধ সংস্কার বা সাময়িক জিও ব্যাগ ফেলার মতো দায়সারা পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর কৌশলগত পদক্ষেপ। প্রথমত, যেসব পয়েন্টে ভাঙন তীব্র, সেখানে জোড়াতালি না দিয়ে জিও ব্যাগের স্থায়িত্ব বাড়াতে এবং স্থায়ী বাঁধ বা ব্লক ডাম্পিংয়ের কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে। নদীশাসনের আধুনিক প্রকৌশল পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদী ও খাল খননের ক্ষেত্রে পানির গতিপ্রকৃতি ও পরিবেশগত প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে খননের কারণে নতুন করে কোনো এলাকায় ভাঙন না ধরে। স্থানীয় পরিবেশবিদ ও জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, নদীভাঙনে বাস্তুহারা হওয়া পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে নিরাপদ স্থানে নেওয়া ও পরবর্তীতে পুনর্বাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরিয়ে নিতে হবে যাতে শিশুদের পড়ালেখা বিঘ্নিত না হয়। চতুর্থত, দেশের প্রতিটি নদীতীরবর্তী অঞ্চলে ভাঙনের ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নদীভাঙন রোধকল্পে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে।

নদীভাঙন রোধে জাতীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এটি শুধু নদীতীরবর্তী মানুষের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। তাই ভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে বিজ্ঞানভিত্তিক নদীশাসন, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত নদীর গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন ও নদী দখল বন্ধেও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে একের পর এক জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হবে। দেশ ও মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: প্রচার সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।