উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শিক্ষক মূল্যায়ন অপরিহার্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ করলে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য ও নীতিগত প্রশ্ন দৃষ্টিগোচর হয়। যেখানে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক জীবন প্রতিটি পদে মূল্যায়নের কঠিন কষ্টিপাথরে যাচাই করা হয়। একজন শিক্ষার্থীকে সেমিস্টারজুড়ে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়, অগণিত অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করতে হয়, টিউটোরিয়াল ও মিডটার্ম পরীক্ষায় বসতে হয় এবং চূড়ান্ত সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। সামান্য ভুলের কারণে তার ভবিষ্যৎ অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অথচ এই একই ব্যবস্থার অধীন যিনি শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান বিতরণের মূল দায়িত্ব পালন করছেন, সেই শিক্ষকের পাঠদানের কার্যকারিতা, বিষয়বস্তুর স্পষ্টতা এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার গুণগত মান নিয়মিতভাবে যাচাই করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও নম্বর প্রদানের কঠোর ব্যবস্থা থাকলেও শিক্ষকের পাঠদান কতটুকু অর্থবহ হলো বা শিক্ষার্থীরা আদৌ শিখতে পারল কি না, তা জানার কোনো স্বীকৃত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায় না থাকা উচ্চশিক্ষার পুরো দর্শনকে এক গভীর অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করায়। যে প্রক্রিয়ায় গ্রহীতার পারফরম্যান্স প্রতিমুহূর্তে পরিমাপ করা হয়, কিন্তু পরিবেশকের দক্ষতা ও পদ্ধতির কোনো মূল্যায়ন হয় না, সেখানে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই অনুপস্থিতি আজ আমাদের বাধ্য করছে প্রশ্ন তুলতে যে, কেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠদানের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা হবে না এবং কেন একটি যুগোপযোগী ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠদানের নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচ্চশিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনই ভালো শিক্ষকতার সনদ হতে পারে না; বরং শিক্ষক নির্ধারিত পাঠ্যসূচি বা সিলেবাস অনুসরণ করে সময়মতো কোর্স শেষ করছেন কি না, জটিল ও দুর্ভেদ্য তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের বোধগম্য করে সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করতে পারছেন কি না এবং ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার উন্মুক্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সুযোগ দিচ্ছেন কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা আবশ্যক। শিক্ষক মূল্যায়নের এই চর্চা উচ্চশিক্ষাকে ঐতিহ্যগত শিক্ষক-কেন্দ্রিক কাঠামোর বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আধুনিক শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিখন প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করে। যখন একজন শিক্ষক জানতে পারেন যে তাঁর উপস্থাপনার স্পষ্টতা, বিষয়ভিত্তিক গভীরতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কোর্স আউটকাম অর্জনের ওপর নিয়মিত গঠনমূলক ফিডব্যাক নেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজের পাঠদান পদ্ধতি হালনাগাদ করেন এবং বিষয়ভিত্তিক অনুশীলনে অধিকতর যত্নবান হন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এবং স্পষ্ট যোগাযোগের ক্ষমতা একজন শিক্ষকের গুণগত পারফরম্যান্স নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। নিয়মিত ও কাঠামোগত মূল্যায়ন চালুর মাধ্যমে শিক্ষক সমাজের মধ্যে পেশাগত উৎকর্ষ অর্জনের এক সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে ওঠে। আর এটি সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে সহায়তা করে।
শিক্ষকের পাঠদান মূল্যায়নে প্রাথমিক গ্রহীতা হিসেবে শিক্ষার্থীদের মতামত ও প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও শিক্ষকের সার্বিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে এটিই একমাত্র বা একক সূচক হওয়া উচিত নয়। আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক সাহিত্য ও অভিজ্ঞতামূলক গবেষণায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, শিক্ষার্থীদের একক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে তাতে ব্যক্তি ভিত্তিক পছন্দ-অপছন্দ, গ্রেডিংয়ের কঠোরতা কিংবা আবেগজনিত পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি থেকে যায়। এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর জন্য একটি সুসংহত ও বহুস্তরভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামোর রূপরেখা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই বহুস্তরভিত্তিক মডেলে শিক্ষার্থীদের গোপন ফিডব্যাকের পাশাপাশি সহকর্মী মূল্যায়ন, বিভাগীয় জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পর্যালোচনা, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষিত নিরপেক্ষ মূল্যায়ক এবং শিক্ষকের নিজস্ব আত্ম-মূল্যায়নকে সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রিত করা আবশ্যক। বাংলাদেশের চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষার মতো পেশাগত উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের ওপর পরিচালিত গবেষণাতেও দেখা যায়, প্রায় ৮৯.৪% শিক্ষক শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং তাঁরা একক শিক্ষার্থী মূল্যায়নের পরিবর্তে শিক্ষার্থী (২৬.৩%), প্রশিক্ষিত মূল্যায়ক (২১.৩%), জ্যেষ্ঠ শিক্ষক (১৯.৭%), আত্ম-মূল্যায়ন (১৮.৩%) এবং পিয়ার রিভিউয়ের (১৪.৪%) একটি সুষম আনুপাতিক সংমিশ্রণকে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন। এর সঙ্গে শিক্ষকের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা, স্কোপাস বা পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণকেও সমভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এটি একজন শিক্ষকের সার্বিক অবদানের একটি নিরপেক্ষ প্রতিচ্ছবি তৈরি করবে।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার দিকে গভীরভাবে তাকালে শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা ও পাঠদানের বিচ্যুতি-সংক্রান্ত কিছু চরম হতাশাজনক দৃশ্যপট আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা ও কাঠামোগত জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির সুযোগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকে জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল আলোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রদর্শনক্ষেত্র, দলীয় এজেন্ডা প্রচার কিংবা অপ্রাসঙ্গিক ও আউট-অফ-কনটেক্সট আলাপচারিতার মুক্ত মঞ্চে পরিণত করার প্রবণতা দেখা যায়। উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ক্লাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধতা ও অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মূল বিষয়বস্তুর বাইরে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা করা (৩৫%) এবং পাঠ্যসূচির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়া (৫%)। তদুপরি, শিক্ষকদের একটি অংশের নিয়মিত অনুপস্থিতি, নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসে উপস্থিত না হওয়া কিংবা পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশে মাসের পর মাস অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটানোর ফলে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক জীবন চরম স্থবিরতার মুখোমুখি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক নিজ বিভাগে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ না দিয়ে বাহ্যিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা নিজস্ব ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে অধিক সময় ব্যয় করেন এবং তাঁদের মূল দায়বদ্ধতা তথা শিক্ষার্থীদের পাঠদান প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেন। এই ধরনের অব্যবস্থাপনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ক্ষতির পাশাপাশি পুরো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার জনআস্থা ও সুনামের ভিত্তি শিথিল করে দেয়।
শ্রেণিকক্ষের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার চেয়েও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার ক্ষমতার চরম ভারসাম্যহীনতা থেকে উদ্ভূত মনস্তাত্ত্বিক হয়রানি ও ভয়ের সংস্কৃতি। বিচ্ছিন্ন কিন্তু গভীরভাবে ক্ষতিকর কিছু আচরণ, যেমন সামান্য অ্যাকাডেমিক দ্বিমত বা ভুলের কারণে শিক্ষার্থীকে ক্লাসে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে অপমান করা, প্রশ্ন করতে গেলে ধমক দিয়ে নিরুৎসাহিত করা কিংবা তাদের সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড, আঞ্চলিকতা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। টিউটোরিয়াল বা সেমিস্টার ফাইনালের নম্বরকে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনিক আধিপত্য বজায় রাখার কিংবা তাদের বাকস্বাধীনতা দমন করার ভয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের মতামত ভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২০% শিক্ষার্থী শিক্ষকের দ্বারা শ্রেণিকক্ষে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হওয়াকে পাঠদানের প্রতি চরম অনীহা তৈরির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে এই প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই ধরনের বিচ্ছিন্ন অপেশাদার আচরণ বা নেতিবাচক প্রবৃত্তি দিয়ে আমাদের পুরো শিক্ষক সমাজকে কোনোভাবেই ঢালাওভাবে বিচার বা সাধারণীকরণ করা সমীচীন হবে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনও এমন বহু শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা চরম নিষ্ঠা, মেধা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ও নৈতিক জীবন গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তবুও সেই বিচ্ছিন্ন কিন্তু ক্ষতিকর আচরণগুলো রোধ করতে এবং প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে আত্মমর্যাদাপূর্ণ, ভয়মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রথার অস্তিত্ব অপরিহার্য।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক মূল্যায়ন প্রথা চালুর ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারণী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। মঞ্জুরি কমিশনকে কোনো প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক সুপার-কন্ট্রোলার বা মাইক্রো-ম্যানেজার হিসেবে কাজ না করে, বরং একটি জাতীয় মানদণ্ড, অভিন্ন নীতিমালা ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেওয়া গাইডলাইন প্রণেতা হিসেবে কাজ করতে হবে। ইউজিসি পরিচালিত হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (HEAT) প্রকল্পের মতো বৈশ্বিক উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স সেল (IQAC) শক্তিশালী করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তাকে দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকরভাবে বিস্তৃত করতে হবে। ইউজিসি একটি সার্বজনীন টিচিং ইভাল্যুয়েশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তুত করবে, যার আওতায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন, অ্যাকাডেমিক কালচার ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী নিজস্ব সেলের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করবে। ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং ইভাল্যুয়েশনের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা হলেও কিংবা আইকিউএসি (IQAC)-এর মাধ্যমে গঠনমূলক প্রশ্নমালা তৈরি করা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত ধারাবাহিকতার অভাবে তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। সুতরাং ইউজিসি যদি প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত অর্থায়ন নিশ্চিত করে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের অভ্যন্তরীণ অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদনের মাধ্যমে খুব সহজেই একটি নির্ভরযোগ্য শিক্ষক মূল্যায়ন সেল সক্রিয় করতে পারবে।
একটি সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট, বৈজ্ঞানিক ও আনুপাতিক মূল্যায়ন মডেল। মাল্টি-ক্রাইটেরিয়া ডিসিশন মেকিং (MCDM) কিংবা আধুনিক উচ্চশিক্ষাবিষয়ক গবেষণার আলোকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে একটি আনুপাতিক মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। এই মডেলে ৫০% বরাদ্দ রাখা যেতে পারে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ গোপনীয় ফিডব্যাকের ওপর। যেখানে শিক্ষকের পাঠদানের স্পষ্টতা, সময়ানুবর্তিতা, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তরের গ্রহণযোগ্যতা, বৈষম্যহীন মূল্যায়ন এবং কোর্স আউটকাম অর্জনের ওপর ভিত্তি করে একটি পরিমিত লাইকার্ট স্কেলে মতামত গ্রহণ করা হবে। ২০% বরাদ্দ থাকবে সমকক্ষ সহকর্মী এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পর্যালোচনার ওপর, যারা শিক্ষকের কোর্স প্রোফাইল, সিলেবাসের আধুনিকতা, প্রশ্নপত্রের কাঠামোগত গভীরতা এবং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান মূল্যায়ন করবেন। আরও ১৫% বরাদ্দ থাকবে বিভাগীয় প্রধান বা প্রশিক্ষিত নিরপেক্ষ মূল্যায়ক দ্বারা ক্লাসের সরাসরি পাঠদান পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের অর্জিত ফল বিশ্লেষণের ওপর। অবশিষ্ট ১৫% মূল্যায়ন নির্ধারিত হবে শিক্ষকের পেশাদার আচরণ, গবেষণা প্রকাশনা, অ্যাকাডেমিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক সময় প্রদানের হারের ওপর। এই ধরনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক মডেল শিক্ষার্থীদের মেজাজ বা একক আবেগের ওপর ভর করে না; বরং এটি শিক্ষকের পেশাগত অবদানের একটি সুষম ও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড দাঁড় করায়।
আজকের আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এসে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুকরণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS), সেন্ট্রাল পোর্টাল এবং প্রয়োজনে অ্যাকাডেমিক মনিটরিং ও ক্লাস রেকর্ডিং ব্যবস্থার সূচনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। ডিজিটাইজড ক্লাস মনিটরিং এবং রেকর্ডকৃত লেকচারের ব্যবস্থা একদিকে যেমন অসুস্থ বা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পরবর্তীতে বিষয়বস্তু বুঝতে সাহায্য করে, অন্যদিকে শিক্ষকের উপস্থিতি ও পাঠদানের বিষয়ভিত্তিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চমৎকার ইতিবাচক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে এই ধরনের প্রযুক্তিগত মনিটরিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সমাধান ও নজরদারির মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমান্তটি সতর্কতার সঙ্গে মনে রাখতে হবে। মনিটরিং ব্যবস্থা যেন কোনো অবস্থাতেই শিক্ষকের স্বাধীন চিন্তাভাবনা, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা কিংবা মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে সংকুচিত করার মতো প্রশাসনিক নজরদারিতে পরিণত না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ধারক; তাই ক্লাসের রেকর্ডিং বা ডেটাবেজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এনক্রিপশন ও সাইবার সিকিউরিটি নীতি মেনে চলতে হবে, যাতে কোনো অসাধু চক্র শিক্ষকের বক্তব্যকে খণ্ডিতাংশে কেটে বিকৃত করতে না পারে কিংবা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে সামাজিক অপমান বা ট্রোলিংয়ের শিকার না বানাতে পারে। প্রযুক্তির সুফল গ্রহণ এবং শিক্ষকের স্বকীয়তা ও শিক্ষার্থীর গোপনীয়তার ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে একটি আধুনিক অ্যাকাডেমিক প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতির গভীর বিভাজন এবং প্রশাসনিক জটিলতার প্রেক্ষাপটে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি শুরু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, এটিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, ব্যক্তিগত কোন্দল বা মতাদর্শিক দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) কর্তৃক “ডিই ইভাল্যুয়েশন” নামে একটি অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম চালু করার পর শিক্ষকদের প্রাপ্ত রেটিং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া, কিছু শিক্ষককে নিয়ে অনলাইন ট্রোলিং তৈরি হওয়া এবং তার প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশাসনিক বৈধতার প্রশ্ন ওঠার ঘটনা আমাদের সামনে এক বড় সতর্কবার্তা দিয়ে যায়। মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে এই ধরনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অপব্যবহার থেকে মুক্ত রাখতে হলে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট, অবজেক্টিভ ও স্বচ্ছ প্রশ্নমালা ব্যবহার করতে হবে; যেখানে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতাদর্শের কোনো ঠাঁই থাকবে না। মূল্যায়নকারী শিক্ষার্থীর তথ্য ও পরিচিতি যেমন ডিজিটাল কোডিংয়ের মাধ্যমে ১০০% গোপন রাখতে হবে, তেমনি মূল্যায়নের চূড়ান্ত স্কোর বা প্রতিবেদন কখনোই পাবলিক প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করা যাবে না; তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান এবং ডিন বা উপাচার্যের প্রশাসনিক নথিতে সংরক্ষিত থাকবে। তদুপরি, কোনো শিক্ষক যদি মনে করেন যে দলগত রাজনীতি বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণে তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কম নম্বর দেওয়া হয়েছে, তবে তাঁর জন্য একটি নিরপেক্ষ অ্যাপিলেট অথরিটি বা আপিল কমিটির কাছে পর্যালোচনার সুনির্দিষ্ট সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই এই ব্যবস্থার প্রতি সবার আস্থা বজায় থাকবে।
শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রাথমিক ও প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত গঠনমূলক ও উন্নয়নমুখী। কোনো অবস্থাতেই এটিকে প্রথম সুযোগেই শাস্তিমূলক বা চাকরিচ্যুত করার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মূল্যায়নের উদ্দেশ্য যখন শিক্ষককে বরখাস্ত বা বেতন কাটার মতো প্রশাসনিক হুমকি তৈরি করা হয়, তখন শিক্ষক সমাজ এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং পুরো প্রক্রিয়া ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাই মূল্যায়নের পর প্রথমবার কোনো শিক্ষকের স্কোর প্রত্যাশিত মানদণ্ডের নিচে আসলে তাঁকে জনসম্মুখে লজ্জিত বা হেয় প্রতিপন্ন না করে, তাঁর পাঠদানের দুর্বলতার জায়গাগুলো (যেমন: উপস্থাপনার অভাব, অস্পষ্টতা বা ক্লাসরুম ইন্টারঅ্যাকশনের অভাব) চিহ্নিত করে দেওয়া উচিত। কম স্কোর পাওয়া শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ট্রেনিং একাডেমি বা আইকিউএসি (IQAC)-এর অধীনে আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, প্রেজেন্টেশন স্কিল ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর বিশেষ পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী সেমিস্টারে তাঁর পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, যাতে তিনি নিজেকে একজন সফল ও জনপ্রিয় অ্যাকাডেমিক হিসেবে গড়ে তোলার পূর্ণ সুযোগ পান। শিক্ষকের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করা এবং তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক হতে সাহায্য করাই হওয়া উচিত এই মূল্যায়নের মূল সংস্কারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স ও অ্যাকাডেমিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (যেমন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় বা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়) সেমিস্টার শেষে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে টিচিং ইভাল্যুয়েশন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক একটি চর্চা এবং এই রেটিং গোপনীয়তার সঙ্গে শিক্ষক ও প্রশাসন পর্যবেক্ষণ করে থাকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রথা পাঠদানে গতিশীলতা আনলেও, সেখানকার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোর শতভাগ মডেল আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরাসরি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্ক শ্রেণিকক্ষের কয়েক ঘণ্টার পাঠদানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আবাসিক হল, গবেষণা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও স্বায়ত্তশাসিত ক্যাম্পাসের বহুবিধ সামাজিক কর্মকাণ্ডে বিস্তৃত। ফলে কাস্টমার-সার্ভিস মডেলের মতো বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলীকে পরিমাপ করার প্রয়াস ব্যর্থ হতে বাধ্য। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে সেমিস্টারভিত্তিক আইকিউএসি সেল ও কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্সের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন, ঐতিহ্য ও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেও সেই ধরনের সুসংহত শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে।
বিশ্বের প্রতিটি উন্নত দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূলে রয়েছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণার বিশ্বমানের অভিন্ন মানদণ্ড। আর একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার মূল ভিত্তিই হলো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠদানের মেধা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। শিক্ষক মূল্যায়ন কোনো ক্ষণস্থায়ী আবেগের স্ফুরণ, অগোছালো বিক্ষোভ কিংবা ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতার লড়াইয়ের বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিকীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের এক ঐতিহাসিক ও অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয়তা। অহেতুক ভীতি, রাজনৈতিক অপপ্রচার কিংবা ঐতিহ্যগত অ্যাকাডেমিক জড়তা আঁকড়ে ধরে রেখে যদি আমরা আজ এই যুগোপযোগী শিক্ষক মূল্যায়ন প্রথা চালুর উদ্যোগ না নিই, তবে বৈশ্বিক মেধা ও জ্ঞান-অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও পেছনে পড়ে থাকবে। এখন সময় এসেছে অহেতুক রাজনৈতিক বিতর্ক ও কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক সমাজ এবং শিক্ষার্থী সবাইকে একটি একক প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে এসে একটি নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক ও বহুস্তরভিত্তিক শিক্ষক মূল্যায়ন কাঠামো বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার। এই ভারসাম্যপূর্ণ ও নীতিভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কারই আগামী দিনের বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে একটি আত্মমর্যাদাশীল, মেধাভিত্তিক ও আধুনিক জ্ঞান-সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথ সুগম করবে।
লেখক, রাকিবুল হাসান মুন্না
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
