মাধ্যমিক শিক্ষায় গুণগত রূপান্তর: কাঠামোগত সংস্কার নাকি গতানুগতিক রুটিন?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো মাধ্যমিক স্তর। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে এই স্তরে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ও স্থবিরতা আমাদের কাঙ্ক্ষিত অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে আসছে। ডিজিটাল কিংবা স্মার্ট বাংলাদেশের রূপকল্প নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত আলোচনা করলেও তৃণমূলের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্থানীয় প্রভাববলয়, কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী ও প্রশাসনিক জটিলতার নানা অদৃশ্য বেড়াজাল এখনো সক্রিয়। ফলে রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে স্কুলগুলোতে ল্যাব, বিভিন্ন আধুনিক উপকরণ ও অনুদান দিলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বর্তমানে বিদ্যালয়গুলোতে সহশিক্ষা কার্যক্রম, দৈনিক সমাবেশ, শারীরিক চর্চা এবং আইসিটি বা ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার জন্য যে জনবল রয়েছে, তাদের কার্যকারিতা ও বিদ্যমান জনবল কাঠামোর বাস্তব ফলাফল নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট পদে জনবল থাকার পরও মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে চাওয়া তথ্য সঠিক সময়ে ও মানসম্মতভাবে পাঠানো যায় না। এমনকি অনেক বিদ্যালয়ে এখনো ডিজিটাল স্কুল ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয় না; অধিদপ্তর থেকে বারবার প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য নিজস্ব ওয়েবসাইটের নির্দেশনা দেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। আবার কিছু বিদ্যালয়ে প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকলেও তা পরিচালনা করার মতো দক্ষ বা আগ্রহী জনবলের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ডিজিটাল মার্কশিট তৈরি বা বার্ষিক ডেটা এন্ট্রির মতো কাজগুলো একা করার আশঙ্কায় তা এড়িয়ে চলতে চান। শুধু তাই নয়, কিছু বিদ্যালয়ে স্কাউট বা গার্লস গাইডের মতো কার্যক্রম কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার কোনো চিত্র নেই; এমনকি নিয়মিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয় না। অবশ্য এই নেতিবাচক চিত্রের বাইরেও কিছু ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে নিয়মিত দৈনিক সমাবেশ, দক্ষ স্কাউটিং এবং ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে—যা সত্যিই প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয়। তবে এর বাইরে বহু প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রভাব বা জবাবদিহিতার অভাবে মৌলিক দায়িত্ব থেকে দূরে থাকছেন। আর এসব অনিয়ম তদারকি করার জন্য যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে, তা-ও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি। ফলে একটি স্কুলকে সত্যিকার অর্থে প্রাণবন্ত ও শৃঙ্খলিত করে তোলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অচলায়তন ভাঙতে হলে আমাদের গতানুগতিক চিন্তার বাইরে বের হতে হবে। শুধু নতুন নতুন পরিপত্র জারি করে বা রুটিনমাফিক পরিদর্শন করে এই জটিল ব্যবস্থার টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত ও প্রায়োগিক সংস্কার।
প্রথমত, বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান জনবল ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিকীকরণ প্রয়োজন, যার লক্ষ্য হবে যুগোপযোগী ও বহুমুখী দক্ষতাসম্পন্ন ফ্রন্টলাইন প্রতিনিধি তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য জনবল বাড়ানো নয়, বরং বিদ্যমান জনবলকে আরও কার্যকর, সমন্বিত ও ফলাফলভিত্তিক করা—যাতে তারা একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম সামলাতে সক্ষম হন।
দ্বিতীয়ত, এই ধরনের জনবলকে গতানুগতিক উপায়ে নিয়োজিত না করে তাদের জন্য একটি উচ্চমানের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। শারীরিক শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই কর্মীরা যখন শিক্ষাঙ্গনে কাজ করবেন, তখন তাদের পেশাদারিত্বের প্রভাবেই স্কুলের সামগ্রিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কোনো প্রকার বল প্রয়োগ বা সংঘাত ছাড়াই তাদের সুশৃঙ্খল কর্মতৎপরতার মুখে স্থানীয় অনিয়ম ও স্থবিরতা দূর হতে বাধ্য।
এই প্রায়োগিক মডেল বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্র বহুমুখী সুফল পেতে পারে। একদিকে শিক্ষাঙ্গনে ফিরে আসবে স্থায়ী নিয়মানুবর্তিতা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা কেবল গতানুগতিক পাঠ্যপুস্তকের ভেতর সীমাবদ্ধ না থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে একজন পরিপূর্ণ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। এছাড়া, তৃণমূলের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি থাকলে শিক্ষা প্রশাসনের প্রকৃত চিত্র সরাসরি নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে স্পষ্ট থাকবে। যেখানে শিক্ষা খাতের ভেতরে দীর্ঘদিনের জঞ্জাল জমা হয়েছে, সেখানে খণ্ডকালীন বা দায়সারা সংস্কার দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষাঙ্গনকে সত্যিকার অর্থে গতিশীল ও যুগোপযোগী করতে হলে প্রয়োজন নীতিনির্ধারক মহলের সদিচ্ছা এবং একটি সুনির্দিষ্ট প্রায়োগিক ফ্রেমওয়ার্ক। সময় এসেছে গতানুগতিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ার, যা পুরো জাতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল করে তুলবে।
