পরিবেশ রক্ষার নামে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর ধোঁকাবাজি বন্ধ করতে হবে
বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব মনোভাব এখন আর কোনো নৈতিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং তা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা বাড়ানোর এক সুচতুর বিজ্ঞাপনী হাতিয়ার। বিজ্ঞাপনের রঙিন পর্দায় চোখ পড়তেই দেখা যায় যে, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পরিবেশপ্রেমী হিসেবে দাবি করছে। প্লাস্টিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি, বৃক্ষরোপনে নিজেদের উদ্যোগকে বড় করে তুলে ধরছে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে,কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান গুলোর এসব দাবি বাস্তবে কতটা সত্য তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আর এই সূত্র ধরেই গ্রীনওয়াশিং বা সবুজ ধোঁকাবাজি ধারণাটি সামনে আসে। গ্রীনওয়াশিং এমন এক প্রচারণা যেখানে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের পরিবেশবান্ধব এবং পরিবেশ সচেতন হিসাবে উপস্থাপন করে। গ্রীনওয়াশিং শব্দটি আমাদের কাছে নতুন মনে হলেও পরিবেশবান্ধবতার প্রচারণার আড়ালে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার্থে এর প্রবণতা অনেক পুরনো। গ্রীনওয়াশিং বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে ১৯৮৬ সালে। এবং গ্রীনওয়াশিং শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মার্কিন পরিবেশকর্মী জে ওয়েস্টারভেল্ট। পরবর্তীতে পরিবেশবান্ধবতার নামে বিভ্রান্তিকর প্রচারণাকে বোঝাতে গ্রীনওয়াশিং বা সবুজ ধোঁকাবাজি শব্দটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশেও গ্রীনওয়াশিংয়ের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সময়ে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। অনেক ভোক্তাই এখন পণ্য কেনার সময় পণ্যটি পরিবেশবান্ধব কিনা তা যাচাই করেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা ব্রান্ড নিজেদের পণ্য ও কার্যক্রমকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে তুলে ধরছে। এছাড়াও বাংলাদেশের মানুষের পরিবেশ নিয়ে সচেতন হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বৃক্ষরোপণ ও প্লাস্টিক পরিহারের মতো বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নিজেদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করছে । পণ্যের মোড়ক,লোগো, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব, ইকো-ফ্রেন্ডলি, শতভাগ প্রাকৃতিক ও টেকসই এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে তাদের সকল কার্যক্রম পরিবেশবান্ধব। অথচ তাদের কার্যক্রম বা দাবির সঙ্গে বাস্তবতার কোন সামঞ্জস্য নেই। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে নিজেদের ভাবমূর্তি সবুজ বা পরিবেশবান্ধব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। আর এই পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরীর আড়ালে রয়েছে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের চেষ্টা। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সত্যিকার অর্থে পরিবেশবান্ধব হতে চায় তাহলে তাদের প্রযুক্তি, গবেষণা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ করতে হবে। যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম হিসেবে শুধু বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার পথ বেছে নেয়। বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মাধ্যমেই যদি পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরি করা যায় তাহলে তা তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল। এভাবে কম খরচে প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে পারে। ফলে পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফাও বৃদ্ধি পায়। এভাবে গ্রীনওয়াশিং বা সবুজ ধোঁকাবাজির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভোক্তা এবং পরিবেশের উপর। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে আমাদের পরিবেশ। পরিবেশ দূষণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে প্রচারণায় গুরুত্ব দেওয়ায় নদী-নালা, বায়ু ও বনাঞ্চলের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। শুধু তাই নয়,পরিবেশবান্ধব মনে করে পণ্য কিনলেও পরবর্তীতে ভোক্তারা বিভ্রান্তিতে পড়েন। ফলে ভোক্তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে আস্থা হারান। অন্যদিকে প্রকৃত পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের বদলে প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় পরিবেশ রক্ষার কার্যকর পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক প্রতারণা নয় বরং পরিবেশ রক্ষায় সচেতন মানুষদের বিশ্বাসের সঙ্গেও এক ধরনের প্রতারণা। গ্রীনওয়াশিং বা সবুজ ধোঁকাবাজির এই ফাঁদ থেকে পরিবেশকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে প্রথমত, রাষ্ট্রীয় আইনি পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত,কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডগুলোর পরিবেশবান্ধব দাবিগুলোর যথাযথ যাচাই ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এবং এ ধরনের দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক ও ল্যাব টেস্টের প্রমাণ দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা প্রমাণিত হলে, বড় অঙ্কের জরিমানা সহ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। চতুর্থত, গ্রীনওয়াশিং বা সবুজ ধোঁকাবাজি বন্ধ করতে শুধু কঠোর আইন নয়, প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা ও ভোক্তাদের সচেতনতা। এবং ভোক্তাদেরও পণ্য কেনার সময় এর পরিবেশবান্ধবতার দাবির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ষষ্ঠত,পরিবেশ রক্ষায় নেওয়া উদ্যোগগুলোর বাস্তব ফলাফল নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। সেই সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য হতে হবে পরিবেশ রক্ষায় বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। প্রকৃত পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম ও সঠিক তথ্যই ভোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। সেই সাথে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো, রাষ্ট্র ও ভোক্তাদের সম্মিলিত সচেতন ও প্রচেষ্টাই পারে গ্রীনওয়াশিং বা সবুজ ধোঁকাবাজি রোধ করতে। আর এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গ্রীনওয়াশিং রোধ করে গড়ে তুলতে হবে পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য পৃথিবী।
