বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাউন্ডুলে কন্যা

Author

সেঁজুতি মুমু , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ২৯ বার

“কুড়িতে বুড়ি!”- আমার বিশ বছর বয়সের জন্মদিনে এই কথাটা না জানি কতবার শুনেছি। সবাই মজা করেই বলেছিল যদিও। কিন্তু তারপর ভাবনাটা আমায় পেয়ে বসেছিলো, আসলেই কি কুড়িতে বুড়ি হয়? তারপর ভাবনা ছেড়ে দিয়েছি, এখন কুড়ি পেরিয়েও বছর কয়েক পেরোতে চলল। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই বয়সী একজন নারী যদি অবিবাহিত থাকে, তাহলে তাকে কি দৃষ্টিতে দেখা হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! আমাদের পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সবাইকে মুল্যায়ণ করা হয় তাদের কাজ ও সামর্থ্য দিয়ে। আমার বয়সী একজন মেয়ে হয় বিয়ে করে নিজের সংসার সামলায়, নয়ত চাকরি বা নিজের ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যায়। ভাবতে পারেন এই বয়সী একটা মেয়ে বাউন্ডুলে হলে সমাজ তাকে কি দৃষ্টিতে দেখবে? হাহা! প্রথমে শুনেই তো নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ভাবছেন “মেয়ে মানুষ আবার বাউন্ডুলে কিভাবে হয়!” আমাদের সমাজ বাস্তবতার সাথে এটা ঠিক যায় না। কিন্তু আমি আজ একজন বাউন্ডুলে কন্যার গল্প বলবো। সেই নারীকে আমি খুব কাছ থেকে চিনি। কুড়ি পেরিয়েছে কয়েক বছর হলো। বর্তমানে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। কিন্তু তার একটা বিশেষ রোগ আছে যাকে বলে, “apathy” বাংলায় যার অর্থ কোনো বিষয়ে আগ্রহের অভাব! তাই ওকে আমি বাউন্ডুলে কন্যা বলি। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে, কয়দিন পর পড়া শেষও হবে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে ওর কোনো চিন্তা নেই। ও যেন বর্তমানেই বাঁচতে পছন্দ করে। বিয়ে, সংসার এসবের চিন্তা ওর মাথায় আসেই না। চাকরি বা ব্যবসার কথা যখন কেউ বলে তখন সামাজিকতার খাতিরে দু একটি কথা সে বলে। কিন্তু ওই যে বললাম ওর বিশেষ রোগ Apathy! তাই বলে সব বিষয়ে ও অনাগ্রহী তা নয়। জীবন নিয়ে ওর ভীষণ আগ্রহ। ও শুধু বাঁচতে চায়। যেন মানুষরুপী পাখি, শুধু উড়তে চায়। ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যায়, কিন্তু স্যারের লেকচারে ওর মন বসে না। ওর মন পড়ে থাকে লাইব্রেরিয়ান আপুর দুই বছরের বাচ্চাটার খেলার দিকে। বাচ্চাদের নিয়ে ওর বিশেষ আগ্রহ। কেন ও নিজেও জানে না! এই বয়সেও বাসায় গেলেই ওকে খুঁজে পাবেন বাচ্চাদের দলে। দেখে মনে হয় শিং ভেঙে বাছুরদের দলে ঢুকে পড়েছে! ছুটির সময় বাসায় গিয়ে সারাদিন মাঠে ঘাটে বাচ্চাদের সাথে খেলে, বর্ষার জল জমলে ফুটবল নিয়ে বাচ্চাদের সাথে খেলতে মেতে ওঠে। তখন ও যেন এক ভিন্ন জগতে থাকে। কিন্তু এই সমাজ ওর এই কার্যকলাপগুলো বড়ো আড় চোখে দেখে। কত কিছুই না বলে ওকে। কিন্তু ওর হলো গন্ডারের চামড়া, কোনো কথা ওর গায়ে লাগে না। ছুটি শেষে হোস্টেলে ফিরে সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। আর ও উড়ে বেরোয় নিজের মতো। অকারণে রিক্সায় করে ঘুরে বেরোয়, কোনো গন্তব্য নেই, যেদিকে মন চায় চলে যায়। রাস্তায় কোনো লোভনীয় খাবার দেখলে নেমে পরে খেতে। ভীষণ পেটুক! তবে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার বেলায় ওকে পাবেন না। ফলে দুদিন পর পর অসুস্থ হয়। তাও শুধরোয় না। এই এক নেড়াকে আমি দেখেছি যে বারবার বেলতলায় যায়! ও বই পড়ে না এমনটা নয়। কিন্তু সবার মতো কষ্ট করে পড়ে না। ওর যখন মন চায় ঘরে বসে একবারে তিনশ পৃষ্ঠার বই শেষ করে দেয়। আবার কোনোদিন মন না চাইলে ওকে দিয়ে কেউ এক লাইনও পড়াতে পারবে না। এই আধুনিক যুগেও ও যেন মধ্যযুগে পড়ে আছে। পিডিএফ বই ওর পছন্দ নয়। মুদ্রণ করা বই চাই ওর। নতুন বইয়ের পাতার গন্ধ শুকবে আর পড়বে। কখনো কখনো না পড়ে, শুধু বইটা নিয়ে নতুন পৃষ্ঠার গন্ধ উপভোগ করে। সবাই বলে ওর মা ওকে শাসন করে না কেন? কিন্তু কে বুঝবে ওর মা যে ক্লান্ত! এই মেয়েকে শাসনের ডোরে বাঁধা অসম্ভব। তাই উনি ওকে নিজের মতো বাঁচতে দেন। কি করবেন একমাত্র সন্তান! এই আদরে আমাদের মহাশয়া আরও বাঁদর হয়েছেন। পুঁজিবাদি সমাজের দৃষ্টিতে দেখলে ওর কোনো প্রয়োজন এই সমাজে নেই। কিন্তু যদি দর্শনের দৃষ্টিতে দেখেন তবে বুঝবেন আমাদের সমাজে ওরই দরকার! যে এই পুঁজিবাদি সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মতো বাঁচতে জানে। এই মেয়েটাকে আমার বেশ লাগে। আমি রোজ ওকে দেখি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ওর সাথে কত যে কথা বলি। হু আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালে, আয়নায় যাকে দেখা যায় সেই হলো আমাদের বাউন্ডুলে কন্যা!

লেখক: সদস্য, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।