শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মনোরেল কতটা কার্যকর?

Author

Rusaid Ahmed, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ২৭ বার

রুশাইদ আহমেদ | ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত মাসে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মনোরেলকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন রাজধানীর একটি সভায়।

এরপর থেকেই বহু বাংলাদেশির মাথায় মনোরেল নিয়ে প্রশ্ন জাগছে। কেউ বলছেন, কী এই মনোরেল? কারোর কারোর আবার ভাবনা, কেন দরকার এটি বাংলাদেশে? অনেকে আবার সন্দিহান হয়ে পড়ছেন আসলেই কি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মনোরেল যুগোপযোগী হবে কি-না, তা নিয়ে।

মনোরেল আসলে কী?

সাধারণত, মনোরেল হলো এমন এক ধরনের রেল যোগাযোগ পদ্ধতি, যেখানে ধাতব ট্র্যাকের পরিবর্তে ফ্লাইওভারের বিমের ওপর দিয়ে হালকা গড়নের রেল বাহন চলাচল করে থাকে। এটি ফ্লাইওভারের গ্রিডের নিচে ঝুলিয়ে কিংবা পাতালেও স্থাপন করা যেতে পারে। টানেল অবকাঠামোতেও এটি চলনসই।

এই ব্যবস্থায় শুধু সিঙ্গেল ট্র্যাক থাকে। ফলে স্বল্প স্থানের মধ্যেই পুরো কাঠামো বিদ্যমান থাকতে পারে।

মনোরেলের উদ্ভব যেভাবে

আদতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ইউরোপ, বিশেষত যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও জার্মানির প্রকৌশলীদের মাথায় এই ধারণাটির জন্ম হয়। ১৮০০ সাল নাগাদ তাঁরা একক বিম কিংবা উঁচু স্থাপনার ওপর দিয়ে তুলনামূলক কম ওজনের ঘোড়ার গাড়ি ও কাঠের যানের রেকের সাহায্যে যাত্রী এবং মালামাল বহনের বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেন।

এরই ধারাবাহিকতায়, ১৮২০ সালে রুশ বিজ্ঞানী ইভান এলমান্ড কাঠ নির্মিত একটি সিঙ্গেল রেল ট্র্যাক তৈরি করেন ব্যবস্থাটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। এটিকেই নগরবিদেরা মনোরেল উদ্ভাবনের প্রথম ধাপ বলে উল্লেখ করেন।

তবে মনোরেলের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে ইউরোপের অপর প্রান্তে। এলমান্ডের উদ্ভাবনের এক বছরের না পেরোতেই, ১৮২১ সালে যুক্তরাজ্যের প্রকৌশলী হেনরি রবার্টসন পালমার মনোরেল ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ মডেল উদ্ভাবন করে নিজের নামে পেটেন্ট সংগ্রহ করেন। এরপর ১৮২৫ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের চেশান্ট রেলওয়ে বাণিজ্যিকভাবে মনোরেল ব্যবস্থায় যাত্রী পরিবহন শুরু করে।

মনোরেলের বিস্তৃতি কোথায় কোথায়?

মনোরেলের ধারণা বেশ অনন্য হলেও, বিশ্বের সব স্থানে সমানভাবে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। ভিন্ন আঙ্গিকের অবকাঠামোগত পদক্ষেপ এবং পরিচালন পদ্ধতির কারণে সকল দেশ এটিকে এখনও সার্বজনীন যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ।

তবুও বেশকিছু উন্নত দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মনোরেলের তুমুল কদর রয়েছে। এই তালিকায় সবার প্রথমে রয়েছে জাপান। দেশটির টোকিও, ওসাকা, চিবা, কিতাকিউশুর মতো শহরগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মনোরেল সমাদৃত হয়ে আসছে।

একইভাবে, চীনের পাহাড়ি ও ঘনবসতিপূর্ণ চংকিং প্রদেশে মনোরেল কার্যকর যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও ইনচন অঞ্চলের বাসিন্দারা ব্যাপক হারে এই পরিষেবা ব্যবহার করে থাকেন।

অপর দিকে, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহরের যানজট নিরসনেও মনোরেল ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। মালয়েশিয়ার কুয়ালামাপুরের পর্যটকদের কাছেও এটি ভিন্ন মাত্রার বাহন। সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ নগর যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে মনোরেলের ব্যবহার ব্যাপক।

খোদ মার্কিন মুলুকের লাস ভেগাস, সিয়াটল ও ডিজনি ল্যান্ডের মতো এলাকাগুলোতেও এই যানের চল আছে। আর জার্মানির ভুপারটালে ‘শতাব্দীর পুরানা’ ঐতিহাসিক বাহন হিসেবে মনোরেলের খ্যাতি রয়েছে।

মনোরেল ব্যবহারের সুবিধাসমূহ

মনোরেল খুবই দ্রুতগতির একটি বাহন। একইসঙ্গে, তুলনামূলক হালকা ভরের হওয়ায় এটি অনেকটা নিরাপদ। শুধু সিঙ্গেল লাইনে পরিচালনার সুযোগ থাকায় মেট্রোরেল বা অন্যান্য ব্যবস্থার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম জায়গা ব্যবহার করেই এর অবকাঠামো নির্মাণ করা যেতে পারে। যানজটের ঝক্কি-ঝামেলা হ্রাসে এটি কার্যকর হতে পারে।

পাশাপাশি, বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় এতে পৃথকভাবে জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। তাই পরিবেশবান্ধব যান হিসেবে মনোরেল কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া, এটির শব্দ দূষণ সৃষ্টির হারও প্রথাগত ট্রেন ও মেট্রোরেলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। যা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কিংবা পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসরত মানুষদের শ্রবণশক্তির জন্য ক্ষতিকারক নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মনোরেল

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের বড় বড় মহানগরগুলোতে তীব্র যানজট এবং সড়কের ভোগান্তি হ্রাসে মনোরেল একটি কার্যকর উপায় হতে পারে বলে মনে করছেন নগরবিদেরা।

বিশেষ করে রাজধানী শহর ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং শিল্পনগর ও পৌরশহর নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সড়কে বিদ্যমান অত্যধিক মাত্রার যানবাহনের চাপ কমাতে মনোরেল ব্যবস্থা হতে পারে চমৎকার বিকল্প।

উপরন্তু, ঢাকার মেট্রোরেলের অবকাঠামোর মতো অতিরিক্ত খোঁড়াখুঁড়ির কার্যক্রমেরও প্রয়োজন না পড়ায় এটি জনদুর্ভোগও ব্যাপক হারে হ্রাস করতে পারে। আবার, মেট্রোরেল যোগাযোগ সব স্থানে নির্মাণ সম্ভব না হওয়ায়, মনোরেলকে দরকারি স্থানগুলোতে তার পরিপূরক হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে ঢাকাতে।

বাস্তবতা ও সম্ভাবনা

এসব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় মনোরেল বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যুগান্তকারী মাত্রায় উন্নীত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এরপরও কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতাও এক্ষেত্রে বিরাজমান।

বিশেষত, বিগত সরকারের আমলে হওয়া ব্যাপক আর্থিক লুটপাট, অর্থ পাচার এবং মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কায় বর্তমানে দেশের অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে পড়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মোতাবেক, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে শুধু পাচারই হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। যা দেশের মোট জিডিপির ৩.৪% (প্রথম আলো, ২ ডিসেম্বর ২০২৪)। এ ছাড়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নানা চড়াই-উৎরাই পার করেছে গত দেড় বছরে।

এমতাবস্থায়, মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্তকে বেশ জটিল ও সাহসী পদক্ষেপ বলে আখ্যা দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদেরা। একইসঙ্গে, এটির রুট একমুখী হওয়ায়, পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুসারে তা পরিবর্তন করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে মনে করছেন কেউ কেউ।

অধিকন্তু, মেট্রোরেলের চেয়ে মনোরেলের যাত্রী ধারণ ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে বেশ কম। এ কারণে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এটি লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় দরকার পড়বে প্রশ্নাতীতভাবে। এতকিছুর পরও নতুন সরকার মনোরেল নিয়ে কী পরিকল্পনামাফিক আগাবে–সেটিই এখন দেখার বিষয়।

• রুশাইদ আহমেদ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। নিয়মিত ভূরাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য, যোগাযোগ নিয়ে লিখে থাকেন। মেইল: rusaidahmed02@gmail.com

লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!