অভিযোগ নয়, উদ্যোগ হোক পরিবর্তনের পথ

আমাদের চারপাশে একটি সাধারণ অভ্যাস খুব দৃঢ়ভাবে গড়ে উঠেছে- অভিযোগ করা। কেউ বলেন, দেশে কিছু হয় না, কেউ বলেন, মানুষের নৈতিকতা শেষ হয়ে গেছে, আবার কেউ আক্ষেপ করে বলেন, এই সমাজে ভালো মানুষ টেকে না। কিন্তু আমরা খুব কমই প্রশ্ন করি- আমি নিজে কী করছি পরিবর্তনের জন্য? সমাজ, দেশ বা পরিবেশ- কিছুই বদলাবে না, যদি আমরা কেবল আঙুল তুলি, কিন্তু নিজের দায়িত্বটা না বুঝি। পরিবর্তনের সূচনা সবসময় অভিযোগ থেকে নয়, বরং উদ্যোগ থেকেই হয়।
অভিযোগ করা সবচেয়ে সহজ কাজ, কারণ তাতে কোনো ঝুঁঁকি নেই। কিন্তু উদ্যোগ নিতে হয় সাহস নিয়ে, সময় দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে। যে সমাজে মানুষ নিজের দায়িত্ব বুঝে কাজ করতে শুরু করে, সেই সমাজই এগিয়ে যায়। ইতিহাসের প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে কোনো না কোনো ব্যক্তির ছোট উদ্যোগই কাজ করেছে- সেটা হোক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে কিংবা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন সমাজে নৈতিকতা ও সহমর্মিতা কমে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই একই জরিপে ৮৩ শতাংশ মানুষ বলেছেন, এই পরিস্থিতির জন্য অন্যরা দায়ী। অর্থাৎ, আমরা সমস্যা দেখি, কিন্তু নিজেদের ভূমিকাকে দায়ী মনে করি না। আমরা বলি সরকার কিছু করছে না, কর্তৃপক্ষ অদক্ষ- কিন্তু প্রশ্ন করি না, আমি কী করছি?
তবে সুখের বিষয় হলো, বাংলাদেশে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা অভিযোগ নয়, উদ্যোগের পথ বেছে নিয়েছেন। যেমন, বিডি ক্লিন- একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যারা পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে। এ সংগঠনের সদস্যরা বিশ্বাস করেন, আমি পরিচ্ছন্ন, বাংলাদেশ পরিচ্ছন্ন। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় তাদের সদস্য রয়েছে, সংখ্যা এখন ৫০ হাজারেরও বেশি। বিডি ক্লিন- প্রতি শুক্রবার বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছায় রাস্তা, পার্ক, বাজার ও সরকারি স্থাপনা পরিষ্কার করে।
তাদের কার্যক্রমের বিশেষত্ব হলো, এটি পুরোপুরি স্বেচ্ছাসেবী- কোনো পারিশ্রমিক বা আর্থিক সহায়তা ছাড়াই মানুষ নিজেদের সময় ব্যয় করেন কেবল দেশের জন্য কিছু করার তাগিদে। ঢাকায়, চট্টগ্রামে, রাজশাহীতে কিংবা খুলনায়- প্রতিটি শুক্রবার তাদের স্বেচ্ছাসেবীরা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে হাতে গ্লাভস পরে ময়লা পরিষ্কার করেন, ব্যানার ঝুলিয়ে মানুষকে সচেতন করেন। এ দৃশ্য আমাদের শেখায়, উদ্যোগ মানেই পরিবর্তনের বীজ।
২০২৩ সালের জুন মাসে বিডি ক্লিন- দুই ঘণ্টার মধ্যে সারা দেশে ৩ লাখ গাছ রোপণ করেছিল- এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় স্বেচ্ছাসেবী বৃক্ষরোপণ অভিযান। সংগঠনের মূল লক্ষ্য শুধু পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগানো। তাদের একটি মূলমন্ত্র হলো, “পরিবর্তন শুরু হোক আমার থেকেই।” এই একটি বাক্যই আসলে আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে দরকারি শিক্ষা।
অভিযোগের সংস্কৃতি আমাদের ভেতরের ইতিবাচক শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। আমরা যত বেশি দোষারোপ করি, ততই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ি। অন্যদিকে, উদ্যোগ মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যারা নিজের হাতে কিছু পরিবর্তন ঘটাতে চেষ্টা করে, তারা আশা দেখতে শেখে। একজন মানুষ যদি নিজের বাসার সামনে ময়লা না ফেলে, অফিসে কাগজ অপচয় না করে, অথবা প্রতিদিন এক মিনিট সময় নিয়ে নিজের টেবিল পরিষ্কার রাখে- সেটিও উদ্যোগ।
পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। এটি আসে ধারাবাহিক ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে। সমাজে প্রতিটি বড় পরিবর্তনের শুরু হয় কোনো একজন সচেতন মানুষের ছোট সিদ্ধান্ত থেকে। যে তরুণ প্রতিদিন বন্ধুদের নিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করছে, যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলার অভ্যাস গড়ে তুলছেন, কিংবা যে বৃদ্ধ প্রতিবেশীর জন্য দরজা খুলে রাখছেন- তারাই প্রকৃত পরিবর্তনের কারিগর।
আমাদের সমাজে হাজারো মানুষ আছেন যারা চুপচাপ নিজেদের মতো করে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা প্রচার চান না, প্রশংসাও না; তাদের একটাই লক্ষ্য- দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। এই মানুষগুলোই আসলে বাংলাদেশের আসল শক্তি। বিডি ক্লিন- সেই শক্তিকে সংগঠিত করেছে- প্রমাণ করেছে, অভিযোগ নয়, উদ্যোগই পারে জাতিকে এগিয়ে নিতে।
অভিযোগ কেবল নেতিবাচকতা বাড়ায়, কিন্তু উদ্যোগ আত্মতৃপ্তি ও অনুপ্রেরণা দেয়। উদ্যোগ মানুষকে একত্র করে, একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নিজের অবস্থান থেকে সামান্য কিছু করে- একটি গাছ লাগায়, একজন শিশুকে শিক্ষার সুযোগ করে দেয়, বা শুধু রাস্তায় ময়লা না ফেলে- তাহলেই পরিবর্তনের ধারাটা শুরু হয়ে যাবে।
আমরা প্রায়ই বলি, দেশের অবস্থা খারাপ। কিন্তু যদি প্রত্যেকে নিজের চারপাশে সামান্য উন্নতি আনে, তবে পুরো দেশের অবস্থা বদলে যাবে। রাষ্ট্র, সরকার, সংস্থা- সবাই পরিবর্তনের অংশ, কিন্তু আসল চালিকাশক্তি আমরা সাধারণ মানুষ। তাই সময় এসেছে অভিযোগের দেয়াল পেরিয়ে উদ্যোগের পথ বেছে নেওয়ার।
লেখক : শিক্ষার্থী, তাড়াইল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ
sajedulshanto21@gmail.com
