“তুষারময় পাহাড় ও গভীর সমুদ্র যখন নৈসর্গিক প্রতিবেশী”🗻🌊

একদা ছিল সেই গাঢ় নীল গভীর জলধি,
সেখানে বাস করতো এক অপরূপ রাজকন্যা জলপরী।
রূপে গুণে ছিল সে বেশ পারদর্শী,
যেন সর্বে সর্বা মেয়েটি।
একদিন পেল তার সখীদের দেখা,
শুনলো কান পেতে তার প্রতিবেশীর গাঁথা।
প্রতিবেশী যেন তার থেকে নাহি কোনো কম,
রূপে গুণে সে শ্রেষ্ঠ তা চারিদিকে সরাগম।
ছিল সে তুষারময় পর্বতমালার দুহিতা, বেশ সুন্দরী ও জ্ঞানী;
গায়ের রং ও পরনে সবই তার পবিত্র তুষার শুভ্র,
চাহনি ও স্বভাবেও সে শান্ত মায়াবতী।
যখন মন চায় গুণবতী উড়ে বেড়ায় সাদা বক হয়ে,
আবার ফিরে আসে তার প্রকৃত রাজকুমারীর বেশে।
চোখ গেল সাগরিকার ঠিক খুব কাছের,
সামনের পর্বতমালার দিকে সব শুনে;
অগণিত প্রশ্ন আসতে থাকে তার মনে।
কিন্তু কে জানিতো যে ওই সমুদ্রের তনয়ার কথা ভেবে,
একই ভাবে তার প্রতিবেশীও চেয়ে থাকে তার ঠিক সামনের সাগরের পানে?
বরফ ঘেরা পর্বত শৃঙ্গের মাঝে তার বরফের স্বচ্ছ প্রাসাদ, ভিতর ও বহির্মুখ –
তার প্রতিবেশীর অশেষ প্রশংসায় সকলেই পঞ্চমুখ।
সামুদ্রিক ঢেউয়ের ন্যায় ঘন নীলাভ কালো চুল তার,
আঁখি দুটি সাগরের ন্যায় গভীর গাঢ় নীল;
পরনে তার পানির মসৃণ স্রোতের জামা,
ঝিনুক ও মুক্তার গহনা হয়েছে সাথে মিল।
ছিল সে গভীর জলের রূপবতী ও তেজী,
ছিল সে জোয়ারের ন্যায় চঞ্চলা অনেক সাহসী।
গুণ তার নেই শেষ, তবে সবার সেরা –
সে যেকোনো সময় মানুষ, আবার মৎস্যকন্যা।
উভয়েরই মনে জাগে আগ্রহ, জাগে কৌতূহল;
দুজনেই ভাবিলো, কেন তার প্রতিবেশীকে নিয়েই এত কোলাহল?
দু প্রান্তেই দু রাজকুমারীরা মনে মনে করিলো ঠিক,
দেখা করেই যাবো তার সাথে, তাই তো একবার গেলাম সেদিক।
ফলে দু জনেরই হলো দেখা মাঝ যাত্রায়,
উভয়ে অবাক হলো তাদের প্রতিবেশীর দেখায়।
দুজনে হতবাক হয়ে তারা হলো সম্মুখে,
একে অপরের অভিপ্রায় তাদের এত মিলে গেল কীভাবে?
যেই না তারা শুরু করবে কথা মনে মনে ভেবে অধিক,
ঠিক তখনই হাজির হলো এক অচেনা পথিক।
“আমি হলাম এক পথিক, যদি পাই কোনো সাহায্য;
কিন্তু জানি না আদৌ ভালো কেউ পাবো কিনা সেটার জন্য!”
“চিন্তা কেন এত যখন পেয়ে গেছোই আমায়?
জলনিধির ন্যায় আমি যে নিখুঁত উদার, তোমার উপকার করায়।”
“করো না কো এত বড় ভুল, এমন সুযোগ যে অমূল্য;
কেননা আমি যে দেবো তোমায় – সেই বরফের মতো
নির্মল নির্দাগ আনুকূল্য।”
রাজকুমারী দুজনে তাকালো একে অপরের দিকে খানিকটা রেগে,
সেই কন্দল থামাতেই পথিক ছুটে এলো দ্রুত বেগে।
“আরে আরে করো না কো আপনারা ঝগড়া,
যাই না কি একটা প্রতিযোগিতা করা?
যে হবে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী –
সে হবে আমার উদ্ধারে ভালো বেশি।”
অবশেষে চার দিন পর হলো সেই বহু আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা,
বিজয়ী হতে দৃঢ় মনোবল নিয়ে উপস্থিত নির্ভয়ে রাজকুমারীরা।
রয়েছে দুটি ধাপ এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগে,
প্রথমে পরিবেশন রত্নের, শেষে যুদ্ধ হবে।
সব শুনে সখীরা ও পাড়া-সমাজের জনগণ সবাই রইলো অধীর অপেক্ষায়…
রাজি হলো বারিধি ও গিরি এত সব নিয়মের কথায়।
শুরু হলো প্রথম দফা — রত্ন পরিবেশন,
সব কিছু আনতে দু জনে ব্যস্ত, অঢেল আয়োজন।
এলো ধবধবে সাদা বরফ, বই, পাথর বিরল;
এলো চকচকে উজ্জ্বল মুক্তা, শামুক ও ঝিনুক রত্নাকরের গভীর অতল।
জড়ো হলো সমস্ত রত্ন, রাজকীয়তা ও অলংকার;
জড়ো হলো সমস্ত সম্পদ, আভিজাত্য ও অহংকার।
পরিবেশিত হলো সব দুটি আলাদা অনেক বড় উঁচু স্তূপে,
এখন দু জনে বিজেতা, কিন্তু জয়ী যে কেবল একজন, তা স্থির যে শেষ ধাপে।
হলো সেই দ্বিতীয় বা শেষ ধাপ আরম্ভ –
যেখানে কেবল একজনই পাবে বিজয়ের দম্ভ।
শুরু হলো দু রাজকুমারীর মধ্যে তীব্র লড়াই,
কারণ যে কেবল একজনই পারবে করতে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার বড়াই।
বরফ তুষারের আভা, ঠান্ডা শীতল হাওয়া;
কখনো বা হলো সাদা বক, সাথে শৈলের মতো অটল ছোঁয়া।
অগাধ তোয়ধির লহরী যেন মিশে আছে তার ভঙ্গিতে,
রণ-নৃত্যে তার উত্তাল জলোচ্ছ্বাস;
কখনো বা মানুষের রূপে, যেন নীল সায়রের প্রবাহ তারই নিঃশ্বাস।
ঘণ্টা পর ঘণ্টা যখন তারা হলো রণ ক্লান্ত,
তখনই তারা হলো একটু খানি শান্ত।
ধীরে ধীরে ক্রমশ কমিলো তাদের শক্তি,
বুঝে উঠতে পারলো না কেউ এই ঘটনার যুক্তি।
হঠাৎ মনে পড়লো তাদের সেই পথিকের কথা –
পেলো না যে কেউই তার কোনোখানি দেখা।
ধীরে ধীরে পেলো টের সে যে নয় কোনো পথিক,
ছিল এক কুখ্যাত চোর; সে কালো ছায়া যে ধ্বংসের প্রতীক।
অবিলম্বে গেলো তারা ওই অশুভ কালো অবয়বের কাছে –
পৌঁছে গেলো তার আড্ডায় খানিকটা আগে, ফলে এখনো সময় আছে।
বিশ্বাসঘাতক কালো ছায়া তার খিলখিল হাসি –
মারবে উভয় রাজকুমারীকে, পৃথিবী এখন তার হাতের মুঠোয়;
এখন সবাই তার দাসী।
সব বুঝে এক হলো দুই রাজকুমারী মিলে,
বৈরীকে হারিয়ে সবাইকে যে বাঁচাতে হবে, সব কন্দল তুলনা ভুলে।
শিখরীর আবহাওয়া ও সিন্ধুর কল্লোল মিলে হলো এক শক্তি অদম্য –
অবশেষে হলো কালো ছায়া শত্রুর পরাজয় ও অবসান,
এ তুমুল যুদ্ধে পেলো রাজকুমারীরা এক অসম্ভব অদিতীয় সাফল্য।
আরেকটু দেরি হলেই যে তাদের সব হারিয়ে যেতো –
সূর্য ডোবার সময়ের আগেই মূল্যবান শক্তি ও সম্পদ,
সব ফিরে পেয়ে তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
সূর্যাস্ত একসাথে দেখতে দেখতে হলো দুজনেরই উপলব্ধি,
তারা দুজনেই ভিন্ন তবুও দু রকমের সেরা — পেলো উভয়েই এ অনুভূতি।
নির্বিঘ্নে ফিরে এলো সকলের মাঝে, চূড়ান্ত স্থির হলো দু জনেই বিজয়ী;
সব বুঝে দর্শক হলো খুশি ও দিলো হাততালি।
আর রইলো না কোনো তুলনা, আর নেই কোনো দ্বন্দ্ব;
হয়ে গেলো গভীর মিল, এখন বন্ধু আপন ঘনিষ্ঠ।
তুষারময় পাহাড় ও গভীর সমুদ্রের দুই রাজকুমারী,
এভাবেই সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলো দুই নৈসর্গিক প্রতিবেশী।
– মেহেক আধভী,
Session: 2024-25,
ESOL, IML, University of Dhaka.

