বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বয়সন্ধির মানসিক পরিবর্তন ও কিশোরী জীবনের সংকট

Author

সাদিয়া সুলতানা রিমি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৮৬ বার

বয়সন্ধির মানসিক পরিবর্তন ও কিশোরী জীবনের সংকট

সাদিয়া সুলতানা রিমি

  • বয়সন্ধি মানুষের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়। এটি শৈশব থেকে যৌবনে প্রবেশের একটি সেতুবন্ধন, যেখানে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনও গভীরভাবে ঘটে। বিশেষ করে কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই সময়টি আরও জটিল ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কারণ শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক প্রত্যাশা, পারিবারিক চাপ, আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন এবং আবেগের ওঠানামা সবকিছু একসাথে কাজ করতে থাকে। ফলে অনেক সময় তারা নিজের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা, দ্বিধা এবং সংকট অনুভব করে।

 

বয়সন্ধির শুরু সাধারণত ১০ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে হয়ে থাকে, তবে এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। এই সময়ে কিশোরী শরীরে হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে শারীরিক গঠন, উচ্চতা বৃদ্ধি, ত্বকের পরিবর্তন এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবর্তন দেখা দেয়। কিন্তু এই শারীরিক পরিবর্তনের চেয়েও বড় প্রভাব পড়ে মানসিক অবস্থায়। অনেক কিশোরী হঠাৎ করে নিজেদের নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে, আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দেয়, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

 

এই সময়ের অন্যতম প্রধান মানসিক পরিবর্তন হলো পরিচয় সংকট বা Identity Crisis। কিশোরীরা তখন বুঝতে চেষ্টা করে “আমি কে?”, “আমার ভূমিকা কী?”, “সমাজ আমাকে কীভাবে দেখে?” এই প্রশ্নগুলো তাদের মনে বারবার আসে। শৈশবের নির্ভার জীবন থেকে হঠাৎ করে দায়িত্ব ও সামাজিক প্রত্যাশার জগতে প্রবেশ তাদের জন্য সহজ হয় না। ফলে অনেক সময় তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং নিজের সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা অনুভব করে।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো আবেগের অস্থিরতা। এক মুহূর্তে তারা খুব খুশি, আবার পরক্ষণেই মন খারাপ হয়ে যায়। ছোট ছোট বিষয়েও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া, কারণ এই সময় মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ এখনো পরিপূর্ণভাবে পরিণত হয়নি। কিন্তু এই পরিবর্তন যদি পরিবার ও সমাজ বুঝতে না পারে, তাহলে কিশোরীকে “অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ” বা “জেদি” হিসেবে ভুলভাবে মূল্যায়ন করা হয়, যা তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

 

এই বয়সে আত্মসম্মানবোধ (Self-esteem) একটি বড় ভূমিকা রাখে। কিশোরীরা নিজেদের চেহারা, পোশাক, কথা বলার ধরন, এমনকি চলাফেরার বিষয়েও অতিরিক্ত সচেতন হয়ে ওঠে। সামাজিক মিডিয়ার যুগে এই চাপ আরও বেড়ে গেছে। তারা প্রায়ই নিজেদের অন্যদের সাথে তুলনা করে এবং মনে করে যে তারা যথেষ্ট সুন্দর বা যোগ্য নয়। এই তুলনামূলক মানসিকতা অনেক সময় আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং হতাশার জন্ম দেয়।

 

পারিবারিক সম্পর্কও এই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিশোরীরা একদিকে স্বাধীনতা চায়, আবার অন্যদিকে নিরাপত্তাও চায়। কিন্তু অনেক পরিবার তাদের এই পরিবর্তনকে বুঝতে না পেরে কঠোরতা বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করে। ফলে কিশোরীরা নিজেদের কথা প্রকাশ করতে ভয় পায় বা চুপ হয়ে যায়। এই যোগাযোগের অভাব ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি করে। আবার কিছু পরিবার একেবারেই উদাসীন হলে কিশোরীরা একাকীত্ব অনুভব করে। তাই এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ পারিবারিক আচরণ।

 

স্কুল ও শিক্ষাজীবনেও এই সংকট প্রতিফলিত হয়। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে মানসিক চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায় না, তারা বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগে। অনেক সময় তারা মনে করে, তারা অন্যদের মতো ভালো পারছে না, যা তাদের মধ্যে ব্যর্থতার ভয় তৈরি করে।

 

বন্ধুত্বের সম্পর্কও এই বয়সে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিশোরীরা বন্ধুদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কারণ এই সময় তারা পরিবারের চেয়ে বন্ধুদের সাথে বেশি কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু কখনও কখনও ভুল বন্ধুত্ব বা চাপের কারণে তারা ভুল সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। আবার বন্ধুত্বে প্রতারণা বা বিচ্ছেদ হলে তা মানসিকভাবে গভীর আঘাত দিতে পারে।

 

এই বয়সে একটি বড় সংকট হলো আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব। সমাজ কিশোরীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কিছু আচরণ প্রত্যাশা করে যেমন শান্ত থাকা, বিনয়ী হওয়া, নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকা। কিন্তু কিশোরীরা নিজের মতো করে বাঁচতে চায়, নিজের মতামত প্রকাশ করতে চায়। এই দুইয়ের সংঘর্ষ অনেক সময় তাদের ভেতরে চাপ সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে পারে না, সমাজের প্রত্যাশা মানবে নাকি নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেবে।

 

এছাড়া এই সময় শরীর নিয়ে সচেতনতা বাড়ে, যা কখনও ইতিবাচক আবার কখনও নেতিবাচক হতে পারে। নিজের শরীরকে গ্রহণ করা অনেক কিশোরীর জন্য সহজ হয় না। সামাজিক মানদণ্ড, মিডিয়ার প্রভাব এবং আশেপাশের মানুষের মন্তব্য তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। ফলে তারা নিজেদের শরীর নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে, যা মানসিক চাপের একটি বড় কারণ।

 

তবে বয়সন্ধির এই পরিবর্তন শুধু সংকট নয়, এটি একটি বিকাশের সময়ও। এই সময়েই কিশোরীরা ধীরে ধীরে নিজেদের ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে, চিন্তাভাবনার গভীরতা বাড়ে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়। তারা ধীরে ধীরে শিখে কিভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কিভাবে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয় এবং কিভাবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

 

এই সময়ের সংকট মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক দিকনির্দেশনা। পরিবার, শিক্ষক এবং সমাজ যদি কিশোরীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে অনেক সমস্যা সহজেই সমাধান করা সম্ভব। তাদের ভুলকে শাস্তি হিসেবে না দেখে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

 

যোগাযোগ এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। কিশোরীরা যদি নিজের মনের কথা খোলাখুলিভাবে বলতে পারে, তাহলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। তাদের কথা শুনে সমাধান দেওয়া উচিত, কিন্তু জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একইসাথে তাদের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ শেখানোও জরুরি।

 

মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা এই সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কিশোরী তাদের আবেগ বা মানসিক চাপকে স্বাভাবিক বলে মনে করে চুপ করে থাকে, যা ভবিষ্যতে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই তাদের মানসিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখানো উচিত এবং প্রয়োজনে সহায়তা নিতে উৎসাহ দেওয়া উচিত।

 

সমাজের ভূমিকা এখানে উপেক্ষা করা যায় না। কিশোরীদের প্রতি নেতিবাচক মন্তব্য, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বা সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। একটি সহানুভূতিশীল ও সমর্থনমূলক পরিবেশ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

 

সবশেষে বলা যায়, বয়সন্ধি একটি পরিবর্তনের সময়, যা সহজ নয় কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরীদের জীবনে এই সময়টি যেমন চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তেমনই সম্ভাবনাময়। সঠিক দিকনির্দেশনা, পারিবারিক সমর্থন এবং সামাজিক বোঝাপড়া থাকলে এই সংকটকে শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। তাদের আবেগ, চিন্তা ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দিলে তারা একটি সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

 

বয়সন্ধির মানসিক পরিবর্তন তাই কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় ধাপ। এই ধাপকে বোঝা এবং গ্রহণ করাই কিশোরী জীবনের সংকট কাটিয়ে ওঠার মূল চাবিকাঠি।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ডেল্টা টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!