শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ইঁদুর দৌড়ের শিক্ষাক্রম ‍ এবং আমাদের বন্দিদশা

Author

রনি মিয়া , গুরুদয়াল সরকারী কলেজ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৯ বার

 

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য আজ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ভুলুণ্ঠিত। শিক্ষার মূল ব্রত যেখানে মানুষের মানবিক ও নৈতিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো, সেখানে বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। আজ বিষয়টি এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, যা কিছু অর্থকরী নয়, তার সবই যেন নিরর্থক। 

নির্দিষ্ট কিছু বিষয়, নির্দিষ্ট সিলেবাস, প্রথম হওয়ার অসুস্থ মানসিকতা এবং একটি ডিগ্রি অর্জন করে বড় চাকরির মাধ্যমে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের প্রবৃত্তি—এই গণ্ডিটিই আজ একটি শিশুর মগজে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য যেন এটাই। একজন অভিভাবককে যদি বলা হয় বাজারে এমন একটি বই এসেছে যা পড়লে পরীক্ষায় শতভাগ কমন পড়বে এবং জিপিএ-৫ নিশ্চিত হবে, তবে তিনি সেটি কিনতে দ্বিতীয়বার ভাববেন না। অথচ তাঁকে যদি সন্তানকে এমন কোনো সাহিত্যের বই কিনে দেওয়ার কথা বলা হয় যা মানবিক গুণ বাড়াতে সাহায্য করবে কিন্তু পরীক্ষায় কোনো নম্বর এনে দেবে না, তবে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া হবে—‘আচ্ছা স্যার, দেখছি!’ 

এই যান্ত্রিকতার শুরু হয় একদম ছোটবেলা থেকেই। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই শিশুর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়—‘তোমাকে ক্লাসে প্রথম হতে হবে, বেশি নম্বর পেতে হবে।’ শিশুটি কারণ জানতে চাইলে তাকে শেখানো হয়—‘নম্বর পেলে নামী-দামি স্কুল-কলেজে ভর্তি হতে পারবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বড় চাকরি পাবে, সুন্দর বাড়ি করতে পারবে ও দামি গাড়িতে চড়তে পারবে। সমাজে মানুষ তোমাকে যোগ্য বলবে।’ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত এই দীক্ষাই দিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশরা যে কেরানি তৈরির ঔপনিবেশিক নীতি আমাদের মগজে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে গেছে, আজও আমরা অধিকাংশ মানুষ তা মুখ বুজে মেনে নিচ্ছি। এর বাইরে কিছু ভাবা যেন আমাদের জন্য কষ্টকর। শতবর্ষ ধরে চলা এই পরাধীন প্রথাকেই আমরা আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। 

আজ যদি ঘোষণা দেওয়া হয় যে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না, তবে পরদিনই অনেক অভিভাবক আন্দোলনে নামবেন যে পরীক্ষা ছাড়া চলবে না, আমাদের সন্তানরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! অথচ জাপানের মতো উন্নত দেশে ছোট শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ার চেয়ে আগে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেখানে আমাদের দেশে শৈশব থেকেই তাদের নম্বর বা সার্টিফিকেট অর্জনের যন্ত্র বানিয়ে ফেলা হয়। আমাদের দেশে শিশুর বয়স ৫-৬ বছর হলেই প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু হয় মাসিক, অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক পরীক্ষা, জিপিএ-৫ পাওয়ার ইঁদুর দৌড় এবং পাসের অন্ধ প্রতিযোগিতা। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে মায়েরা বসে খোশগল্প করছেন কার বাচ্চা কত নম্বর পেয়েছে। এমনকি তাঁদের নিজেদের মধ্যকার এই প্রতিযোগিতার চাপও সন্তানের ওপর স্থানান্তরিত হয়—কীভাবে অন্যের সন্তান থেকে নিজের সন্তানকে বেশি নম্বর পাওয়াতে হবে! সকালে স্কুল, বিকেলে প্রাইভেট, রাতে হোম টিউটর—লক্ষ্য একটাই, নম্বর পেতেই হবে। আর শিক্ষার্থীদের মানসিকতাও আজ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, অতিরিক্ত চাপ না থাকলে তারা পড়তে বসতেও চায় না। 

গত এক যুগ ধরে আমরা দেখেছি পাসের হার ৯০%, ৯১% কিংবা ৯২%। শিক্ষার্থীদের আচরণ যেমনই হোক, নির্বাচনী পরীক্ষায় যত বিষয়েই ফেল করুক বা বোর্ড পরীক্ষায় যত খারাপই লিখুক না কেন, পাস করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পাসের হার বৃদ্ধির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছিল। শিক্ষকদের অনেক সময় নির্দেশনা দেওয়া হতো পরীক্ষার হলে ‘গার্ড’ শিথিল করার জন্য, নিজ সন্তান বিবেচনা করে খাতা দেখার জন্য এবং যেকোনো মূল্যে শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার জন্য। কারণ রাষ্ট্র বা সমাজ হিসেবে আমরা কেবল এটাই চাই যে তারা যেন কেবল একটি সনদের আবেদন করার যোগ্যতাটুকু অর্জন করে। তাদের সভ্য, নম্র, বিনয়ী ও বুদ্ধিদীপ্ত করে তোলা আমাদের লক্ষ্য নয়; আমাদের লক্ষ্য কেবল পাসের হার বাড়ানো এবং শিক্ষিত বেকারের বোঝা ভারী করা। 

আমরা যেন ঠিক সেই বন্দি পাখির মতো, দীর্ঘদিন খাঁচায় থাকতে থাকতে যারা খাঁচা খুলে দিলেও উড়তে পারে না। স্বাধীনভাবে আকাশে উড়ে যাওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে তারা পুনরায় খাঁচাতেই ফিরে আসে, কারণ তারা ভাবে খাঁচার ভেতরটাই তাদের জন্য নিরাপদ। বাইরে গেলে শিকার হওয়ার ভয় থাকে, খাদ্যের অভাব হতে পারে। আমাদের মগজ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাও আজ সেই বন্দিদশায় আটকে আছে। 

এখন সময় এসেছে এই যান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার। সার্টিফিকেটসর্বস্ব মানসিকতা ত্যাগ করে শিক্ষাকে তার প্রকৃত অর্থে ফিরিয়ে না আনলে জাতির সার্বিক অগ্রগতি কেবল কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাই এখন আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে হবে বহুমুখী—নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও মনুষ্যত্ববোধ তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান, কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা। তবেই আমরা এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে একটি প্রজ্ঞাবান জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব।

লেখক: সাধারন সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।