বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কৃষির প্রাণসত্তা রক্ষায় সিন্ডিকেট ভাঙা জরুরি

Author

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন , কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৯৫ বার

কৃষির প্রাণসত্তা রক্ষায় সিন্ডিকেট ভাঙা জরুরি

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতিতে সার একটি অপরিহার্য উপাদান। ধান, আলু সবজিড়প্রতিটি ফসলের নিবিড় পরিচর্যায় সারের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহার ফলন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাঠে পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং সরকারি গুদামে বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা সঠিক সময়ে বা নির্ধারিত ন্যায্য মূল্যে সার পাচ্ছেন না। এর ফলে সৃষ্ট হচ্ছে এক ‘কৃত্রিম সংকট’, যার পেছনে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত চক্রান্ত। এই সিন্ডিকেটের মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে বাজারদর বৃদ্ধি করা এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে বিপুল মুনাফা লুটে নেওয়া। কৃষকদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই ইনপুট প্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়ার এই কারসাজি সরাসরি কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে, ঋণের বোঝা বাড়ায় এবং চূড়ান্তভাবে দেশের খাদ্য উৎপাদনকে ব্যাহত করে। সরকারি তথ্য বনাম মাঠের বাস্তবতা: সরকারি তথ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, দেশে সারের কোনো প্রকৃত অভাব নেই। বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন এবং বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন যথাক্রমে ইউরিয়া, এমওপি, ডিএপি ও টিএসপি সার নিয়মিতভাবে ডিলারদের মাধ্যমে সারাদেশে বিতরণ করছে। সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় বিপুল পরিমাণ সার আমদানিও নিশ্চিত করেছে, যা মজুতকে শক্তিশালী করেছে। তবে, কাগজে-কলমের এই এটিমুক্ত সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের চিত্রের বিরাট ফারাক রয়েছে। কৃষকরা অভিযোগ করছেন, ডিলাররা নানা অজুহাতে সার বিক্রি না করে মজুত রাখছেন, এবং বিক্রি করলেও সরকারি দামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দাম নিচ্ছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, যেমন কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুর অঞ্চলে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য প্রকট। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, ডিলারদের একাংশ অবৈধ মজুত তৈরি করে কালোবাজারে বেশি দামে সার বিক্রি করছে। এতে স্পষ্ট, সমস্যা কেবল সরবরাহজনিত নয়, বরং এটি বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশলগত অপচেষ্টা এবং আর্থিক দুর্বৃত্তায়ন। ‘ইনপুট তথা সারের অভাবে তাদের উৎপাদন

কৃষকের ওপর সরাসরি প্রভাব ও জাতীয় হুমকি কৃষকরা সময়মতো সঠিক প্রক্রিয়া মারাত্মকরকম ব্যাহত হয়। ফসলের জীবনচক্রে যখন সারের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, ঠিক সেই মুহূর্তে সার না পাওয়ায় ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় (অনেক ক্ষেত্রে ২৫% থেকে ৪০% পর্যন্ত)।

কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা, সাপ্লাই চেইনকে নিয়ন্ত্রণ করা, এবং মাঠ পর্যায়ে সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সারের কারসাজি রোধে সরকারকে জিরো টলারেন্স-কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আজকের এই ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

এতে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন খরচ (বেশি দামে সার কেনা বা একাধিকবার মজুরি দেওয়া) বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে তেমনি ফসলহানির ককিও বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের বোঝা বাড়ে এবং ঋণ

সক্ষমতা হ্রাস পায়। ভঙ্গুর করে তোলে। সঠিক ইনপুট ব্যতীত উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানে শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এট সামগ্রিকভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক গভীর হুমকি।

খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজারের

বহুমাত্রিক প্রভাব সারের

কারসাজির ফলে কৃষকের উৎপাদন কমে গেলে এর ঢেউ সরাসরি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা এর। এবং সাধারণ বাজারে আঘাত করে। উৎপাদন হ্রাস মানে বাজারে খাদ্যের সরবরাহ কমে যাওয়া, যার অনিবার্য পরিণতি হলো খাদ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। এই মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সরকারের ভর্তুকি মূল্যের সার কৃষকের কাছে না পৌঁছে সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাওয়ায় এই ভর্তুকি লিকেজ রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ঘটাচ্ছে। যদি দ্রুত এই সমস্যা সমাধান না করা হয়, তবে খাদ্য আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।

সিন্ডিকেট ভাঙা ও কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ কৃষককে বাঁচাতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে এখনই সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কতিপয় কার্যকর পদক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো- এক, সাপ্লাই চেইন স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল মনিটরিং: সারের মজুত, চাহিদা ও বিতরণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ট্রাকিং সিস্টেমের আওতায় আনতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করে রিয়েল-টাইমে তথ্য আপলোড নিশ্চিত করতে হবে, যা অবৈধ মজুতদারির সুযোগ বন্ধ করবে। দুই, স্থানীয় প্রশাসন ও মনিটরিং ইউনিয়ন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং কৃষি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায়ে সার বিতরণ কার্যক্রম নিয়মিত ও কঠোরভাবেতদারকি করতে হবে। কৃষকদের সমন্বয়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করে চাহিদার সঠিক হিসাব রাখার মাধ্যমে সংকট এড়ানো সম্ভব। তিন, মূল্য সহায়তা ও কঠোর শাস্তি সরকারি দামে সার নিশ্চিত করতে

ডিলারদের অনিয়ম ও অমিল সমনে অবিলম্বে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর

আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে, মধ্যস্বত্বভোগীর

প্রভাব কমাতে ‘সরাসরি নগদ সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সারের ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। চার, প্রযুক্তি ও বিকল্প ব্যবস্থার প্রসার: ‘খামারি অ্যাপ’ এর মাধ্যমে কৃষকদের সারের সঠিক ব্যবহার ও বাজার মূল্য সম্পর্কে তথ্য ও সহায়তা পৌঁছানো যেতে পারে। পাশাপাশি, সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে জৈব সার এবং সমন্বিত উদ্ভিদ পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এর প্রসার ঘটিয়ে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে হবে। এছ কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধি: সার প্রয়োগের সঠিক নিয়ম এবং ন্যায্য মূল্য সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে মিডিয়া, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয়

সংগঠনগুলোকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা, সাপ্লাই চেইনকে নিয়ন্ত্রণ করা, এবং মাঠ পর্যায়ে সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সারের কারসাজি রোধে সরকারকে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আজকের এই ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। সারের কারসাজি রোধ হোক আজই।

লেখক: কলামিস্ট

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!