রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / অণুগল্প / নিবন্ধ

মায়ের হাসি

Author

মোঃ তায়ীম খান , Gopalgonj Science and Technology University, Gopalgonj

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৩৪৪ বার

পৃথিবীতে এমন কোনো আলো নেই, যা মায়ের হাসির চেয়ে উজ্জ্বল। ভোরের প্রথম রোদ যখন জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢোকে, তখন মনে হয় প্রকৃতি হয়তো মায়ের হাসি দেখেই শিখেছে কীভাবে আলো ছড়াতে হয়। সূর্য প্রতিদিন ওঠে, প্রতিদিন ডোবে কিন্তু মায়ের ভালোবাসার কোনো অস্তাচল নেই। সেই আলো চিরকাল জ্বলে, নিঃশব্দে, নিরলসে।

শিশু যখন প্রথমবার চোখ মেলে এই পৃথিবীতে তাকায়, তখন সে যা দেখে তা কোনো দৃশ্য নয় একটি অনুভূতি। সেই অনুভূতির নাম মা। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় এক অদৃশ্য বন্ধন, যা না সময় ছিঁড়তে পারে, না দূরত্ব মুছতে পারে, না মৃত্যু সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে পারে। কারণ যে ভালোবাসা একবার হৃদয়ে গেঁথে যায়, সে ভালোবাসা চিরকালের সম্পদ হয়ে থাকে।

মায়ের হাত পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। ছোটবেলায় যখন রাতের অন্ধকার ভয় দেখাত, মায়ের হাতটা ধরলেই সব ভয় কোথায় পালিয়ে যেত। সেই হাত কখনো নরম ছিল, কখনো রুক্ষ কাজের ভারে, সংসারের ঘানিতে পিষে হয়তো সেই হাতের কোমলতা কমেছে, কিন্তু উষ্ণতা কমেনি এতটুকুও। সেই হাত যখন মাথায় বোলায়, তখন পৃথিবীর সব ব্যথা যেন এক মুহূর্তে থেমে যায়। মনে হয় এই স্পর্শই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওষুধ, যার কোনো বিকল্প নেই।

মা কখনো হিসেব রাখেন না। কতটা ঘুম গেছে, কতটা কষ্ট হয়েছে, কতটা স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে এসব তাঁর কাছে হিসেবের খাতায় ওঠে না। নিজের শখ, নিজের ইচ্ছে, নিজের আকাঙ্ক্ষা সব কিছু তিনি নিঃশব্দে সরিয়ে রাখেন সন্তানের জন্য। রাতের অন্ধকারে একা জেগে যে মানুষটি সন্তানের কপালে হাত রাখেন, তিনি ক্লান্তি চেনেন না কারণ ভালোবাসা কখনো ক্লান্ত হয় না। সন্তানের একটুখানি সুখ, একটুখানি হাসি সেটুকুই তাঁর সারাদিনের পাওনা, সারাজীবনের পুরস্কার।

মায়ের মমতা কোনো শর্ত মানে না। সন্তান ভুল করলেও, দূরে সরে গেলেও, কষ্ট দিলেও মায়ের বুকের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। পৃথিবীর সব ভালোবাসা হয়তো কোনো না কোনো দিন শর্তের মুখোমুখি হয়, প্রত্যাশার ভার বহন করে, হিসেবের দাঁড়িপাল্লায় ওঠে কিন্তু মায়ের ভালোবাসা সেই বিরল আলোর মতো যা অন্ধকার যত ঘন হোক, নিভে যায় না। সন্তান যখন পথ হারায়, মা তখনও বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন নিঃশব্দে, নিরলসে, নিঃস্বার্থভাবে।

জীবনের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে মায়ের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। প্রথমবার স্কুলে যাওয়ার দিন, যখন মনে হয়েছিল পৃথিবীটা বড় বেশি অচেনা মায়ের হাতটা ধরা ছিল। পরীক্ষার আগের রাতে, যখন ভয় আর উদ্বেগ একসঙ্গে এসে মাথায় চাপ দিয়েছে মা চুপচাপ পাশে বসে থেকেছেন। প্রথম ব্যর্থতার দিনে, যখন মনে হয়েছে সব শেষ হয়ে গেছে মায়ের কণ্ঠস্বর বলেছে, “আবার চেষ্টা করো, আমি আছি।” সেই তিনটি শব্দ “আমি আছি” পৃথিবীর সব সাহসের উৎস।

মায়ের রান্নার কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত টান অনুভব হয়। সেই রান্নায় শুধু মশলার গন্ধ নয়, থাকে ভালোবাসার স্পর্শ। বাইরে যত দামি রেস্তোরাঁতেই খাওয়া হোক, মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ কোথাও পাওয়া যায় না। সেই স্বাদ শুধু জিভের নয়, আত্মার। মা যখন রান্না করেন, তখন শুধু খাবার তৈরি হয় না তৈরি হয় একটা উষ্ণ পৃথিবী, যেখানে ফিরে গেলে মনে হয় সব ঠিক আছে।

বড় হতে হতে আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই। ছোটবেলার খেলার মাঠ, পাড়ার বন্ধু, স্কুলের দিনগুলো, প্রথম প্রেমের অনুভূতি সব ধীরে ধীরে স্মৃতির কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। কিন্তু মায়ের মুখের সেই হাসিটা? সেটা কখনো ভোলা যায় না। কারণ সেই হাসিই ছিল আমাদের প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম আশ্রয়, প্রথম পৃথিবী। সেই হাসি দেখে আমরা শিখেছি কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে বিশ্বাস করতে হয়, কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়।

মা মানে শুধু একটি সম্পর্ক নয় মা মানে একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী। যে পৃথিবীতে ফিরে গেলে সব ক্লান্তি মুছে যায়, সব ভয় কমে আসে, সব ব্যথা একটু হলেও লাঘব হয়। পৃথিবীতে যত দূরেই যাই, যত উঁচুতেই উঠি, যত সফলই হই মায়ের আঁচলের ছায়া সবসময় মাথার উপর থাকে, অদৃশ্য কিন্তু অনুভবযোগ্য। সেই ছায়া কখনো সরে যায় না।

কিন্তু জীবনের এক নির্মম সত্য হলো আমরা প্রায়ই বুঝতে পারি না মায়ের মূল্য, যতদিন সেই মানুষটি পাশে থাকেন। ব্যস্ততার অজুহাতে ফোন করা হয় না, দেখতে যাওয়া হয় না, পাশে বসে একটু গল্প করা হয় না। আর যেদিন বোঝা যায় সেদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই যাঁর মা আজও আছেন, তাঁকে বলি একটু সময় দিন। একটু কাছে যান। মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে বড় কোনো কাজ এই পৃথিবীতে নেই।

মা এই একটি শব্দে পৃথিবীর সমস্ত কবিতা লেখা আছে, সমস্ত গান গাওয়া আছে, সমস্ত প্রার্থনা জমা আছে। এই পৃথিবীতে মমতার সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ, সবচেয়ে অকৃত্রিম রূপ মা

লেখক: ছাত্র, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!