নীরব দংশন: মূল্যস্ফীতি ও বিপন্ন জীবন

নীরব দংশন: মূল্যস্ফীতি ও বিপন্ন জীবন
বর্তমানে বাজারে গেলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন লাগামহীন ঘোড়ার মতো ছুটছে। কয়েক বছর আগেও যে পরিবারটি পাঁচশো টাকায় প্রাত্যহিক বাজার সম্পন্ন করতে পারত, এখন হাজার টাকা হাতে নিয়েও তারা হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতি যখন দুই অঙ্কের কাছাকাছি বা উপরে থাকে, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য জীবন ধারণের সংগ্রাম হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশে পৌঁছানো, যা ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং এর আগে ১০ শতাংশের উপরে থাকা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ন্ত্রণকারী একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম ও পুষ্টিহীনতা
মূল্যস্ফীতির আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নির্দিষ্ট আয়ের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, সেই অনুপাতে মজুরি না বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যা উপার্জন করেন, তার সিংহভাগই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে কেবল চাল আর আটা কিনতে। ফলে প্রোটিনের উৎস মাছ, মাংস বা ডিম তাদের খাদ্যতালিকা থেকে প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টিহীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর এক নীরব আঘাত।
মধ্যবিত্তের সংকট আরও অন্তর্মুখী ও যন্ত্রণাদায়ক। শিক্ষা, চিকিৎসা ও আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়া সবকিছুর খরচ মেলাতে গিয়ে তারা এক অদৃশ্য টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চাপে তারা না পারছেন কারো কাছে সাহায্য চাইতে, না পারছেন মানিয়ে নিতে। অনেক পরিবার খরচ বাঁচাতে সন্তানের গৃহশিক্ষক বাদ দিচ্ছে কিংবা নিজের অসুস্থতাকে অবহেলা করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া পিছিয়ে দিচ্ছে। মাসের শেষে ব্যাংক হিসাব শূন্য হওয়াটাই এখন মধ্যবিত্তের জন্য নতুন স্বাভাবিকতা।
সংকটের বহুমাত্রিক কারণ ও বাজার সিন্ডিকেট
মূল্যস্ফীতির কারণগুলো যেমন বৈশ্বিক, তেমনি অভ্যন্তরীণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয়কে উসকে দিয়েছে সত্য, তবে অভ্যন্তরীণ বাজারের অব্যবস্থাপনাও কম দায়ী নয়। সরবরাহ শৃঙ্খলে অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম সাধারণ ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খামার বা ক্ষেত থেকে একটি পণ্য ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েক স্তরে দাম বাড়ে, যার সুফল প্রান্তিক কৃষক পান না মুনাফা লুটে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা।
লিঙ্গবৈষম্য ও মানসিক চাপ
গৃহস্থালি পর্যায়ে এই সংকটের প্রথম এবং প্রধান শিকার হচ্ছেন নারীরা। পরিবারের সীমিত বাজেট সামলাতে গিয়ে অনেক নারী নিজের খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছেন কিংবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা বাদ দিচ্ছেন। এই নিরন্তর অভাব কেবল শারীরিক অসুস্থতাই নয়, বরং পারিবারিক কলহ এবং চরম মানসিক অবসাদেরও জন্ম দিচ্ছে।
উত্তরণের পথ: প্রয়োজন কাঠামোবদ্ধ সংস্কার
সরকার ওএমএস বা টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি এবং সুদের হার সমন্বয়ের মতো কিছু পদক্ষেপ নিলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে তা পর্যাপ্ত নয়। এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমত দরকার কঠোর বাজার মনিটরিং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট ও পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কৃষকের সঙ্গে ভোক্তার সরাসরি সংযোগ ঘটাতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে আসে। তৃতীয়ত, নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি সংকটে থাকা নিম্ন-মধ্যবিত্তকেও রেশন কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। সবশেষে, দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রণোদনা দেওয়া অপরিহার্য।
পরিশেষে বলা যায় মূল্যস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। এটি ধীরে ধীরে মানুষের স্বপ্ন, সক্ষমতা এবং মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেয়। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন তখনই সার্থক যখন প্রতিটি নাগরিকের ডাইনিং টেবিলে তিন বেলা স্বস্তির খাবার নিশ্চিত হয়। এই সংকটকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে অর্থনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি সামাজিক অসন্তোষও চরম আকার ধারণ করতে পারে। তাই সময়োচিত ও কাঠামোবদ্ধ পদক্ষেপই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
মোঃ তায়ীম খান
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ,
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

