গণমানুষের ভাবনায় আগামীর বাংলাদেশ

জনগণের চোখে নতুন সরকার মানে তাদের স্বপ্ন ও একরাশ প্রত্যাশার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা। আগামীর বাংলাদেশেকে এগিয়ে নিতে সর্বস্তরের মানুষের মেধা, শ্রম ও সঠিক ভাবনাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপর নির্ভরশীল নয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা ও কার্যক্রমের উপরও নির্ভরশীল। তাই নতুন সরকারের কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা ও ভাবনা তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোছা: ইসমা খাতুন।
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্বস্তি চাই:
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের উৎকণ্ঠার আরেক নাম। মূল্যস্ফীতির ফলে চাল, ডাল, তেল, শাক-সবজির মতো অপরিহার্য পণ্য থেকে শুরু করে পরিবহন খরচের ঊর্ধ্বমুখী বৃদ্ধি যেমন ঘটেছে, তেমনি কমেছে মানুষেরর প্রকৃত আয়। আয় ব্যয়ের এই ভারসাম্যহীনতার কারণে কমেছে জীবন মান। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অস্বস্তি কেবল চাহিদার ঘাটতিজনিত কারণে সৃষ্টি হয়নি বরং, মুনাফালোভী মজুমদারি, শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং বাজার তত্ত্বাবধানের অভাব এর পিছনে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, তেলের সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ মজুতদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দরবৃদ্ধির মতো ঘটনা বারবার খবরের কাগজে উঠে এসেছে। কিন্তু এসব সমস্যা দূরীকরণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি, উপরন্তু বলা হয়েছে স্বাভাবিক অবস্থার কথা। এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি, বাজার তদারকির অভাব এবং ভোক্তা অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগের অভাবে এই সমস্যা সাধারণ মানুষের ঘাঁড়ে জেঁকে বসেছে। এজন্য সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর ভূমিকা পালন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
এই সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। উৎপাদন বৃদ্ধি, সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ, সরবারহব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, প্রভাবশালী মুনাফাখোর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে নিয়মিত তত্ত্বাবধায়নের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। তাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা হোক।
রনি আহমেদ,
বাংলা বিভাগ, শিক্ষার্থী,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
শিক্ষা পদ্ধতি হোক গবেষণাধর্মী ও জীবনমুখী;
একটি দেশ ও জাতির প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে গবেষণা ও সৃজনশীল দক্ষতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে মনে হয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ডিগ্রি এবং সার্টিফিকেট অর্জন করা। যার ফলে শিক্ষার হার বাড়লেও সুশিক্ষিত লোকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমান সমাজ যেন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সেই সমাজের দৃষ্টান্ত, তিনি বলেছিলেন, “এমন একটা সময় আসবে জ্ঞানীরা জ্ঞানী হওয়ার জন্য অনুশোচনা করবে, মূর্খরা তাদের মূর্খতার জন্য গর্ব করে বেড়াবে আর দুর্নীতিবাজরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাস করে বেড়াবে।”
প্রমথ চৌধুরী তার ‘বই পড়া ‘প্রবন্ধে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এসেও বাংলাদেশে সেই ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থায় চিত্র যেন তার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় গবেষণামুখী ও সৃজনশীল শিক্ষাই পারে এই ভয়ংকর শৃংখল থেকে মুক্ত করতে। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় শেখানো হয় যেকোনো জিনিস (কম্পিউটার,মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ইন্টারনেট) কে আবিষ্কার করেছেন কত সালে আবিষ্কার করেছেন। যে শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনে তেমন কোনো কাজে আসে না। কিন্তু যদি এমনটা শেখানো হতো এই জিনিসগুলো কিভাবে তৈরি করা হয়েছে তাহলে শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই একটি সমৃদ্ধ সমাজের জন্ম হতো। সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে গবেষণাধর্মী শিক্ষাই পারে এই জনবহুল বাংলাদেশকে একটি জনশক্তির দেশে রূপান্তরিত করতে। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে যেহেতু নতুন নতুন পরিবর্তন আসছে এ ক্ষেত্রে গবেষণা ও সৃজনশীলতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান করছি।
সিমা খাতুন, প্রভাষক,
একেএম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা।
শিশুদের ভার্চুয়াল জগতের নিয়ন্ত্রণ জরুরী :
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ শিশুরাই মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্ত। প্রায় প্রত্যক অভিভাবকদের একটি বড় অভিযোগ বাচ্চারা পড়াশুনার চেয়ে ফোনে বেশি সময় দেয়। কিন্তু এর প্রতি আসক্ত হওয়ার কারন তারা কখনো অনুসন্ধান করেছে কি? আমি মনে করি, অনুকরণপ্রিয় বাচ্চাদের এই চরম পরিণতির জন্য অভিভাবকরাই দায়ী। বেশিরভাগ বাবা মা-ই বাচ্চাকে বই দিয়ে সামনে বসিয়ে রেখে নিজেরা ফোন ব্যবহার করে। আবার নিজেদের কাজ গোছানোর সময় বাচ্চাকে শান্ত রাখতে,খাওয়ানোর সহজ উপায় হিসেবে ডিজিটাল ডিভাইস তাদের হাতে তুলে দিয়ে ভার্চুয়াল জগতের আসক্তির পথে ঠেলে দেয়। ফলস্বরূপ, অল্প বয়সে শিশুরা চোখের সমস্যা, মানসিক অবসাদগ্রস্থতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকে। এছাড়াও সহজলভ্য অপসংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে মানসিক বিকৃতির ফলে তারা সহজেই অন্ধকার জগতে তলিয়ে যায়। এর বিকল্প হিসেবে শিশুদের সময় দেওয়া, খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা ইত্যাদি কাজে অভিভাবকদের নজর দেওয়া উচিত।ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের এই ভয়ংকর দিক থেকে রক্ষা করতে সবার আগে অভিভাবকদের সচেতনতা বেশি জরুরী।
মো: লিংকন হোসেন,
সহকারী শিক্ষক, মিলিয়র আইডিয়াল স্কুল, ঢাকা।
গড়তে চাই আগামীর আত্মবিশ্বাসী প্রজন্মঃ
আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম নানাবিধ পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে নিজেরা উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। শুধুমাত্র নিরাপদ চাকরির আশায় তাদের শিক্ষা; যা বাস্তব জীবনে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারে না। অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও সামাজিক মর্যাদার ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়ন তরুণদের আত্মবিশ্বাস আরো কমিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে। অথচ বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সৃজনশীলতা বিকাশের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সুযোগ অনেক বেশি।
আমার মতে, তরুণ প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবমুখী ও সৃজনশীল শিক্ষার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে তারা অন্যের উপর নির্ভর না করে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।
মো: নাঈমুর রহমান (লাবন)
উদ্যোক্তা ও পরিচালক, বুকম্যান স্টুডেন্টস কেয়ার, ঝিনাইদহ।
আস্থার ঠিকানায় সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক:
সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। অধিক জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে গ্রাম পর্যায়ে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই গ্রামে বসবাস করে। কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের পরেও তারা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক এর সংখ্যা খুবই কম। যতটুকু দেখা যায়, সেখানে দক্ষ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত ঔষধের ব্যবস্থা থাকে না। এমতাবস্থায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ সাধারন মানুষের আস্থার ঠিকানা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন ভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টার চালু করা এখন সময়ের দাবি।
মোঃ ইমদাদুল হক মিলন,
পল্লী চিকিৎসক, সুজানগর-পাবনা।
লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে খবরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।

