তরুণদের নেতৃত্বে দেশে দেশে বিপ্লব

ইতিহাসে নজর রাখলেই দেখা যায় পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণরা। তারা বয়সে তরুণ হলেও চিন্তায় নতুন, স্বপ্নে সাহসী এবং প্রয়োজনে ত্যাগে অগ্রণী। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মূলে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল অবিস্মরণীয়। বর্তমান সময়ে তরুণদের আন্দোলনের ধরন ও রূপ আরও বেশি পরিবর্তিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংগঠিত প্রতিবাদ, সৃজনশীল প্রকাশ সব মিলিয়ে তরুণরা আজ বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত শক্তি। আফ্রিকা থেকে এশিয়া, ইউরোপ থেকে আমেরিকা- প্রায় সব অঞ্চলে তরুণদের নেতৃত্বে নানা ধরনের গণআন্দোলন, বিপ্লব ও গণজাগরণ ঘটেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে তরুণদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োগ ও দমন-পীড়নের খবর প্রায়ই সংবাদে উঠে আসে। সাম্প্রতিক ২০১৬ সালে যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কেনিয়াসহ অন্য শহরে বিক্ষোভ করে জেন-জিরা। নেপালের এই বিক্ষোভ জেন-জিদের আন্দোলনের একটি প্রতীকী রূপ পায়। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদের অন্যতম কারণ ছিল দুর্নীতি ও বেকারত্ব। এ সময় সেখানে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়। তরুণদের সমর্থনে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। অবশেষে জনতার হাতে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় সরকার।
একইভাবে বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর অধিক চাপ বাড়ানোর মতো প্রস্তাব সামনে রেখে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে কেনিয়ার রাস্তায় উত্তাল হয়ে ওঠে তরুণরা। সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে দেয়। পুলিশ হেফাজতে থাকা তরুণ ব্লগার আলবার্ট ওমন্ডির মৃত্যু ঘটনা বিক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও আসল বিস্ফোরণ ঘটায় তরুণরা, বিশেষ করে জেনারেশন জেড। তারা শুধু রাস্তায় নামেনি, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্দোলনে বিশেষ করে শিল্পী, গায়ক ও সৃজনশীল তরুণরা অন্যরকম ভূমিকা রাখে। কেউ গান লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছে, কেউ আবার দেয়ালে আঁকেছে প্রতিরোধের ছবি। একটি জনপ্রিয় গান ‘June 25th’ কেনিয়ার তরুণদের কাছে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। পুলিশের দমন-পীড়ন ও হত্যার ঘটনায় তরুণদের ক্ষোভ ধীরে ধীরে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তাদের আন্দোলন আজও কেনিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান করে আছে।
২০২০ সালে নাইজেরিয়ায় ঘটে যাওয়া ‘End SARS’ আন্দোলন ছিল পুলিশের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী তরুণ আন্দোলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে EndSARS হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে নাইজেরিয়ার বিভিন্ন শহরে। SARS একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিট, যার বিরুদ্ধে নির্যাতন ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। এই ইউনিট বিলুপ্তির দাবিতে তরুণরা রাস্তায় নামে। তারা গান, পোস্টার, সমাবেশ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নাইজেরিয়ান তরুণরাও এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।
এ বছরের মে মাসে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মালির ইতিহাসে প্রথম ব্যাপক গণবিক্ষোভ দেখা যায়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সাধারণ জনগণ রাজপথে নামে। তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া এই বিক্ষোভে সব শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেয়। মালির বর্তমান অবস্থা অস্থিতিশীল হলেও তরুণদের এই আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশেও দেখা যায় বিশাল গণআন্দোলন। একটি তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কারণে চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই বিক্ষোভ। তরুণরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে রাজধানীতে জড়ো হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যায়। তারা সরকারের কাছে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগের দাবি জানায়। যদিও আন্দোলনের কিছু অংশ সহিংস হয়ে ওঠে, তবে তরুণরা দেখিয়েছে তারা কেবল দর্শক নয়, বরং পরিবর্তনের সক্রিয় কারিগর।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই তরুণদের আন্দোলন প্রমাণ করে যে, পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি তারাই। তারা নতুন চিন্তা, সাহস ও প্রযুক্তির ব্যবহার দিয়ে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আজকের তরুণরা কেবল ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমানেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে সমাজের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়া।
তাই বিশ্বব্যাপী এই তরুণ আন্দোলনগুলো আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কার করে, তরুণরা শুধু আজকের নয়, আগামী দিনেরও দিকনির্দেশক। তাদের শক্তি, তাদের স্বপ্ন এবং তাদের সাহসকে সম্মান জানানোই হবে একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি।

