সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট: দেরির খেসারত আর কত?

Author

আর এস মাহমুদ হাসান , বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৯ বার

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যসংকট মূলত দীর্ঘদিনের অবহেলা, খণ্ডিত নীতিনির্ধারণ এবং বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারার পুঞ্জীভূত ফল। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশকে আলাদা করে দেখার যে সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিই আজ আমাদের জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অথচ বৈশ্বিক বাস্তবতা স্পষ্ট—মানুষের সংক্রামক রোগের প্রায় ৬০-৭৫ শতাংশই প্রাণী থেকে আসা, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিয়মিতভাবে উল্লেখ করে আসছে। সহজ কথায়, ওয়ান হেলথ (One Health) হলো এমন একটি সমন্বিত পদ্ধতি যা মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একটি একক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ, কেবল হাসপাতালের চিকিৎসা দিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষা সম্ভব নয়, যদি না আমাদের চার পাশের প্রাণী ও পরিবেশ নিরাপদ থাকে।

নিপাহ ভাইরাসের পুনরাবৃত্ত সংক্রমণ, বার্ড ফ্লু, অ্যানথ্রাক্স, করোনা, জলাতঙ্ক কিংবা ব্রুসেলোসিস—এই নামগুলো আমাদের কাছে পরিচিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (AMR) মতো নীরব ঘাতক। সমস্যাগুলো পুরোনো হলেও এগুলো মোকাবিলায় আমাদের পথচলা সেই মান্ধাতা আমলের ‘সাইলো-বেসড’ বা একক খাতভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছে। স্বাস্থ্য বিভাগ যখন কোনো সংকটের কথা বলে, প্রাণিসম্পদ বিভাগ তখন চলে নিজস্ব গতিতে, আর পরিবেশ বিভাগ তো নীতিনির্ধারণের প্রায় বাইরেই থেকে যায়। ফলে প্রতিটি সংকটে আমরা কেবল ‘তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া’ জানাই, সংকট কাটলে আবার যে কে সেই। এই সমন্বয়হীনতার চক্র থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্ব আজ এই ব্যর্থ পথ পরিহার করছে। WHO, FAO, WOAH এবং UNEP-এর সমন্বয়ে গঠিত ‘কোয়াড্রিপারটাইট ওয়ান হেলথ ফ্রেমওয়ার্ক’ এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি (UC Davis) কিংবা অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বসেরা বিদ্যাপীঠগুলোতে ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট এখন কেবল শিক্ষা কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশ কি এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছে? আংশিকভাবে পেরেছে বলা যায়। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (CVASU) ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা সেই অগ্রগতির একটি ছোট উদাহরণ। তবে এমন একটি জনবহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশে যেখানে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে মাত্র একটি বা দুইটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে জাতীয় চাহিদা পূরণ অসম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (BAU) ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সময়ের দাবি। প্রস্তাবিত এই ইনস্টিটিউট কেবল ডিগ্রি প্রদানের কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। জুনোটিক (প্রাণী থেকে ছড়ানো) রোগ নজরদারি, খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি মূল্যায়ন, AMR সার্ভেইল্যান্স এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বিশ্লেষণে এটি সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

সংকটের সময় আমাদের সবচেয়ে বড় অভাব দেখা দেয় প্রশিক্ষিত ও সমন্বিত নেতৃত্বের। কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন জ্ঞান কোনো কাজে আসে না। আমাদের এমন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, যারা মানুষ-প্রাণী-পরিবেশের এই নিবিড় বন্ধনটি বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে সক্ষম।

মনে রাখতে হবে—সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া মানে শুধু সময়ক্ষেপণ নয়; দেরি মানে বাড়তি মানুষের মৃত্যু, বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ভবিষ্যতে বিদেশি সহায়তার ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়া। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছে যে, আগাম প্রস্তুতি না থাকলে ভবিষ্যতের মহামারি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

অতএব, ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট নিয়ে আর দ্বিধা বা দীর্ঘসূত্রতার কোনো সুযোগ নেই। এটি কোনো একাডেমিক ফ্যাশন নয়, এটি আমাদের জাতীয় জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, সংক্রামক রোগ ও মহামারি এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতার টিকে থাকার লড়াই। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আগাম প্রস্তুতি নিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখব, নাকি বরাবরের মতো সংকটে পড়ে কেবলই আফসোস করব?

লেখক: ভেটেরিনারিয়ান, কৃষিবিদ ও তরুণ কলামিস্ট

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!