সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্নেইল ফিভার : দোরগোড়ায় নীরব ঘাতক

Author

আর এস মাহমুদ হাসান , বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৮ বার

বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ে নীতি-আলোচনায় যেসব রোগ বারবার উপেক্ষিত থেকে যায়, সিস্টোসোমিয়াসিস (Schistosomiasis) তার অন্যতম, যা সাধারণভাবে ‘স্নেইল ফিভার’ (Snail Fever) নামে পরিচিত। গোটা বিশ্বে পরজীবীঘটিত রোগগুলোর মধ্যে এর অবস্থান ম্যালেরিয়ার পরেই। এটি এমন একটি পরজীবীজনিত রোগ, যা সরাসরি মানুষে মানুষে ছড়ায় না; বরং পরিষ্কার জলের শামুককে (Freshwater Snail) মধ্যবর্তী বাহক হিসেবে ব্যবহার করে মানুষ ও প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে।

এই পরজীবী মূলত ত্বক ভেদ করে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রক্তনালিতে বসবাস করে এবং নীরবে ডিম পাড়ে; যা লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব জুড়ে অন্তত ৭৮টি দেশে সিস্টোসোমিয়াসিসের সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছে এবং প্রতি বছর প্রায় ২৫ কোটি মানুষ এর জন্য চিকিৎসা নেয়। আফ্রিকার বাইরে চীন, ভেনিজুয়েলা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশেও এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই বাস্তবতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য—বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। ভৌগোলিক বাস্তবতায় এটি বাংলাদেশের জন্য কোনো তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়; বরং একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা জনস্বাস্থ্য হুমকি।

বাংলাদেশের নদী-খাল-বিলনির্ভর জীবনব্যবস্থা, কৃষি ও মৎস্যজীবীদের পানির সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ এবং জলজ শামুকের বিস্তৃত উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ঝুঁকি এখানে সুস্পষ্ট। ভেটেরিনারি ও পাবলিক হেলথ দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরো গভীর। গবাদি পশুতে এই পরজীবীর সংক্রমণ মানুষের সংক্রমণের জন্য একটি ‘Reservoir Host’ হিসেবে কাজ করতে পারে। অথচ আমাদের রোগ নজরদারি কাঠামোয় প্রাণী-মানুষ-পরিবেশের এই সংযোগ—যা ‘One Health’ ধারণার মূলভিত্তি, তা এখনো কার্যত অনুপস্থিত।

বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে ‘Urogenital Schistosomiasis’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যেখানে পরজীবীর ডিম যৌনাঙ্গের আশপাশে আটকে গিয়ে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব, এমনকি ক্যানসার ও এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ যৌনবাহিত রোগ ভেবে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়, ফলে মূল রোগটি থেকে যায় অচিহ্নিত।

এই রোগের কোনো কার্যকর টিকা এখনো নেই। WHO অনুমোদিত ‘Praz iquantel’ ওষুধ থাকলেও সেটি একক সমাধান নয়। এজন্য প্রয়োজন মানবস্বাস্থ্য, ভেটেরিনারি সার্ভিস ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে একীভূত করে জলাশয়ভিত্তিক শামুক নজরদারি, নজরদারি, সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় সার্ভেইল্যান্স, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং ভেটেরিনারি সার্ভিসকে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করা।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!