অদৃশ্য শিকল, দৃশ্যমান নারী
সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীরা পেরিয়েছে চার দেয়ালের গণ্ডি। নারীরা এখন আর ঘরে বসে নেই। নেতৃত্ব দিচ্ছে শিল্প থেকে করপোরেট বোর্ডে, শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রশাসনে এবং দেশ পরিচালনায় রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। অথচ ঘরের বাইরে পা রাখতেই রাজপথ, গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র বা ডিজিটাল পরিসরে নারীরা সম্মুখীন হচ্ছেন বিভিন্ন সমস্যার। প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে অদৃশ্য আতঙ্কের বিরুদ্ধে। নিরাপত্তাহীনতা নারীর অগ্রযাত্রার পথে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, প্রতিদিন গণপরিবহনে বা রাস্তায় চলতে গিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হতে হচ্ছে নারীদের। যা নারী শক্তির উন্মোচনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিড়ের সুযোগে হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, শারীরিক লাঞ্ছনা নিত্যদিনের ঘটনা নারীর স্বাভাবিক চলাচলকে বাধাগ্রস্থ করে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে,পরিবহন, চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ বাধা। ফলে নারীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপদ ও নারীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহন বা রাস্তায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই হবে না বরং এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়োজ। নারীর পোশাক, শারীরিক গঠন নিয়ে বিচার করার প্রবণতা এখনো সমাজে লক্ষ্য করা যায়। নিজের দৃষ্টি ও আচরণ সংযত রাখার পরিবর্তে নারীকেই দায়ী করা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই বহমান রূপ। এই মানসিকতার প্রভাব দেখা যায় পরিবারের ভিতরেও নারী ও শিশুর নির্যাতনের ঘটনাতে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি খুবই গুরুতর সমস্যা যা নিয়ন্ত্রণে নারীদের ক্ষমতা, প্রতিভা, সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সকল পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষম ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের নারী ও কন্যা শিশু প্রতি সহিংসতার এক জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই জরিপে দেখা যায়, নারীর জীবদ্দশায় প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী কোন না কোন ভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয়, শারীরিক বা যৌন সহিংসতা শিকার ৬৪ শতাংশ নারী যারা ঘটনাটি অপ্রকাশিত রেখেছে। গত এক বছরে নারীরা বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। ফলে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা শুধু রাজপথে সমস্যা নয় এটি লক্ষ্য করা যায় নারীদের গৃহ জীবনেও। তৃতীয়ত, ভয় ও লজ্জার সংস্কৃতি নারীদের পিছিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি নারী জীবনে কখনো না কখনো অশালীন শব্দের সম্মুখীন হয়েছে। প্রতিবাদ করা অনেকক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে থাকে সামাজিক চাপ অপমানের ভয় কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায়। নীরবতা নারীর নিজস্ব সত্তাকে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে আবদ্ধ করে ফেলে চার দেয়ালে। নারীদের পোশাক, শারীরিক গঠন বিচার করে যে পুরুষ তারা জানে না তাদের দৃষ্টি সংযত করার ধারণাটি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীরা নির্যাতিত ও অবহেলিত। সমাজে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত নারীর আর্তনাদ কেবল চার দেয়ালে বন্দি। এই সমাজে নারীর স্বাধীনতা শিকল বেঁধে নির্দিষ্ট একটি গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। সময় বদলে গেছে, বদলে গেছে যুগ,কিন্তু বদলায় না নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। সময় আর যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পাল্টেছে নির্যাতনের ধরন ও অবহেলার চিন্তা ভাবনা। নারী কেবল মমতাময়ী নয়, প্রয়োজনে কঠোর ও প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো এখন নারীদের সময়ের দাবি। নারীর প্রতি নির্মমতা বা শারীরিক লাঞ্ছনা শুরু হয়ে থাকে পরিবার থেকেই। পরিবারের যেসব সদস্যের কাছে শিশুদের বা নারীদের নিরাপদ থাকার কথা তাঁদের মাধ্যমে বর্তমানে তারা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত ও নিপীড়িত। নারীবিদ্বেষী মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইন ব্যবস্থা নিপীড়নের অন্যতম কারণ। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীদের প্রতি নির্যাতনের বিরুদ্ধে যুগের পর যুগ অসংখ্য মানুষ প্রতিবাদ ও সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু বদলায়নি সার্বিক পরিস্থিতি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট সমাধানযোগ্য। ইতিমধ্যে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস, মেট্রোরেলে নারীদের জন্য নির্ধারিত কোচ, জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯ এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে। তবে আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ। সমাধানের পথে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রদ্ধা ও সম্মতির শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, গণপরিবহনে সিসিটিভি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হয়রানির ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত নারীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে নারীর ক্ষমতা, প্রতিভা, সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি পরিস্থিতিতে দৃঢ়ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ঢাকায় মেট্রোরেলে নারীদের জন্য নির্ধারিত কোচের মতো প্রতিটি গণপরিবহনে আলাদা আসন, পর্যাপ্ত আলো, সিসিটিভি এবং জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯ এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নারী চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগ বাড়ালে নিরাপত্তাবোধ বাড়বে। পরিবার থেকেই শ্রদ্ধা ও সম্মতির শিক্ষা শুরু করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে জেন্ডার সংবেদনশীলতা এবং আত্মরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণ যুক্ত করা জরুরি। হয়রানির ঘটনায় ভুক্তভোগী যেন সহজে অভিযোগ করতে পারে, সেজন্য প্রতিটি থানা ও কর্মক্ষেত্রে নারী সহায়তা ডেস্ক এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল সক্রিয় করতে হবে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা কমলে অপরাধীর মধ্যে ভয় তৈরি হবে। কর্পোরেট অফিস ও শিল্প কারখানায় নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত, ডে-কেয়ার, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং অভিযোগের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকলে নারী চার দেয়াল থেকে বের হয়ে নেতৃত্বে আরো আত্মবিশ্বাসী হবে। ভয় ও লজ্জার সংস্কৃতি ভেঙে প্রতিবাদ করার সাহস গড়ে তুলতে হবে। আত্মবিশ্বাস, প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন লোকেশন শেয়ার, সেইফটি অ্যাপ এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা নারীকে শুধু নিরাপদ নয়, দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং নারী শক্তির পূর্ণ উন্মোচনে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে। দেশের নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল নারীর অধিকার রক্ষার বিষয় নয় বরং এটি একটি দেশের সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও মানবিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। নারীরা তাদের শিক্ষা, প্রতিভা ও দক্ষতা বিকাশের পূর্ণ সুযোগ পেলে নেতৃত্ব দিবে জাতির অগ্রযাত্রার বিনির্মাণে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই উন্মেষিত হবে নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
সাবিহা তারান্নুম মিম
সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
