সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় এবং উত্তরণে করণীয়।

Author

মোঃ শরীফুল ইসলাম , Dhaka Central University, Dhaka College Campus, Dhaka.

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৬ বার

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারী কবিতায় বলেছিলেন, বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টির চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। অথচ দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হিসেবে নারীরা আজ সর্বত্রই বঞ্চনার শিকার। নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে এখনও অনেকে নারাজ। সমাজে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য নারীর ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায়গুলো বস্তুত রাজনৈতিক,আর্থসামাজিক,সাংস্কৃতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বত্র তার মতামত ও ইচ্ছার প্রতিফলনই হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন।

নারী মর্যাদাহীন, উপেক্ষিত, প্রান্তিক,বিত্তহীন,ক্ষমতাহীন ও অধস্তন । আমাদের দেশে নারীদের এ সকল সমস্যা বহুদিন ধরে বিরাজমান। নারীদের এসব দুরবস্থার প্রতিকার করার জন্য বহুমুখী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীদের উন্নয়নের জন্য ক্ষমতায়ন পদ্ধতিতে নারীর সম্পদ অর্জন ও সম্পদের ওপর মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের মতো পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় এ ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অনেক বাধা বা অন্তরায় রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ সব স্থানে নারীকে অধস্তন ও পুরুষকে প্রাধান্য বিস্তারকারী হিসেবে দেখতে চায়। দ্বিতীয়ত, নারী শিক্ষার অভাব রয়েছে । মানব জীবনের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি শিক্ষা এবং শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব। অনেক জায়গায় দেখা যায় যে, মেয়ে শিশুরা শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা থেকে এখনও বঞ্চিত। অথচ বর্তমান যুগ আধুনিকতার যুগ। ফলাফল স্বরূপ,তারা পারিবারিক ও সামাজিক কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে না। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই নারীরা ক্ষমতাহীন থেকে যায়। তৃতীয়ত, লিঙ্গ ভিত্তিক শ্রম বিভাজন বিদ্যমান। বর্তমান বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক এখনও অশিক্ষিত।

এখানে পুরুষতন্ত্রের প্রাধান্য বেশি থাকায় নারী ও পুরুষের কর্মকে বিভাজিত করেছে। ফলে নারীরা স্বাধীনভাবে যেকোনো কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে না। নারীদের এই অর্থনৈতিক ক্ষমতাহীনতাই রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতার মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।চতুর্থত, বাংলাদেশের উত্তরাধিকার নীতি। আমাদের মুসলিম ধর্মে নারীরা পিতার সম্পত্তিতে ভাইয়ের অর্ধেক অংশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টি ভঙ্গির কারণে তা থেকেও নারীদের প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করা হয়।

পঞ্চমত, এ দেশের দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। এ দেশের ৭৮% জনগোষ্ঠী এখনও দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করে। আমাদের দেশে অনেক বেশি বেকারত্বের হার বিদ্যমান রয়েছে। এই দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার নারী সমাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, যা নারী সমাজের ক্ষমতায়নের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। ফলাফল স্বরূপ, নারীরা অন্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না এবং পুরুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ষষ্ঠত, রাজনীতিতে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণ। আমাদের দেশে অনেক সময় রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী হলেও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই অপ্রতুল। সপ্তমত, ধর্মীয় বাধাও বিদ্যমান । আমাদের দেশে নারীদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় বাধার সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে পর্দাপ্রথা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, মৌলবাদ,ফতোয়াবাজি এবং বিধি-বিধান। অষ্টমত, মনস্তাত্ত্বিক। নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন মানসিক বাধা রয়েছে । বিশেষত, নারীদের দৈহিক শক্তিতে দুর্বল মনে করা হয়। নারীর নিজের দুর্বলতা ও অধস্তনতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা। নারীই নারীর প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণে ব্যর্থতা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য করণীয় কি? নারীদের ক্ষমতায়ন এর জন্য বাস্তব ও বহুমুখী টেকসই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারী সমাজের মুক্তি এবং এ দেশের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে নারীর ক্ষমতায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু কাজটি সহজসাধ্য নয়, বরং সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রথমত, পুরুষ তন্ত্রের উচ্ছেদ সাধন করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে পুরুষতন্ত্র হতে নারীকে বের করে নিয়ে আসতে হবে। কেননা পুরুষ তন্ত্র নারী কে ক্ষমতাহীন এবং ক্ষমতায়নের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পুরুষতন্ত্রের উচ্ছেদ সাধনে নারীবাদী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পারন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অথচ অধিকার সচেতন মানুষ,রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতা চর্চা করতে পারে। তাই নারীকে অধিকার সচেতন হতে হবে। নারীর সচেতনতা তৈরিতে শিক্ষা ও গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তৃতীয়ত, আধুনিক শিক্ষার প্রসারণ ঘটাতে হবে। সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই নারীকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। নারীশিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

চতুর্থত, বাস্তব সম্মত কর্ম সংস্থানের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে । যার ফলে স্বনির্ভর ব্যক্তি সহজেই ক্ষমতার অনুশীলন করতে পারে। তাই নারীর জন্য অর্থ উপার্জনশীল কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে হবে বা সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদের কে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার জন্য সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান করাও অত্যন্ত জরুরি। পঞ্চমত, নারীদের সম্পদের ওপর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সম্পদের ওপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের স্থাবর সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে উত্তরাধিকার নীতির পরিবর্তন করা যেতে পারে। ষষ্ঠত,ধর্মীয় অপ ব্যাখ্যা রোধ করতে হবে। প্রত্যেক ধর্মই শান্তিকামী কিন্তু আমাদের দেশে বহু নারী কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির ফতোয়া বাজির প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে। তাই ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ফতোয়া বাজিকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা অত্যন্ত জরুরি। সপ্তমত, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অতি জরুরি। রাজনৈতিক দল,মন্ত্রিপরিষদ, সংসদ, আমলাতন্ত্র ও স্থানীয় সংস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। অষ্টমত,গণমাধ্যমের প্রসারণ ঘটাতে হবে। গণমাধ্যম গুলোর ইতিবাচক কার্যক্রম ও প্রসার নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমের সংযোগ নারীর কাছে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

যার ফলে তারা খুব সহজেই টেলিভিশন রেডিওর মতো জনপ্রিয় প্রচার মাধ্যমের খুব কাছাকাছি আসতে পারে।

 

নারীদের ক্ষমতায়ন কোন উপেক্ষিত বিষয় নয়, বরং এটা তাদের প্রাপ্য অধিকার। স্থানীয় পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য যেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি,মতামত প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে দারিদ্র্য, মৌলবাদ, এমন কি নারীদের অক্ষমতাও নারীর ক্ষমতায়নের কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

 

মোঃ শরীফুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা কলেজ।
এই লেখাটি ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্যারিস মেইল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।