বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সমন্বিত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে

Author

রাকিবুল হাসান মুন্না , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৪ বার

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য এবং সরকারি রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মাত্র ২৩ দিনে ৪৭ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের পীরগাছা ও মিঠাপুকুর, মেহেরপুরের গাংনী এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরসহ অন্তত ছয়টি জেলায় শতাধিক মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামের স্পোর সৃষ্টিকারী একধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে সৃষ্ট এই ব্যাধি মূলত তৃণভোজী গবাদিপশু থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত একটি প্রাণীবাহিত রোগ। বিগত কয়েক দশক ধরে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গবাদিপশুসমৃদ্ধ জেলাগুলোতে এই মারণব্যাধির বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থার ঘাটতির কারণে প্রতিটি প্রাদুর্ভাবের সময়ই গ্রামীণ জনস্বাস্থ্য ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে।

মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সিংহভাগই চর্মজনিত অ্যানথ্রাক্স। সংক্রামিত পশুর কাঁচা মাংস কাটাকাটি, চামড়া ছাড়ানো কিংবা রুগ্ন পশুর সংস্পর্শে আসার দুই-তিন দিনের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির হাত, মুখসহ উন্মুক্ত ত্বকে চুলকানিযুক্ত লাল ফোসকা দেখা দেয়। এটি পরবর্তীতে চুলকানিহীন লাল ক্ষত থেকে কালো রঙের এস্কারে পরিণত হয় এবং তীব্র জ্বর, শরীরব্যথার সৃষ্টি করে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশে সংঘটিত প্রায় প্রতিটি অ্যানথ্রাক্স প্রাদুর্ভাবের মূলে রয়েছে অসুস্থ গবাদিপশু জবাই করে সেই মাংস ক্রয়-বিক্রয় করা। বিশেষ করে প্রান্তিক খামারিরা যখন দেখেন, তাদের মূল্যবান গরু, ছাগল মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছে তখন তারা আর্থিক ক্ষতি এড়াতে তড়িঘড়ি করে কম দামে তা স্থানীয় মাংস ব্যবসায়ী ও গ্রামবাসীর কাছে বিক্রি করে দেন। অসচেতন গ্রামবাসীরা সেই মাংস কাটাকাটিতে অংশ নেন। যাদের হাতে বা ত্বকে কোনো সূক্ষ্ম কাটাছেঁড়া থাকে, তারা সহজেই এই দুরারোগ্য ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হন।

অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো মাটিতে এর দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা। ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিসের স্পোর মাটিতে দশকের পর দশক জীবিত থাকতে পারে। সাধারণত বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের পর মাটির তলদেশে থাকা এসব স্পোর ভেসে উঠে চারণভূমি, ঘাস ও জলাশয়ের কাদা-পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। চারণভূমিতে চরে বেড়ানোর সময় সংক্রামিত কাঁচা ঘাস, জলাশয়ের কচুরিপানা খাওয়ার মাধ্যমে গবাদিপশু এসব স্পোর গ্রহণ করে সংক্রামিত হয়। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে যখন আক্রান্ত পশুর মৃতদেহ গোয়ালঘর বা উঠানে জবাই করা হয় কিংবা মৃতদেহ খোলা মাঠে, নদী-নালায় ফেলে রাখা হয়। বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসামাত্র পশুর রক্তে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো বায়ুবাহিত স্পোরে পরিণত হয়ে আশপাশের মাটি, পরিবেশকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দূষিত করে তোলে। গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত গণটিকা প্রদানই এই মারণচক্র ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলেও টিকার অপ্রতুলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং অপর্যাপ্ত টিকাদানকর্মীর সংকটের কারণে দেশের অর্ধেকেরও বেশি গবাদিপশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর এটি প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অ্যানথ্রাক্সের এই বারবার ফিরে আসার পেছনে গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও দায়ী। বাংলাদেশে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সনদ ছাড়া পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও গ্রামগঞ্জে এই আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। তদুপরি, হঠাৎ গবাদিপশু মারা গেলে খামারিদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তা সামাল দেওয়ার মতো কোনো পশুবিমা বা সরকারি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রান্তিক খামারিরা বাধ্য হয়ে রুগ্ন পশু জবাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। একই সঙ্গে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্কে সাধারণ বাজারে মাংস বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এর ফলে নির্দোষ খামারি ও পশু ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হন এবং সার্বিক প্রাণিসম্পদ খাতে মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে অ্যানথ্রাক্সের ফিরে আসার ভয়াবহ সংকট কাটাতে একটি টেকসই দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ওয়ান হেলথ ধারণার ভিত্তিতে মানবস্বাস্থ্য বিভাগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ খাতকে এক ছাতার নিচে এনে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, অ্যানথ্রাক্সপ্রবণ জেলাগুলোতে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই শতভাগ গবাদিপশুকে বিনামূল্যে টিকার আওতায় আনতে হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ে অসুস্থ পশু জবাই ও বিক্রি বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ বিভাগকে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে এবং পশু চিকিৎসকের পরীক্ষা, অনুমোদন ব্যতীত হাট-বাজারে মাংস বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, সংক্রামিত বা সন্দেহভাজন পশুর মৃতদেহ উন্মুক্ত স্থানে না ফেলে প্রাণী সংক্রামক ব্যাধি আইন অনুযায়ী মাটির নিচে অন্তত ছয় ফুট গভীরে চুন ছিটিয়ে পুঁতে ফেলা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি কাটাতে ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা চালু করা গেলে অসুস্থ পশু জবাইয়ের প্রবণতা বহুলাংশে কমানো সম্ভব হবে।

অতএব, অ্যানথ্রাক্স দূরীকরণে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঠিক আচরণগত পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। আইইডিসিআর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে চর্মরোগের প্রাথমিক লক্ষণ চেনা, অসুস্থ পশুর মাংস ও রক্ত স্পর্শ না করা এবং উন্মুক্ত ক্ষতে হাত না লাগানোর বিষয়ে লিফলেট, পোস্টারের মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। কাঁচা মাংস নাড়াচাড়া কিংবা পশুর সংস্পর্শে আসার পর সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ হ্রাস পায়। একই সঙ্গে গ্রামে কোনো পশুর আকস্মিক মৃত্যু অথবা অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ভেটেরিনারি কর্মকর্তাদের জানানো। এছাড়া মানুষের শরীরে গুটি বা কালো ক্ষত দেখা দিলে বিলম্ব না করে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে শুধু সরকারি নির্দেশনা নয়, চাই কঠোর আইনি তদারকি, পর্যাপ্ত টিকাদান এবং গণমানুষের সমন্বিত সচেতনতা। তবেই গ্রামীণ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে এবং খামারিদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত হবে।

লেখক, রাকিবুল হাসান মুন্না
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দিনাজপুর টিভি পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।