শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আবছা আলোয় নর্তের স্রোত : অরণ্যের গহিনে শৈশবের ভেলা

Author

মো মোকছেদুল মমিন , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৬ বার

 

১
সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে তখন। দিনের শেষ আলোটুকু গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে কোথাও কোথাও উঁকি দিচ্ছে, আবার কোথাও অরণ্যের ঘন সবুজের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে ধীরে ধীরে জমছে আবছা অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুক চিরে বয়ে চলেছে নর্ত নদী। আর সেই নদীর শীতল জলে একদল তরুণ— কেউ পানি ছিটাচ্ছে, কেউ গড়াগড়ি খাচ্ছে, কেউ বা শিশুর মতো খিলখিল করে হেসে উঠছে।

এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো–তারা আর ২৫ বছর বয়সের কোনো যুবক নয়। তাদের বয়স যেন হঠাৎ অনেক বছর পিছিয়ে গেছে। আবার যেন বাবার হাতের আঙুল ধরে হেঁটে যাওয়া সেই ছোট্ট ছেলেটি হয়ে গেছে, যারা বর্ষার নতুন পানিতে হাঁটুসমান জলে নেমে ভেলা ভাসাত, একে অন্যকে পানি ছিটিয়ে দৌড়ে পালাত, আর মায়ের বকুনি খাওয়ার ভয় ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে পড়ে থাকত।

নর্তের জলে হারিয়ে যাওয়া সেই শৈশব ফিরে পাওয়ার যাত্রার শুরুটা হয়েছিল এক শেষ শ্রাবণের কাকডাকা ভোরে।

২
তিস্তা বিধৌত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ফ্রান্স ফ্যান ক্লাবের আয়োজনে আমাদের একদিনের ভ্রমণের গন্তব্য— দিনাজপুরের বীরগঞ্জে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রায় ৩০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত জাতীয় উদ্যান, সিংড়া ফরেস্ট, যাকে উত্তরের সুন্দরবনও বলা হয়ে থাকে। শুধু বন নয়, আমাদের পরিকল্পনায় ছিল বনের ভেতরের সাঁওতাল পল্লীও।

সকাল পৌনে ৯টা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ শহিদ আবু সাঈদের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসের কৃষ্ণচূড়া সড়কের শেষ প্রান্তে জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে একটি লাল বাস; বাস যখন ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল, তখন সবার চোখে মুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। কারও হাতে ক্যামেরা, কারও হাতে মোবাইল, কেউ জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছে, কেউ আবার গান ধরেছে। একে একে ঘাঘট, যমুনা এবং আত্রাই নদীর উপর দিয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চলছে। যখনই কোনো সেতু এসে পড়ছে, সবার মনোযোগ আবহমান বাংলার সেই নদীর দিকে, যা কিনা এক সময়ের সভ্যতার বিকাশের প্রাণকেন্দ্র ছিলো। দেশের অন্যতম বৃহৎ শহরগুলো যেমন : ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে, পদ্মার তীরে রাজশাহী, কর্ণফুলি নদীর তীরে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম, রূপসার তীরে খুলনা, ময়মনসিংহ শহর গড়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্রের তীরে, তেমনিভাবে রংপুর শহরও গড়ে উঠেছিল তিস্তা অববাহিকার তীরেই, যদিও তা সরে আসতে আসতে বর্তমান অবস্থান নদী থেকে বহুদূরে। কেননা নদী আর এখন প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম নয়। একসময় ছিলো তাই তো নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল সমগ্র বিশ্বের বৃহৎ বৃহৎ সব শহর, ব্যাবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র। বাসের জানালাগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় একঝাঁক নিসর্গ প্রেমিকের চোখ, যাতে রয়েছে কেবল নতুনকে জানার, বাংলার অপার সৌন্দর্য হৃদয়ে ধারণ করার এক আকুল আবেদন।

বাসের ভেতর তখন মনে হচ্ছিল, এটি যেন একটি চলন্ত উৎসব। প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাটজন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। সহপাঠী জিম, সোহাগ, কনক, আরিফিন, রুহুল এবং বড়ো ভাই রায়হান, ইয়েমিন, মাহমুদ— সবাই মিলে হাসি, গান, গল্প আর উচ্ছ্বাসে বাসটিকে একেবারে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।

আমি তখন ভিন্ন এক ঘোরের মধ্যে।
মনে শুধুই বাজছিলো— কখন পৌঁছাব। ভাবছি, কত দেরি তোমার পাঞ্জেরী, যবে তোমার অরণ্যের অন্তর্গত রোমাঞ্চ ও সৌন্দর্যে অবগাহন করবো, আর তো তর সইছে না।

৩
পথে হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধা ঘণ্টার একটি বিরতি ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ ইনস্টিটিউট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের সুচারু কারুকার্য দেখতে দেখতে আমাদের আড্ডা, গান আর ছবি তোলার পর্বেই কখন যে আড়াই ঘণ্টা কেটে গেল, টেরই পেলাম না। যদিও কিছু সময় অপ্রত্যাশিতকারণে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

দুপুর ১টার পর আবার বাস চলতে শুরু করল। অনেকক্ষণ চলার পর ভাবলাম, এই বুঝি ফরেস্টে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু এ কী! জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি আবার সেই একই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আমি তো বাঁক-রুদ্ধ। মনিরা আর সাদিয়া অবাক হয়ে বলল, “কী রে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কি দুটো ক্যাম্পাস নাকি?”

আমি কোনো কিছু না ভেবেই পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, দুইটাই।” আশা আরও নিশ্চিত হয়ে যোগ করল, “হ্যাঁ রে, আমি তো আগেরবার এই ক্যাম্পাসেই এসেছিলাম।”

আমাদের এমন হাস্যকর আত্মবিশ্বাসে গুড়ে বালি ঢেলে দিয়ে জিম জোরের সঙ্গে বলে উঠল, “আরে ধুর, খাবার আনতে বাসটা আবার পেছনে ফিরে গিয়েছিল।, তোরা কি বোকা নাকি রে”

শুনে তো আমি একরকম আকাশ থেকেই পড়লাম। কল্পনার অরণ্যে এতটাই ডুবে ছিলাম যে, বাস যে উলটো পথে ঘুরেছে, আবার সোজা পথে এসেছে তা টেরই পাইনি। ২৫ মিনিটের পথ পেরোতে কেন ১ ঘণ্টা লেগে গেল, হিসাবটা তখন মিলল।

আসলে আমি তখন বাসে ছিলাম না— আমি ছিলাম আমার কল্পনার সেই অরণ্য এবং বন্ধুদের সাথে, অন্য এক জগতে।

অবশেষে যখন পিচ ঢালা পথ ছেড়ে সিংড়া ফরেস্টের ভিতরে মাটির (হেয়ারিং) রাস্তায় প্রবেশ করলো আমাদের বাস, চারপাশের ঘন শালবন আর জঙ্গলাবৃত সেই আলো – আধারির পরিবেশ আমাদের তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে এনে দিলো এক প্রাপ্তির ছোঁয়া, হিমশীতল আবেশ। চারপাশের ঘন অরণ্যের শুনশান নীরবতা সেই মুহূর্তকে করে তুললো আরো মোহনীয়। এমন ছমছমে পরিবেশ কারো কারো মনে তো ভয়ের সৃষ্টি করে দেয়, মনিরার চোখে মুখে তখন ভয়ের স্পষ্ট আবরণ লক্ষ্য করছিলাম। বিশেষ করে রাস্তার উভয় পাশের গাছের ডালপালা যেন আমাদের বাসের জানালার ভেতর দিয়ে ভেঙেচুরে প্রবেশ করছিল। সেটিও ছিলো এই ভ্রমণের চমৎকার এক অধ্যায়।

ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় আড়াইটা ছুঁইছুঁই।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সামনে দাঁড়িয়ে সুবিশাল অরণ্যানী।

৪
ফরেস্টে পৌঁছেই আমরা দুপুরের খাবার শেষ করে দ্রুতই বেরিয়ে পড়ি আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত অ্যাডভেনচারের খোঁজে। পথের শুরুতেই আমরা অভিভূত হয়ে পড়ি ঘন জঙ্গলের বুক চিরে চলে যাওয়া পথের বৈচিত্র্যে। গহিন অরণ্যের গা-ছমছমে, অত্যন্ত সরু পথ— কোনোমতে একটা ভ্যান যেতে পারে— যার উভয় পাশে কত না চেনা-অচেনা, ঝুঁকে পড়া ডালপালার বিস্তার। সামনের এই পথকে শুধু ‘রাস্তা’ বললে ভুল হবে। সেটি যেন অরণ্যের বুকের ভেতর দিয়ে নির্মাণ করা কোনো গোপন সুড়ঙ্গ।

রাস্তার উভয় পাশের ঘন অরণ্যের সেই বিস্তার ঠিক কত দূরে গিয়ে ঠেকেছে, তা বলা বড়ো কঠিন। রহস্য আর আলো-আঁধারিতে ঘেরা, চারপাশে ঝুঁকে পড়া লতা বৃক্ষের মেলা, তারই নিচ দিয়ে চলে যাওয়া সেই পথ ধরে ভ্যানে করে আমরা এগোতে লাগলাম। ভ্যানের চাকা যত সামনে এগোচ্ছিল, আলোকিত পৃথিবীর স্বাভাবিক যাত্রা যেন তত পেছনে পড়ে যাচ্ছিল।

চারপাশে আলো কমে আসছে। ঘন পাতার কারণে দিনের আলোও ঠিকমতো ঢুকতে পারছে না।

যাত্রার শুরুতেই যেন অ্যাডভেনচারের প্রথম অধ্যায়টি তার সার্থকতার জানান দিচ্ছে।

পথ এমনিতেই সরু, তার ওপর উভয় পাশে ঘন জঙ্গল— ফলে পথটি বেশ ভূতুড়ে, দিনের বেলা স্বত্বেও মনে হচ্ছে অন্ধকারাচ্ছন্ন। তার সঙ্গে গাছের ডালপালা নুয়ে এসে পথের ওপর এমনভাবে ঝুঁকে আছে যে, সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অন্যরকম ভয়ংকর অথচ মায়াবী আবহ। সেই আবহের ভেতর আমাদের মনও যেন প্রকৃতির নতুন এক সৌন্দর্য ও স্বাদের অনুভূতি আহরণ করতে করতে, কোনো অজানার মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।

সরু পথটি পুরোপুরি মসৃণ নয়, যে-কোনো সময় ভ্যান থেকে ছিটকে পড়ে যেতে পারি, এমন অবস্থা। কখনো হঠাৎ সামনে কাঁটাওয়ালা ডালপালা এসে পড়ছে, একবার তো আমার পায়েই কাঁটা বিঁধে গেল— কোনোমতে ছাড়িয়ে নিলাম সেটি। কখনোবা দুই পাশে ছড়িয়ে রাখা পা ঝুঁকে পড়া ডালপালার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে কারও কারও। প্রবাদ আছে, “যে ফুল দেয় সে কাটাও দেয়।” এই বনে এমন বহু ভেষজ ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ রয়েছে যেমন : – শতমূল, অনন্তমূল, আকন্দ, যষ্টিমধু, মাছ, আলু প্রভৃতি ভেষজ উদ্ভিদ যা জীবনে বাঁচানোর কাজে ব্যবহৃত হলেও এই মুহূর্তে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করার মাধ্যমে সেটি হয়ে উঠেছে আমাদের অ্যাডভেনচার যাত্রা ও উপভোগ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস। ডালের আঁচড়, পায়ের নিচে ছোটোখাটো কাঁটাল আঘাত, কিংবা আচমকা ভারসাম্য হারানোর ভয়— সবকিছু মিলিয়ে শিহরন আর আনন্দকে সঙ্গী করে আমরা এগিয়ে চলছি যেন অজানা কোনো গন্তব্যের দিকে।

মুহূর্তটির আবেশে হৃদয় থেকে যেন আপনিই কিছু কথা কবিতার মতো বেরিয়ে এলো—

“বৃক্ষলতায় মোড়ানো গা-ছমছমে আঁধারে ঢাকা সরু পথ।
একপাশে অজানা ভয়, অন্যপাশে রোমাঞ্চকর অক্ষয় রথ।
ঝুঁকেপড়া ডালপালা যেন চুপিচুপি অরণ্যের কোনো গোপন কথা কয়…।”

সে এক মোহাচ্ছন্ন ও রোমাঞ্চকর আবহ— যা ভাষায় প্রকাশ করা জটিলও বটে।

৫
কিছুক্ষণ না যেতেই মুখোমুখি হলাম ভিন্ন এক পরিস্থিতির। সামনের দিকে চেয়ে কিছুটা অবাকই হলাম, একটা ব্রিজ! ওমা! ব্রিজটির দিকে তাকিয়ে তো থ বনে গেলাম। এমন ব্রিজ তো কখনো দেখিনি! ভ্যান কীভাবে পার হবে এই ব্রিজ? ঢালুর পরিবর্তে ব্রিজে ওঠার জন্য দেখা যাচ্ছে ধাপ ধাপ সিঁড়ি।

আমরা পরস্পরকে বলাবলি করতে লাগলাম— এখান থেকেই বোধহয় ভ্যান ফিরে যাবে, আর আমাদের হেঁটেই এই জঙ্গল পাড়ি দিতে হবে।

গোপন একটা কথা বলে রাখি, কাউকে বলো না যেন তোমরা— আমি কিন্তু মনে মনে বেশ আনন্দিতই হলাম। কারণ, আমার ইচ্ছেই ছিল হেঁটে হেঁটে পুরো বন ঘুরব। সেই কথা কিন্তু সবার সামনে বললে বেশ বিপত্তির মুখেই পড়তে হতো। শুরুতে ভ্যানের কথা শুনে কিছুটা হতাশই হয়েছিলাম। কিন্তু যাত্রাপথের শুরুতেই এই অবস্থা দেখে বনের গহিনের মতো মনের গহিনে আনন্দের পাখিরা কিচিরমিচির করে ডাকতে শুরু করল। নির্জন অরণ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলার মধ্যে যে অন্যরকম এক আনন্দ আছে, সে আনন্দের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ বুঝি এবার এসেই গেল।

ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে থাকি নর্ত নদীর বিকেলের রোদ্দুরে ভেসে ওঠা সৌন্দর্য। নদীর পানিতে বিকেলের তপ্ত রোদ পড়ে সোনালি আলোয় ঝলমল করছে। হাঁটুপানির সেই নদীর সবুজ দুই তীরের নিচের অংশে ছড়িয়ে আছে বালু রাশি, রোদের প্রতিফলিত আলোয় যার প্রতিটি কণা চিকচিক করছে। দৃশ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সেই ছোটোবেলায় পড়া কবিতার লাইনগুলো—

“চিকচিক করে বালি কোথাও নাই কাদা।
একাধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক
রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাক।”

চলছে শ্রাবণ মাস, একাধারে কাশবন না থাকলেও নদীর উভয় তীরে রয়েছে বিস্তৃত শালবন। আরও কত যে বাহারি, কত নাম-না-জানা বৃক্ষ। সে আর বলে বোঝাব কী– সেগুন, গামারি, আকাশমনি, শিরীষ, মিনজিরি, ঘোরা নিম, সোনালু, গুটি জাম, হরিতকী, বয়রা, আমলকি, বেতসহ আরো কত যে পত্র ঝরা বৃক্ষের সমারোহ! আর ওই গহিন অরণ্যে শুধু শালিক আর শেয়ালই নয়— খরগোশ, বেজি, সাপের মতো কত কত পশু-পাখির কিচিরমিচির, ডাকে-শব্দে সারাক্ষণ চঞ্চল হয়ে আছে নর্ত নদীর উভয় তীরে বিস্তৃত সিংড়া। তার খবরই বা কে রাখে? এই বনে বিচরণ করা পাখিদেরও যে কত বিচিত্র নাম : রাজ ঘুঘু, তিলা ঘুঘু, কাঠ ঠোকরা, হাড়িচাছা প্রভৃতি পাখির কিচিরমিচির শব্দ যেন বনের স্বয়ংক্রিয় গানের আয়োজক।

আমি তখন প্রকৃতির সেই মায়ায় আচ্ছন্ন। সেই আচ্ছন্নতা এবং মনে মনে জঙ্গলের ভেতর হেঁটে হেঁটে তার প্রকৃত সৌন্দর্য গায়ে মাখার যে স্বপ্ন বুনছিলাম, নিমিষেই সেই স্বপ্নে যেন গুড়ে বালি পড়ল, যখন লাকু ভাইয়ের কণ্ঠে শুনলাম—
“ভ্যানে করেই আমরা আবার যাত্রা করব।”

আমি কিছুটা অবাকই হলাম! কিন্তু সেটি কীভাবে? সিঁড়ি দিয়ে ভ্যান কীভাবে ব্রিজের ওপর উঠবে?

এরপর যা ঘটল, সেটি ছিল আরেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

অরণ্যের অনুভূতি গ্রহণের শক্তি যেন আমার মধ্যে নতুন কোনো ইন্দ্রিয়ের জন্ম দিল। সেই শক্তির বদৌলতে শুনতে পেলাম ভ্যান যেন নিজেই বলছে—

“আমরা এতক্ষণ তোমাদের বয়ে নিয়ে এসেছি, ব্রিজের পর তো আবারও তোমাদের বয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাবাগো! আরও কতখানি পথ নিয়ে যেতে হবে যে! আমাদের কি একটু আয়েশ করার শখ নেই বুঝি? এবার নাহয় তোমরা একটু আমাদের বয়ে নিয়ে যাও।”

এমন কথা শুনে আমি যেন হাত তিনেক দূরে শটান দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা শাল গাছটির ওপর থেকে পড়ে যাওয়ার মতোই চমকে উঠলাম।

কী আর করা, ভ্যান মশাইয়ের আবদার রক্ষা করতে সবাই মিলে ধরে ভ্যানকে সিঁড়ি বেয়ে ব্রিজের ওপর তুলে দিলাম। শুধু কি তাতেই শেষ? আবার হাতের ওপর তুলে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামিয়েও দিতে হলো। বাবা! সে কী শখ ভ্যান মশাইয়ের!

যাক, ভ্যান মশাইয়ের শখ পূরণ করে অতঃপর আবারও আমাদের সেই অ্যাডভেনচারের জগতে হারিয়ে যাওয়ার পালা।

৬
গুলঞ্চ, আকন্দসহ নানান গাছ-লতাপাতায় আবৃত সেই সরু পথ ধরে অতি সাবধানতার সঙ্গে এগিয়ে চলছি নির্জন বনের বুক চিরে। পথের কোথাও হঠাৎ সামনে ঝুঁকে পড়া ডাল এসে পড়লে থেমে যেতে হচ্ছে, আবার কখনো মাথা নিচু করে, শরীর সরিয়ে, অতি সন্তর্পণে সেসব লতা গুল্মকে পাশ কাটিয়ে যেতে হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, পথটি যেন আমাদের সামনে একের পর এক ছোট ছোট পরীক্ষা ছুড়ে দিচ্ছে। এই বনের বিশেষ একটি লতার নাম গীলা লতা যা বনের ভেতরে আপনাকে মনে করিয়ে দেবে ছোটোবেলায় দেখা বনের রাজা টারজান সিনেমার কথা।

এই ঝুঁকিপূর্ণ পথের মাঝেও আমাদের আনন্দে কোনো ভাটা নেই। থাকার কথাও নয়, আমাদের ভ্রমণের সফলতাই তো এই অ্যাডভেনচার। অনেকেই ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে ভিডিয়ো করছে, ছবি তুলছে, আবার কেউ কেউ আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছে। আমাদের সামনের ভ্যানে বিপুল দাদা স্টিক ব্যবহার করে মোবাইলের ক্যামেরায় বনের সৌন্দর্য আর সবার উল্লাসের মুহূর্তগুলো ধরে রাখছিলেন।

চিৎকার করে বললাম, “দাদা, আমাদেরকেও একটু রাখেন ওই স্মৃতির খাতায়।” যদিও ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরে আমি দাদার ফোন থেকে ভ্যন যাত্রার অসম্ভব সুন্দর এবং অ্যাডভেনচার সেই মুহূর্তগুলো আমার কোনো ছবি খুঁজে পাইনি, অনেকটা দুঃখই পেয়েছিলাম।

এরই মাঝে আমিও দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে গেলাম। আর অমনি ভ্যানের এক ঝাঁকুনিতে প্রায় ছিটকে পড়েই যাচ্ছিলাম। শেষ মুহূর্তে বাদল ভাইয়ের শার্ট টেনে ধরে কোনোমতে সে যাত্রায় রক্ষা পেলাম।

সুমাইয়া আপু তখন প্রায় আতঙ্কিত হয়েই বলছিলেন, “তোমরা বসো তো! পড়ে গেলে তো আমার উপরই পড়ে যাবে, আমার হাড়গোড় সব ভেঙে যাবে।”

সব মিলিয়ে সে এক আনন্দযজ্ঞ।

বনের সেই নির্মোহ, গভীর নীরবতা— যেখানে এতক্ষণ কেবল বাতাসের শব্দ, পাতার মর্মর আর অরণ্যের নিজস্ব নিশ্বাসই শোনা যাচ্ছিল— বেরোবির একঝাঁক ভ্রমণপিপাসুর উচ্ছলতায় যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মনে হচ্ছিল, এতদিনের নিস্তব্ধ অরণ্য আজ আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসছে, ছুটছে, আর আমাদের এই অদ্ভুত অভিযানের গল্পটুকু নিজের বুকের ভেতর নিঃশব্দে লিখে রাখছে।

৭
দীর্ঘ রোমাঞ্চকর ভ্যান যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছালাম সাঁওতাল পল্লীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। যা ছিল অত্যন্ত অবহেলিত একটি প্রতিষ্ঠান। তবে সবুজে ঘেরা সেই মাঠে, বাতাসে ছিলো অন্যরকম শীতলতা।

সেখানে স্থানীয় আদিবাসী প্রবীণ-নবীন, লালন অ্যাকাডেমির কয়েকজন শিল্পী এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে শুরু হলো : গান, আড্ডা আর আনন্দের এক অনন্য আসর।

শহুরে জীবনের ব্যস্ততা থেকে বহু দূরে, সেই সবুজ মাঠে বসে মনে হচ্ছিল— সময়ের গতি যেন একটু ধীর হয়ে গেছে।
সাদিয়া বলছিল,
“এখানকার শীতল বাতাস আর নান্দনিক আবহে আমার হৃদয় ধন্য।”

কথাটির সত্যতা আরো প্রস্ফুটিত হলো যখন বড়ো ভাই ইয়েমিনের কণ্ঠে হৃদয় নিংড়ানো মায়ায় জড়ানো আবেগে ভেসে এলো–

“ আমার ভাঙা ঘরে, ভাঙা চালা
ভাঙা বেড়ার ফাঁকে—
অবাক জ্যোৎস্না ঢুইকা পড়ে
হাত বাড়াইয়া ডাকে…”

জাদুকরী সুরে ঐ সবুজ ঘাসের পরে প্রতিটি প্রাণ যেন সেই সুরের মূর্ছনায় মূর্ছা গেলেন- নেমে এলো পীণপতন নীরবতা। আবার রায়হান ভাইয়ের কমেডিয়ান ভঙ্গিতে করা জারি গান সবার মনে জুগিয়েছিল হাসির ও আনন্দের মাতম; কিংবা দুরন্ত প্রধানের “ধন্য ধন্য বলি তারে” লালন গীতির সুর আমাদেরকে যেন আসলেই ধন্য করে তোলে, মায়াবন বিহারিণীর মতোই। না, আমি যে কিছু বলিনি এমন নয়- উত্তরের পরিচিতি ভাওয়াইয়ার ব্রান্ড সং “ওকি গাড়িয়াল ভাই” গাইতে গিয়ে সে কী অবস্থা, তা না বলাই ভালো। না, গলা যে একেবারে খারাপ ছিলো তা বললে কিন্তু এক প্রকার অন্যায় করাই হবে। রাশেদ অবশ্য বলছিলো, পরিস্থিতি অনুযায়ী বোধহয় গান নির্বাচনে কিছুটা মিসটেক হয়েছে, বৈকি।

সে যায়হোক, মনে হচ্ছিলো হৃদয় ধন্য হওয়ার পরিবেশই সৃষ্টি হয়েছে সেখানে।

বনানীর মাঝে হৃদয় ছুঁয়ে, শীতল পরিবেশে, বটের ছায়ায় একাকী দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিদ্যালয়ের এক খণ্ড সবুজ মাঠ হতে সাঁওতাল পল্লীর বাতাসে তখন ছড়িয়ে পড়ল সংগীতের মনমাতানো সুর আর সৌহার্দ্যের উষ্ণতা।

৮
সমগ্র বন আর সাঁওতাল পল্লির প্রতিটি আঙ্গিনায় সেই সুর ছড়িয়ে গেলেও, সুরের তরঙ্গ পৌঁছায়নি কেবল সাঁওতাল পল্লির একটি বাড়িতে। আমরা যখন গান গাইছি, হাসছি, গল্প করছি— ঠিক তখনই মাত্র কয়েকশ গজ দূরে একটি বাড়িতে চলছিল শোকের মাতম।

একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের একজন প্রিয় মানুষকে।

একদিকে লোকগানের সুর।
অন্যদিকে কান্নার শব্দ।
একদিকে জীবনের উচ্ছ্বাস,
অন্যদিকে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

ভাবলাম— এটাই বোধহয় পৃথিবী।
একই আকাশের নিচে, একই বাতাসে, একই মুহূর্তে কেউ হাসছে আর কেউ কাঁদছে।

জীবনানন্দের কবিতায় তখন খুঁজে ফিরি সেই চরম সত্যতার ছান্দসিক গতি-
“সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি—
এই নদী নক্ষত্রের তলে
সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন—
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!”

আর মনে হলো—
“আমি চলে যাব বলে
চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে,
নরম গন্ধের ঢেউয়ে?”

হয়ত এটাই পৃথিবীর নির্মম নিয়ম।
কেউ চলে যায়, কিন্তু পৃথিবী থেমে থাকে না।

কারও ঘরে শোক নেমে এলেও পাশের ঘরে জীবন তার নিজস্ব ছন্দে চলতে থাকে।

মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়।
কিন্তু,
সূর্য অস্ত যায়। আবার সূর্য ওঠে।
নদী বয়ে যায়।
বন তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলে।

আর জীবন— সে নিজের গতিতেই চলতে থাকে। কোথাও ব্যাঘাত ঘটে না পৃথিবীর নির্মম কর্মযজ্ঞের।

জীবন কখনো একরঙা নয়। আনন্দের পাশেই তার অদৃশ্য ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে অশ্রু।

৯
সাওতাঁল পল্লির সেই পরিবারের একটি হৃদয়ের সূর্য ঢলে পড়ার সাথে সাথে সিংড়া অরণ্যের সূর্যও পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। আর তারই সাথে আমাদের দিনের সূর্যও যেন অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এবার ফেরার পালা।
ফিরতি পথে সাঁওতাল পল্লি থেকে আমরা এবার সম্পূর্ণ নতুন একটি পথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। পড়ন্ত বেলায় অরণ্যের সেই নিস্তব্ধ পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পথের পাশে চোখ আটকে গেল বিশাল আকৃতির কিছু মাটির স্তম্ভের দিকে, আবছা আলোয় দূর থেকে দেখে আমি আসলেই ভয় পেয়ে গেলাম– মনে হলো, এই অদ্ভুত বৃহদাকার জিনিসটা দেখে তো কোনো প্রাণীর আস্তানাই মনে হচ্ছে। ভেতরে কোনো বড়ো অজগর কুণ্ডলী প্যাঁচিয়ে বসে নেই তো? হুট করে সামনে বের হয়ে এলে কী হবে তখন? ভয়টা অস্বাভাবিক নয়, আগেই বলেছি, এই বনে অজগরও আছে।

তবে কোনো একজনের কাছ থেকে শুনলাম ওগুলো আসলে সাপের আস্তানা নয়, বহুকাল ধরে হাজার হাজার উইপোকার নীরব পরিশ্রমে গড়ে তোলা এক একটি সুবিশাল রাজপ্রাসাদ। এতদিন কেবল বইয়ের পাতাতেই নাম পড়েছিলাম, বাস্তবে চোখে দেখা এই প্রথম।

পরে জানতে পেরেছি, একটি-দুটি নয়, পুরো সিংড়া ফরেস্ট জুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এমন শত শত ঢিবি। খালি চোখে যা কেবল মাটির স্তূপ, অরণ্যের গহিনে সেটা অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আশ্রয়স্থল আর এই প্রাচীন এই বৈচিত্র্যময় বনের ভারসাম্য টিকে থাকার এক নীরব ভিত্তি। ভয়টা তখন এক নিমেষে উবে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল প্রকৃতির গভীর অথচ নীরব এক বিস্ময়।

১০
সারাদিন ধরে স্মৃতি কুড়ানোর পরেও মনে হচ্ছিলো কিছু একটা যেন অপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে। মনে তখনও সেই অদৃশ্য অতৃপ্তির ঢেকুর অনুভব করছিলাম।

আরও কিছুক্ষণ যদি থাকা যেত!
আরও একটু যদি এই বন, এই নদী, এই বাতাসকে নিজের করে নেওয়া যেত!

হাঁটতে হাঁটতে আমরা এসে দাঁড়ালাম নর্ত নদীর ওপর অন্য একটি ব্রিজের সামনে। চারপাশে তখন সন্ধ্যার আবছা আলো। দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসছে।

বিষণ্ন মনে ভাবছি— এই তো, এবার শেষ।
কিন্তু প্রকৃতি তখনও তার সবচেয়ে বড়ো চমকটি লুকিয়ে রেখেছিল, সেদিনের সেরা উপহার। নর্তের জলে ফিরে এলো অপ্রত্যাশিত শৈশব। সন্ধ্যার আবহে নদীর তীরে কয়েকটি ছবি তোলার জন্য সবুজ তীর ধরে একটুখানি সামনে এগিয়ে যেতেই, হঠাৎ দেখি— সাকিব আর কনক নদীতে নেমে পড়েছে।

আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে, অথচ তারা নদীতে!
আর তার চেয়েও অবাক করার বিষয়— কনক এরই মধ্যে একটি মাছও ধরে ফেলেছে। তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।

কোনো চিন্তা নেই, কোনো দ্বিধা নেই।
চোখের পলকে প্যান্ট ছুঁড়ে ফেলে কোনোমতে লুঙ্গিটা পরে লাফিয়ে পড়লাম নর্তের শীতল জলবহরে।

জল খুব বেশি নয়।
কোথাও গোড়ালি, কোথাও হাঁটুসমান।
কোমর পর্যন্তও পানি পাওয়া গেল না।

কিন্তু সেই পানিতেই নামার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভেতরের যে শিশুটি এতদিন কোথাও লুকিয়ে ছিল, সে দুরন্ত শিশুটি যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠল।

আমরা গড়াগড়ি খাচ্ছি,
পানি ছিটাচ্ছি।
হাসছি।
দৌড়াচ্ছি।
চিৎকার করছি।
বয়সের হিসাব ভুলে গেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় ভুলে গেছি।

মনে হচ্ছিল— আমরা আবার সেই ছোট্ট ছেলেগুলো, যারা বর্ষার পানিতে নেমে মায়ের ডাক অগ্রাহ্য করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলতাম।

অন্ধকার তখন প্রায় নেমে এসেছে। কিন্তু কী আশ্চর্য, একে একে আমাদের বন্ধুদের পাশাপাশি অনেক বড়ো ভাই– লাকু, ময়েন, সাজ্জাদ এবং বিপুল দাদাসহ পুরো একটি দল নেমে পড়ল নদীতে। নর্ত নদীর সেই সন্ধ্যা মুহূর্তেই হয়ে উঠল এক টুকরো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের অন্যান্য সহযাত্রীরারা সেই দৃশ্য উপভোগ করছিল। মনের সব উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে আমরা তখন সেই মিলিয়ে যাওয়া আলোর, আঁধারের নিমজ্জিত এবং অরণ্যের নীরবতার মাঝে জলকেলিতে মত্ত। ছোটো-বড়ো সম্পর্কের যে দূরত্ব, সেটি যেন হারিয়ে গেছে বহু বছর পর এই ফিরে পাওয়া শৈশবের আনন্দে।

সাদিয়া, পারভিন এবং তাদের সহযোগী আশা ও মনিরার সৌহার্দ্যপূর্ণ উপস্থিতি আমাদের এই আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের অকৃত্রিম আনন্দময় সেই মূহুর্তগুলোর স্মৃতি সংরক্ষণে তাদের ছিলোন কোনো সংকীর্ণতা। নদীর বালুকাময় তীরে দাড়িয়ে, কেউবা নদীতে নেমে তাদের নিজেদের সাথে সাথে আমাদেরও অত্যন্ত উৎসাহের সাথে–

ছবি তুলছে,
ভিডিয়ো ধারণ করছে।

এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো তারাও আমাদের এই আনন্দকে সমানভাবে নিজেদের মনে রাঙিয়ে নিয়েছে। আমি তো বারবার বলছিলাম, এখানে একটা ছবি তোল, এভাবে না ওভাবে, এখানে না সেখানে। সুলতানা নদী থেকে উঠে যাচ্ছিলো, কিন্তু আমি বারবার ওকে ডেকে নিচে নামিয়ে ছবি তুলতে বলছিলাম- আমার তো মনে হয় সে বিরক্তই হয়ে গেছে। বারবার বলছিল– তুই মেয়েদের মতো এত ছবি তুলিস ক্যান রে? যদিও পরে গ্যালারিতে ছবি খুঁজতে গিয়ে এই কথার সত্যতা আমি খুঁজে পাইনি– বলার মতো ছবি ছিল না বললেই চলে। আর, পরে জানতে পেরেছি তারা কেউই বিরক্ত হয়নি, বরং আমাদের সাথে সাথে তারাও সেই চমৎকার মুহূর্তটিকে মনের সব জড়তাকে ঝেড়ে ফেলে উপভোগ করার চেষ্টা করেছে। তাদের ভাবনা ছিলো এমন : “ইশ, আরো আগে যদি এখানে আসতে পারতাম!”

সেদিনের ঐ স্মৃতিময় ক্ষণ আমার ডায়েরিতে উঠে আসে ঠিক এভাবে— কিছু মুহূর্তে ছবি তোলার মানুষ আর ছবির মানুষ আলাদা থাকে না।

১১
হঠাৎই খেয়াল হলো আমি নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছি, আশ্চর্যান্বিত হলাম। কারণ নদীতে পানি তো হাঁটু সমান, কিন্তু স্রোত তীব্র। একদিকে আমার একমাত্র বসনটি বিবস্ত্র হওয়ার জোগাড়, অপরদিকে স্রোতের হাত থেকে নিজেকে আটকাতে হবে -কী এক রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি! কোনোভাবে সেই পরিস্থিতি সামলে নেই। তবে, আমার বিস্ময় যায়নি এখনো- এরকম কম পানিতেও কীভাবে এত স্রোতের সৃষ্টি হয়? পাহাড়ি নদীতে এরকমটা সাধারণত হয় বলে জানি, কিন্তু সমতল একটি বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে মুহূর্তে এমন সৃষ্ট স্রোতের ব্যাখ্যা আমি বের করতে পারিনি- তবে কি বনের সাথে পাহাড়ের এক অদৃশ্য সম্পর্ক রয়েছে?

হয়ত প্রকৃতির কিছু রহস্যের উত্তর জানার জন্যই মানুষকে বারবার প্রকৃতির কাছে যেতে হয়। হয়ত নদী সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কিছু প্রশ্ন জবাবহীনই রয়ে যায় হৃদয়ের গহিনে।

১২
অন্ধকার তখন পূর্ণরূপে চারপাশ গ্রাস করেছে।
আমরা নদী থেকে উঠে এলাম।
শরীরে দিনের ক্লান্তি, কিন্তু মনে অদ্ভুত এক সতেজতা।

সারাদিনের রোদ, ধুলো, পথের ঝাঁকুনি, কাঁটাল আঁচড়, ভ্যানের ধাক্কা— সমস্তকিছু যেন নর্তের ঠান্ডা জলে ধুয়ে গেছে। সেদিনের দিনের শেষ ছবি যেন আমার চোখের সামনে এখনও ভাসে—
গভীর অরণ্যের সরু পথ,
নুয়ে পড়া গাছের ডাল,
সাঁওতাল পল্লীর সবুজ মাঠ,
লোকগানের সুর,
একটি পরিবারের কান্না, পৃথিবীর চরম বাস্তবতা,
পুরোনো ব্রিজ,
সন্ধ্যার নদী,
আর হাঁটুজলের ভেতর শৈশব খুঁজে পাওয়া একদল তরুণ।

জীবনানন্দীয় ঢঙে এই দিনের অমলিন প্রতিচ্ছবি :
“পথের চারিদিকে নুয়ে পড়ে রয়েছে—
জারুল, তরুল, গুলঞ্চ, আকন্দের বন।
সেখানে কেবল নদী করে একা শব্দ নির্জন।
মানুষের কোলাহল থেমে গেছে বহু দূর আগে …”

কিন্তু সেদিন মানুষের কোলাহল পুরোপুরি থামেনি।

বরং সেই নীরব অরণ্যের বুকেই আমরা আমাদের হাসি রেখে এসেছি। আর রেখে এসেছি কিছু গান।
কিছু ছবি।
কিছু অপ্রস্তুত হাসি।
কিছু অদ্ভুত ভয়।
কিছু রোমাঞ্চ।

আর সবচেয়ে বড়ো যে বিষয়টি ফেলে এসেছি— শৈশবের একটি দুরন্ত বিকেল।
ভ্রমণ শেষ হয়, গল্প শেষ হয় না।

বাস যখন নীড়ের দিকে ফিরছিল, তখন শরীর ক্লান্ত।
চোখে ঘুম।
কিন্তু মন, তখনও জেগে আছে।

বারবার মনে হচ্ছিল— আজকের দিনটা কি সত্যিই শেষ হয়ে গেল? ভ্রমণ আসলে কখনো শুধু একটি স্থান দেখা নয়। কোনো কোনো ভ্রমণ আমাদের নতুন জায়গা দেখায়। কোনো কোনো ভ্রমণ আমাদের নতুন মানুষ চিনিয়ে দেয়। আবার কোনো কোনো ভ্রমণ আমাদের নিজেকেই নতুন করে চিনিয়ে দেয়। সিংড়া আমাকে সেদিন আমার নিজের ভেতরের সেই দুরন্ত শিশুটির সঙ্গে আবার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।

নর্ত আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল— বয়স যতই বাড়ুক, মানুষের ভেতরে কোথাও না কোথাও একটা ছোট্ট নদী বয়ে যায়। সুযোগ পেলেই সেই নদীতে শৈশব নেমে আসে। সেদিন নর্তের অল্প জলে আমরা শুধু শরীর ভেজাইনি– ভিজিয়েছিলাম স্মৃতি।

দিনের সব ক্লান্তি, উত্তাপ, ব্যস্ততা আর বড়ো হয়ে ওঠার ভানকে পেছনে ফেলে নর্তের শীতল বুকে আমরা যেন এক মুহূর্তের জন্য আবার ছোট হয়ে গিয়েছিলাম।

তারপর ফিরে এসেছি।
নীড়ের দিকে।

কিন্তু আমাদের সঙ্গে ফিরেছে আরেকটি অদৃশ্য সঙ্গী—
একঝাঁক রঙিন স্মৃতি।
যে স্মৃতির গায়ে আজও লেগে আছে সিংড়ার অরণ্যের গন্ধ,
সাঁওতাল পল্লীর বাতাস,
লোকগানের সুর,
সন্ধ্যার নর্তের শীতল জল,

আর আবছা আলোয় ফিরে পাওয়া সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

ভ্রমণ শেষ হয়েছিল সেদিন।
কিন্তু গল্পটি— আজও শেষ হয়নি।

🖋️১৩ই আগস্ট, ২০২৬

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মাসিক আলোর শিখা (পৃষ্ঠা: ৬৮-৭৬) পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।