সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাই সংযম

Author

আফিয়া মোবাশসিরা ঐশী , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৩ বার

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ইন্টারনেটবিহীন জীবনের কথা ভাবা প্রায় অবান্তর। যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন — জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তির এই বৈপ্লবিক যুগে এই নির্ভরতা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বয়সে সীমাবদ্ধ নেই। অদৃশ্য এক জালের মতো ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। বাংলাদেশ ডেটা রিপোর্টালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬.৩ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম টুইটার, ইমো, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ সহ টিকটক এর মতো জনপ্রিয় প্লাটফর্মগুলো আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ মাধ্যম গুলো আমাদের দূরত্বকে দূর করে পুরো পৃথিবীকে এনে দিয়েছে হাতের মুঠোয়। বিভিন্ন তথ্য,ছবি পাঠানো, বার্তা প্রেরণ, শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। ই- লার্নিং, গ্রুপ স্টাডি, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষামূলক কমিউনিটিসহ সকল ক্ষেত্রে যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে । তবে প্রযুক্তির আশীর্বাদ আমাদের জন্য সব সময় কল্যাণ বয়ে আনে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সাময়িকভাবে কল্যাণ বয়ে আনলেও,অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের ঠেলে দিচ্ছে নানা ধরনের ঝুঁকি এবং হুমকির মধ্যে। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখা যেন আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একটু বিনোদন ও নতুন তথ্যের আশায় অনবরত স্ক্রলিং কখন যে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তা আমাদের অবচেতন মন বুঝতেও পারেনি। অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রলিং অপচয় করছে সময়, ক্ষুন্ন করছে সম্ভাবনার দুয়ার এবং তৈরি করছে সম্পর্কের দূরত্ব। একই সাথে বাধা দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় এবং তরুণ সমাজকে ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে বিভ্রান্তির দিকে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ৫৯ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারী ৭ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি। যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ। এবং বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫০০কোটিরও বেশি। ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধির পাশাপাশি সাইবার অপরাধের মাত্রাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে ।অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহারের ফলে দিন দিন বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানসিক সমস্যা, এবং সাইবার ক্রাইম। সাইবার ক্রাইম ও সাইবার বুলিংয়ের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী হলো আজকের তরুণ সমাজ ও নারী। পরিসংখ্যান বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত থাকা প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে অন্তত ৫৯ জন নারী সাইবার ক্রাইম এর শিকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করে নারীদের ফেলছে বিভিন্ন ফাঁদে। কখনো প্রেমের সম্পর্ক বা কখনো অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত ছবি, তথ্য নিয়ে বিভিন্ন অসামাজিক কাজ বা ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। নারীরা সম্মুখীন হচ্ছে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের। এবং সমাজের তরুণরা আসক্ত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিতে। যার ফলে বাড়ছে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা। সমানতালে বাড়ছে কিশোর অপরাধও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর নেতিবাচক প্রভাব শুধু নারী বা তরুণদের মধ্যেই বিদ্যমান নয় বরং এর প্রভাব পড়ছে শিশু ও শিক্ষার্থীর উপরেও। অতিরিক্ত স্ক্রলিংয়ের ফলে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে। শুধু তাই নয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। বাবা-মা সহ পরিবারের সকলেই যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত তখন শিশুরা পার করছে একাকীত্ব সময়। প্রয়োজনে পাশে পাচ্ছে না বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের। ফলে শিশুদের মাঝে তৈরী হচ্ছে একাকীত্ব ও মানসিক চাপ। তাদের সরল মন, কৌতূহলের বসে এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় খুব সহজেই জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অনলাইন গেম ও বিপদজনক ওয়েবসাইটে। অপরদিকে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বা অনলাইন ক্লাসের নাম করে সময় নষ্ট করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। ফলে তারা সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারছেনা। শিশু ও শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে বই বিমুখ। মোবাইল ফোনই যেন হয়ে উঠেছে বইয়ের বিকল্প। ফলে শিশু ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সৃজনশীল চিন্তাশক্তি হ্রাস পাচ্ছে এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ফলে অল্প বয়সেই চোখের নানা সমস্যা, একাকীত্ব, মেজাজ খিটখিটে, অনিন্দ্রা সহ মানসিক ও শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে । যোগাযোগ মাধ্যমগুলো নতুন প্রজন্মকে দিন দিন ঠেলে দিচ্ছে বিপদের মুখে এবং ধ্বংস করে দিচ্ছে তাদের প্রতিভা। এখানেই শেষ নয়, যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ছড়াচ্ছে বিভিন্ন অশালীন ছবি এবং অপপ্রচার। ফলে সমাজের অনেকেই হচ্ছে অপমানিত ও অপদস্থ। ফলে ব্যবহারকারীরা ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। তাই প্রযুক্তির এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমত, সাইবার অপরাধ দমনে দেশে বিদ্যমান আইন কে আরও কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশু সহ সকলের মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ভালো এবং খারাপ দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। এবং সাইবার ক্রাইম ও সাইবার বুলিং সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। বাবা মা সহ পরিবারের সকল সদস্যদের সচেতন থাকতে হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত শিশুদের হাতে ব্যক্তিগত কোনো ডিভাইস তুলে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এবং পরিবারের সকল সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হবে যেন শিশুরা একাকিত্বে না ভোগে। তৃতীয়ত, ব্যবহারকারীদের তাদের নিরাপত্তা জন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, সন্দেহজনক লিংক এড়ানো এবং পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অপরিচিত কোন ব্যক্তিকে তথ্য বা ছবি আদান প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। চতুর্থত, সকালে ঘুম থেকে উঠে শুরুতেই নোটিফিকেশন না দেখে দিনের প্রয়োজনীয় কাজ গুলো সম্পন্ন করা এবং অপ্রয়োজনীয় সব অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখা। শারীরিক ব্যায়ামসহ বিভিন্ন খেলাধুলার সাথে যুক্ত থাকা এবং বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিনোদনের মোড়কে আমাদের মনকে নীরবে নিয়ন্ত্রণ করছে। পাঁচ মিনিট স্ক্রল করার উদ্দেশ্যে ঢুকেও কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হারিয়ে যায়, তার হিসাব থাকে না। সামান্য বিনোদনের বিনিময়ে এটি কেড়ে নিচ্ছে মূল্যবান সময়। তাই প্রযুক্তির এই মায়াজালে নিজেকে জড়িয়ে না ফেলে আমাদের হতে হবে সচেতন, সংযত ও দায়িত্বশীল। শুধু শিশু-কিশোরদের নিরাপদ রাখাই নয়, সকল ব্যবহারকারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, বন্ধ হবে অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রলিং এবং অপচয় রোধ হবে সময় ও সম্ভাবনার।

লেখক: নবীন লেখক, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।