মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, তবু পিছিয়ে বাংলাদেশ

Author

নিয়ামুর রশিদ শিহাব , Global University Bangladesh

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ১৬ বার

বাংলাদেশের নাম বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার, উপকূলের অপরূপ সৌন্দর্যের কুয়াকাটা, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়ি ঝরনা, হাওড়, নদী, চর, দ্বীপ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কিন্তু এত বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ এখনও প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্যা কোথায়?
পর্যটনকেন্দ্রিক অবকাঠামোর ঘাটতি বড় বাধা। কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড় থাকলেও সেখানে পর্যটন ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কুয়াকাটার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ, পর্যাপ্ত গণপরিবহন, পরিচ্ছন্নতা, আধুনিক পর্যটন সুবিধা, তথ্যকেন্দ্র ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছাতে যদি দীর্ঘ সময় লাগে কিংবা যাতায়াতব্যবস্থা দুর্বল হয়, তা হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
পরিচ্ছন্নতার অভাব আমাদের পর্যটনশিল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা। সমুদ্রসৈকত, নদীর তীর কিংবা দর্শনীয় স্থানে প্লাস্টিক, পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। পর্যটনকেন্দ্র শুধু সুন্দর হলেই হবে না, সেটিকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধবও হতে হবে। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল পরিবেশে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
পর্যটনশিল্পে পেশাদার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। একজন বিদেশি পর্যটক কোনো দেশে গিয়ে শুধু একটি সুন্দর জায়গা দেখতে চান না; তিনি চান নিরাপদ যাতায়াত, স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা, ভালো আবাসন, তথ্যসেবা, প্রশিক্ষিত গাইড এবং সহজ যোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও পরিকল্পিত হতে হবে। পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, পরিবহন ও আবাসন খাতে অস্পষ্টতা কিংবা পর্যটকদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ থাকলে দেশের পর্যটন ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ তাদের পর্যটনকেন্দ্রের প্রচারে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও প্রচার হয়, তবে তা আরও পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক হওয়া প্রয়োজন।
কক্সবাজার কিংবা সুন্দরবনের পাশাপাশি কুয়াকাটা, রাতারগুল, সাজেক, বান্দরবান, সুনামগঞ্জের হাওড়, পাথরঘাটা, সোনারগাঁ, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন গন্তব্যকে পৃথক পর্যটন ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে।
সুন্দরবন বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ম্যানগ্রোভ বন, নদী-খাল ও জীববৈচিত্র্যের কারণে সুন্দরবনের আকর্ষণ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সুন্দরবনকে পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যেন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
আরেকটি সমস্যা হলো নিরাপত্তা ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি। পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তা, পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। একই সঙ্গে হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও ট্যুর অপারেটরদের সেবার মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
পর্যটনকে শুধু কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘিরে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানকে যুক্ত করতে হবে। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড হিসেবে গড়ে তোলা, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প ও সংস্কৃতিকে পর্যটন পণ্যে পরিণত করা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া গেলে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
শুধু দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা, সেমিনার কিংবা র‌্যালি নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পৃথক পর্যটন মহাপরিকল্পনা, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আন্তর্জাতিক প্রচারের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা কম নয়; বরং সমস্যা হলো সেই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে। প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে সমুদ্র, বন, পাহাড়, নদী ও ইতিহাস। এখন প্রয়োজন সেগুলোকে দায়িত্বশীল ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। পর্যটক শুধু একটি জায়গা দেখতে আসেন না; তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান একটি দেশের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি। বাংলাদেশ যদি সেই অভিজ্ঞতাকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী ও আনন্দময় করতে পারে, তা হলে পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সংকট আসলে সম্ভাবনার সংকট নয়; বরং সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ঘাটতি। বাংলাদেশের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্রের উদ্বোধন নয়, বিদ্যমান গন্তব্যগুলোর মান উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটকের আস্থা  অর্জন করতে হবে। কারণ একজন পর্যটক সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলে তিনি শুধু একজন পর্যটক থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের একজন স্বেচ্ছাসেবী প্রচারক।
লেখক: প্রচার সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।