শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

❝দেশে কি নিরব দুর্ভিক্ষ চলছে?❞

Author

Azizur Rahman Santo, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৮ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৪০ বার

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এক অদ্ভুত নীরবতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। চারদিকে সংকটের উপস্থিতি স্পষ্ট, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া যেন অনুপস্থিত। বাজারে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, কর্মঘণ্টা হ্রাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনলাইন নির্ভরতা এবং মানুষের হাতে নগদ অর্থের সংকট—সব মিলিয়ে এক জটিল বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই সংকটগুলো নিয়ে তেমন উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ বা ব্যাপক জনআলোচনা চোখে পড়ে না। ফলে প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে—বাংলাদেশে কি এক ধরনের “নীরব দুর্ভিক্ষ” চলছে?

প্রথমেই “নীরব দুর্ভিক্ষ” ধারণাটি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রচলিত দুর্ভিক্ষের চিত্র আমাদের কাছে পরিচিত খাদ্যের তীব্র অভাব, অপুষ্টি, মৃত্যুর মিছিল এবং মানবিক বিপর্যয়। কিন্তু নীরব দুর্ভিক্ষ ভিন্ন প্রকৃতির। এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে খাদ্যের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না, কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। আয় স্থবির থাকে বা কমে, অথচ ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে আনে—কম খায়, নিম্নমানের খাবারে অভ্যস্ত হয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় ব্যয় কমায়। এই প্রক্রিয়াটি ধীর, কিন্তু গভীর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানুষ এই সংকটকে প্রকাশ্যে তুলে ধরতে চায় না। সামাজিক সম্মান, লজ্জা, ভয় বা অনিশ্চয়তা তাদেরকে নীরব থাকতে বাধ্য করে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই চিত্রের সঙ্গে একটি স্পষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গত কয়েক বছরে দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি ঘটেছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি—প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অথচ অধিকাংশ মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে প্রকৃত অর্থে মানুষের বাস্তব আয় কমে গেছে। এই অবস্থায় মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের খরচ কমাচ্ছে—অনেকে তিনবেলার খাবার দুইবেলায় নামিয়ে আনছে, পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে কম দামের বিকল্পে ঝুঁকছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে অপুষ্টি, রোগপ্রবণতা এবং মানবসম্পদের অবক্ষয়।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বিদ্যুৎ ঘাটতি ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। কর্মঘণ্টা কমানো, ওভারটাইম বন্ধ করা কিংবা কর্মী ছাঁটাই এসব ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে, যা আবার বাজারে চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ একটি চক্র তৈরি হয়েছে, যেখানে সংকট নিজেই নিজেকে আরও গভীর করছে।

মানুষের হাতে নগদ অর্থের সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যখন মানুষের হাতে খরচ করার মতো টাকা থাকে না, তখন বাজারে চাহিদা কমে যায়। ব্যবসায়ীরা বিক্রি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ কমায়, উৎপাদন কমায়। এতে আবার কর্মসংস্থান কমে যায়। এই সংকুচিত অর্থনৈতিক চক্র একটি নীরব সংকটের জন্ম দেয়, যা ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে এই নীরবতা কেন?
সংকট এত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কেন এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না?

এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, সামাজিক ও মানসিক কারণ। মানুষ সাধারণত তাদের আর্থিক দুরবস্থা প্রকাশ করতে চায় না। দ্বিতীয়ত, অনিশ্চয়তার ভয়—চাকরি হারানোর আশঙ্কা বা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে চুপ থাকতে বাধ্য করে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ যেখানে অনেক সময় খোলামেলা সমালোচনা বা প্রতিবাদ সীমিত হয়ে যায়। ফলে সংকট থাকলেও তা প্রকাশ্য আলোচনায় পরিণত হয় না।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নীতিগত দুর্বলতা এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এছাড়া নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তবে এই সংকটের জন্য শুধু সরকারকে দায়ী করলে বাস্তবতা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনিয়ন্ত্রিত মুনাফালোভ, বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে দায়ী। একটি সুস্থ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে সরকার, বেসরকারি খাত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।

একই সঙ্গে সমাজের ভেতরেও একটি পরিবর্তন প্রয়োজন। সংকটকে অস্বীকার করে বা আড়াল করে রাখলে তার সমাধান সম্ভব নয়। বরং খোলামেলা আলোচনা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সচেতন জনমতই পারে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে হয়তো এখনো প্রচলিত অর্থে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি। কিন্তু নীরব দুর্ভিক্ষের লক্ষণগুলো ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এটি এমন এক সংকট, যা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করে দেয়।

এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন বাস্তবতা স্বীকার করা, সংকটের গভীরতা বোঝা এবং সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অন্যথায়, আজকের এই নীরব সংকটই একসময় দৃশ্যমান ও ভয়াবহ জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে যার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!