ব্রেইন ড্রেন কীভাবে একটি জাতির উদ্ভাবনী ক্ষমতা নষ্ট করে?

ব্রেইন ড্রেন কীভাবে একটি জাতির উদ্ভাবনী ক্ষমতা নষ্ট করে? (দ্যা ডেল্টা টাইমস, প্রকাশিত, ২০ এপ্রিল, ২০২৬)
একটি গাছকে যদি তার শেকড় থেকে প্রতিনিয়ত পুষ্টি টেনে নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে গাছটি হয়তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু তাতে আর নতুন ফুল ফুটবে না বা ফল ধরবে না। একটি জাতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে যখন সে তার সবচেয়ে প্রতিভাবান এবং সৃজনশীল মস্তিষ্কগুলোকে হারায়। ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধাপাচার কেবল কিছু মানুষের দেশত্যাগ নয়; এটি মূলত একটি জাতির ভবিষ্যৎ, তার স্বপ্ন এবং সবচেয়ে বড় কথা তার উদ্ভাবনী সক্ষমতার নীরব মৃত্যু। বিশ্বায়নের এই যুগে মেধার বিশ্বায়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মনে হলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একতরফা রক্তক্ষরণের মতো। যখন কোনো দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা গবেষকরা উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়েন, তখন সেই জাতি ঠিক কী কী হারায় এবং কীভাবে তার উদ্ভাবনী মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
উদ্ভাবন কোনো বিচ্ছিন্ন জাদুকরী মুহূর্ত নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যা নির্ভর করে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেমের ওপর। একজন গবেষক যখন একা কাজ করেন, তখন তার চেয়ে বেশি সফল হন যখন তিনি সমমনা ও মেধাবী মানুষদের একটি দলের সাথে যুক্ত থাকেন। মেধাপাচারের ফলে এই মেধার ন্যূনতম ঘনত্ব তৈরি হতে পারে না। ল্যাবরেটরিগুলো খালি হয়ে যায়, স্টার্টআপ কালচার অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিণত হয় কেবল সার্টিফিকেট বিতরণের কারখানায়। একটি দেশে যখন নতুন কিছু তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত মেধাবী মস্তিষ্কই অবশিষ্ট না থাকে, তখন সেই দেশের উদ্ভাবনী চাকা চিরতরে থমকে যায়।
এর পাশাপাশি তৈরি হয় স্থানীয় সমস্যার বৈশ্বিক অবহেলা। প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং তাদের সমস্যাগুলোও অনন্য। উন্নত বিশ্বের গবেষণাগারে বসে তৃতীয় বিশ্বের গ্রামীণ কৃষকের সমস্যা বা ট্রপিক্যাল জলবায়ুর ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার মতো রোগের সমাধান খুব একটা বের হয় না। যে তরুণ বিজ্ঞানীটি হয়তো তার মেধা দিয়ে দেশের বন্যা-সহনশীল নতুন কোনো ধানের জাত উদ্ভাবন করতে পারতেন, তিনি হয়তো এখন ইউরোপ বা আমেরিকায় বসে এমন কোনো অ্যালগরিদম তৈরি করছেন যা প্রথম বিশ্বের জন্য প্রাসঙ্গিক। ফলে, মেধাপাচারের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব সমস্যাগুলো দিনের পর দিন সমাধানহীনই থেকে যায়।
গবেষণা এবং উদ্ভাবন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়। একজন নবীন গবেষক তার সিনিয়রদের কাছ থেকেই শেখে কীভাবে ব্যর্থতা সামলে নতুন করে ভাবতে হয়। মেধাপাচারের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ক্ষতি হলো এই মেন্টরশিপের অভাব। অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ গবেষকদের প্রস্থানে নতুন প্রজন্ম হারায় তাদের আদর্শ এবং দিকনির্দেশনা। প্রাতিষ্ঠানিক মেমরি বা ইনস্টিটিউশনাল নলেজ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতিটি নতুন প্রজন্মকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়, যা উদ্ভাবনের গতিকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করে দেয়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মেধাপাচার হলো এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি। একটি দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশ তার সীমিত সম্পদ, করদাতার অর্থ এবং অবকাঠামো ব্যবহার করে একজন নাগরিককে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষিত করে তোলে। কিন্তু যখন সে সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়, তখন উন্নত বিশ্ব তাকে লুফে নেয়। অর্থাৎ, উন্নত দেশগুলো বিনা মূলধনে বা বিনা বিনিয়োগে শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উদ্ভাবনী খাতকে আরও সমৃদ্ধ করছে। এটি প্রকারান্তরে দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে ধনী দেশগুলোকে দেওয়া এক বিশাল অদৃশ্য ভর্তুকি। এই পরিস্থিতি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। মেধাবীরা চলে যাওয়ার কারণে দেশে উদ্ভাবন হয় না, অর্থনীতি স্থবির থাকে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যায়। আর এই স্থবিরতা ও সুযোগের অভাবের কারণেই পরবর্তী প্রজন্মের মেধাবীরা আরও মরিয়া হয়ে দেশ ছাড়ে।
এই চক্র ভাঙা অত্যন্ত কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। মেধাপাচার রোধ কেবল দেশপ্রেমের আবেগ বা আইনি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সম্ভব নয়। মেধাবীরা তখনই দেশে থাকবেন বা ফিরে আসবেন, যখন তারা তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন পাবেন। এর জন্য প্রথমেই জাতীয় বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের একটি সম্মানজনক অংশ গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি, গবেষণাগার ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা জরুরি। মেধার মূল্যায়নে দলবাজি বা স্বজনপ্রীতির বদলে শতভাগ যোগ্যতাকে মাপকাঠি করতে হবে। অন্যদিকে, যারা ইতিমধ্যে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, তাদের সাথে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারগুলোর একটি সেতুবন্ধন বা ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন। এর ফলে তারা দেশে না ফিরেও দূর থেকে নিজেদের মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশের উদ্ভাবনী কার্যক্রমে অবদান রাখতে পারবেন।
একটি জাতি কতটা সমৃদ্ধ হবে, তা নির্ভর করে সে তার শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলোকে কতটা ধরে রাখতে ও কাজে লাগাতে পারছে তার ওপর। মেধাপাচারকে কেবল অভিবাসন হিসেবে না দেখে, জাতীয় নিরাপত্তার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে দেখা এখন সময়ের দাবি। নতুবা, উদ্ভাবনহীন এক পরনির্ভরশীল জাতি হিসেবে টিকে থাকা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না।
মো. হাবিবুল্লাহ বাহার, নির্বাহী সদস্য, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদ রাকসু।

