ঈদ যেখানে যেমন
দীর্ঘ একমাস সাওম সাধনার পর শাওয়াল মাসের বাঁকা চাঁদ মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে খুশির জোয়ার বয়ে আনে। রমজান মাসে প্রভুর আনুগত্যে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার পুরস্কার-স্বরূপই যেন ঈদের আগমন। ঘরগুলো ভেসে যায় আনন্দের আবেশে; নাড়ির টানে পরিবারের সদস্যরা ফিরে আসে আপন নিড়ে।
উৎসব ও আমেজ মুখর পরিবেশে ঈদ পালিত হয় বিশ্বের সকল দেশে। অঞ্চলভিত্তিক ঈদ উদযাপনে দেখা যায় বিভিন্নতা। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতায় ঈদকে ঘিরেও দেখা যায় বিভিন্ন ঐতিহ্য। কেউ বা রাঁধেন সুস্বাদু খাবার, কারো বা ঈদ উদযাপিত হয় বোমার সাইরেনের নিচে মৃত্যভয়ে। আসুন – দেখে নিই বিশ্বজুড়ে বৈচিত্র্যময় ঈদ উদযাপনের খন্ডচিত্র –
মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়ার মুসলমানরা ঈদের নামাজের পূর্বে পরিবারের সদস্যদের নিকট ক্ষমা চেয়ে নেন। আত্মীয়দের কবর জিয়ারত করেন। ঈদের দিন তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার “কেতুপাত” (তালপাতার থলিতে রান্না করা ভাত) ও “রেনডাং” (নারকেলের দুধে রান্না করা মাংস) রান্না করেন।
“হরি রায়া” নামক অনুষ্ঠানে বিশাল এক ভোজের আয়োজন হয়। পরিচিত ও অপরিচিত সকলকেই আমন্ত্রণ জানানো হয় এ উৎসবে।
মিশর: মিশরে ছোট বাচ্চাদের “ঈদিয়া” নামে পরিচিত নগদ অর্থ উপহার প্রদান করা হয়। বাড়ি ও রাস্তাগুলো রংবেরঙের লাইটে আলোকিত থাকে।
গুড়ো চিনি ছিটানো কুকি বানানো বা কেনা – এ দেশের আরেকটি প্রচলিত রীতি। ঈদ উপলক্ষে চিড়িয়াখানা পরিদর্শন মিশরীয়দের পছন্দের প্রথম সারিতে থাকে।
তুরস্ক: তুর্কী মুসলিমরা ঈদ ও তারপরের দিন সমুদ্রের উষ্ণ পানি উপভোগ করতে বীচে যান। লম্বা আলখেল্লা টাইপ পোশাক পরিধান করে আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় তাদের চিরাচরিত এক নিয়ম।
ঈদের দিন তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন “বাকলাভা” ও “লোকাম” তৈরি করা হয়। এ মিষ্টান্নগুলোর প্রসিদ্ধতার কারনে ঈদের দিনকে তারা “ফেস্টিভাল অফ সুইটস” বলেও অভিহিত করে; তুর্কি ভাষায় যা “সেকের বেইরামি” নামে পরিচিত।
সিঙ্গাপুর: ঈদকে ঘিরে সিঙ্গাপুরের অন্যতম প্রাচীন মালয় বসতি গেয়লাং সেরাইকে ৫০-এরও অধিক ধরনের আলোকসজ্জা দ্বারা আলোকোজ্জ্বল করে তোলা হয়। গত কয়েক বছর ধরে সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত সবার প্রধান আকর্ষণ এ শহরের আলোকসভা।
বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহি ও সুস্বাদু খাবারের দোকান বসে এ শহরে। ইন্স্টাগ্রামের সৌজন্যে এ শহরের দৃষ্টিনন্দন বাবল-টি ডেজার্ট কিংবা কাঠিতে গাঁথা জ্বলন্ত মার্শম্যালোর মতো খাবারগুলো ট্রেন্ডিংয়ে দেখা যায়।
আইসল্যান্ড: দিনে ২২ ঘন্টা রোজা রাখা আইসল্যান্ডের মুসলমানদের ঈদ উদযাপন অন্য সকল মুসলিমদের থেকে একটু বেশিই আনন্দের। রাজধানীর হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ থেকে একটিতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মুসল্লীরা ইন্দোনেশীয়, মিশরীয় ও ইরিত্রিয়া সহ বিভিন্ন দেশের মুখরোচক খাবারের বুফের আয়োজন করেন। ছোটরা পছন্দনীয় কাপড় পরিধান করে,বড়দেরকে বন্ধু ও পরিবারের সাথে উপহার বিনিময় করতে দেখা যায়।
নিউজিল্যান্ড: ঈদ উপলক্ষে অকল্যান্ডের ইডেন পার্ক ভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়।দর্শনার্থীদের জন্য নানা প্রকার উৎসবের বন্দোবস্ত করেন আয়োজকরা। হিউম্যান ফুসবল, ম্যাকানিক্যাল ষাড় ও নানা পদের সুস্বাদু খাবারের দোকান দেখা যায় এ আয়োজনে।
আফগানিস্তান: যুদ্ধে পারদর্শী আফগানদের ব্যতিক্রমী এক উদযাপন দেখা যায় ঈদের দিন। “তখমে-ই জাঙ্গী ” নামে পরিচিত এ উৎসবে প্রতিপক্ষের সিদ্ধ ডিমের খোসা ভাঙ্গাই হলো মুল উদ্দেশ্য।
এছাড়াও, দান-সদকা ও খাবার উপভোগের মধ্য দিয়ে বরকতময় এ দিন উদযাপন করেন তারা।
সোমালিয়া: কাম্বাবুর নামক একধরনের মিষ্টান্ন দিয়ে ঈদ উদযাপন করেন সোমালিয়ার মুসলিমরা। সকালের নাস্তা হিসেবে তৈরি হলেও বন্ধু, পরিবার ও আত্নীয়দের এ সুস্বাদু মিষ্টি মোটামুটি সারাদিনই পরিবেশন করা হয়।
মরক্কো: পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলমান যেখানে উপহার আদান-প্রদানের মাধ্যমে ঈদকে বরণ করে নেয়, মরোক্কান মুসলিমদের এ ক্ষেত্রে দেখা যায় ভিন্ন রুপে। ফজর আদায়ের পর পরই শুরু হয় তাদের অনাড়ম্বর ভোজের আয়োজন। সারাদিন খাবারে থাকে ভেড়ার মাংস, কুশকুশ ও শুকনো আলু বোখারা।
পরিবার ও বন্ধুদের সাথে নিয়ে উপভোগ করা হয় এ জমজমাট আয়োজন। বিশ্বজুড়ে খাদ্যভিত্তিক ঈদ উদযাপনে মরক্কোর জুড়ি নেই।
বিশ্বের সকল দেশের মুসলিমরা আনন্দ, ঐতিহ্য ও এক উৎসব মুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে ঈদ উদযাপন করলেও কিছু স্থানে এর ব্যতিক্রমও চোখে পড়ে। লেবানন, সিরিয়া কিংবা গাজা থেকে শুরু করে উইঘুর, ইয়েমেন ও ইউরোপের উপনিবেশে থাকা আফ্রিকার মুসলিমরা ঈদ উদযাপন করেন এক দুর্বিষহ ও আতঙ্কিত পরিবেশে। বাতাসে বোমার সাইরেন, মৃত্যুশয্যায় থাকা প্রিয়জনের আত্ম চিৎকার কিংবা কলিজার টুকরা সন্তানের বিদেহীর বোঝা অন্তরে নিয়ে দিনশেষে সূর্যটা অস্ত যায় অন্য সকল দিনের মতোই।
প্রতিটি দেশ ও সংস্কৃতির ঈদ উদযাপনের রীতিনীতি ভিন্ন হলেও মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান অভিন্নই। ব্যস্ততা ও কর্মক্ষেত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ এ মানবদেহ ঈদের সৌজন্যতায় একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কোলাহলে থাকা জনসমাজ কিছু সময়ের জন্য নিস্তব্ধতার ছোট কুটিরে আশ্রয় নেয়। ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার এক মোলায়েম দৃশ্য স্ফুটিত হয় আমাদের জীবনে।তাই, ঈদ ফিরে আসুক বারবার; তার চিরাচরিত রহমতের আভাস নিয়ে।
লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
