সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাঙালির দ্বিচারিতা: ফিলিস্তিন বনাম আরাকান প্রসঙ্গে

Author

Muhammad Jayed Abdullah, Dhaka university , Dhaka university

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ১১১ বার

বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তরে মুসলিম জাতি আজ নিষ্পেষিত ও নিপীড়িত। ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা আজ হামলা, মামলা, নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার। নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে নিষ্পাপ সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটাও রক্ষা পাচ্ছে না এ অত্যাচারের লেলিহান শিখা থেকে।
বিশ্বনেতাদের তথাকথিত নিন্দাপ্রকাশ, জাতিসংঘের মেরুদণ্ডহীন পদক্ষেপ কিংবা আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান বিচারকার্য — কোনোটাই যেন ফলপ্রসূ হচ্ছে না এ জাতির উপরে চলা নির্যাতনের বিপরীতে। বাংলাদেশ‌ও এ যাত্রায় পিছিয়ে নেই। ঘটা করে শোকযাত্রা, নিয়মিত সাহায্য প্রেরণ, অপরাধীদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ও সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাশট্যাগের বিচ্ছুরণ — সকল ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ও এর জনগণ দৃশ্যমান।
তবে, স্থানভেদে নির্যাতিতদের প্রতি দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করতে দেখা যায় আমাদের। গাজাবাসীদের প্রতি সহমর্মিতা ও আরাকানের সমস্যা মোকাবেলায় বাঙালির পদক্ষেপ বাটখারায় মাপলে দেখা যাচ্ছে বিস্তর তফাৎ। এর অবশ্য বেশ কিছু যুক্তিসিদ্ধ কারণ প্রতীয়মান।
মুসলিমদের প্রথম কেবলা “আল-আকসা” অবস্থিত ফিলিস্তিনে। ইবরাহিম (আঃ) থেকে শুরু করে ইউসুফ, দাউদ ও সুলাইমান (আঃ) সহ বেশ কিছু নবী-রাসুলের পদচিহ্নে সুভাষিত এ ভূমি। এ ছাড়া কোরআনেও এ ভূমি সম্পর্কে রয়েছে আলোচনা। ফলশ্রুতিতে, ধর্মীয় এ তীর্থস্থানের প্রতি বাঙালি মুসলিমদের আবেগ-অনুভূতিটা একটু বেশিই কাজ করে; যে কারণে ফিলিস্তিনে ভূপাতিত প্রতিটি বোমা ও ড্রোন হামলা আমাদের মন ক্ষত-বিক্ষত করে, তাদের বিয়োগবেদনা আমাদের ভীষণ পীড়া দেয়।
অন্যদিকে আরাকান ভূমির সাথে বাঙালির শেকড়ের কোনো সম্পর্ক নেই। ভাষা ও সংস্কৃতির ধুলোমাখা কিছু ইতিহাস থাকলেও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনাই বেশি। সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈপরীত্যও বিদ্যমান। এছাড়া, বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠীদের অবৈধ তৎপরতার কারণে প্রতিবেশিমূলক সম্পর্ক তলানিতে থাকায় তাদের প্রতি আবেগ-অনুভূতি একটু কম কাজ করে।
বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ফিলিস্তিন-ট্র্যাজেডির খবর সর্বদা বহমান। নিউজ, টকশো, খবরের পাতা ও অ্যাক্টিভিস্টদের ভিন্নধর্মী প্রতিবাদে গাজার খবর শীতল হওয়ার সুযোগ পায় না। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের সাহসী উদ্যোগের মাধ্যমে গাজার ধ্বংসাবশেষ আজ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত, আরাকানের বেলায় যা অনুপস্থিত। যার দরুন, অন্যান্যদের মতো বাঙালিরাও গাজার বিষয়ে একটু বেশিই তৎপর। আরাকান নিয়ে বিশ্বের হর্তাকর্তাদের ফলশূন্য উদ্যোগের বিপরীতে কার্যকরী পদক্ষেপ শূন্যের কোঠায়। জনসাধারণের ভ্রুক্ষেপও তদ্রূপ।
গাজাবাসীদের সমস্যা মোকাবেলায় ও তাদের চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় করা প্রতিটি পদক্ষেপ বিশ্ব দরবারে যেভাবে স্বীকৃত ও প্রশংসিত; আরাকানের ক্ষেত্রে তা ঘটে না। আরাকান আজ অবহেলিত — হোক তা আলোচনায় কিংবা সমালোচনায়। ট্রেন্ডে গা ভাসানো ও লোকদেখানো সহমর্মিতার উর্বর এ সময়ে তাই আরাকান আজ ভূলুণ্ঠিত।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার প্রাদুর্ভাবকালে বাংলাদেশের জনসাধারণ ও সরকারের স্বাচ্ছন্দ্যমূলক বরণ বিশ্ব দরবারে বেশ প্রশংসা কুড়ায়। অর্থ-সম্পদ ও আশ্রয়স্থলের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবির। তবে দিন না গড়াতেই তাদের নিত্যনৈমিত্তিক অপরাধমূলক কাজে স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসন বিরক্ত হয়। সারা দেশে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সহানুভূতির স্থানে জন্ম নেয় ঘৃণা।
বৈশ্বিক, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের প্রভাবে রক্ত-মাংসে এক হওয়া সত্ত্বেও আরাকান ও গাজার অধিবাসীরা বাঙালিদের থেকে ভিন্নধর্মী আচরণ গ্রহণ করছে। অপরাধীর যেমন জাত-ধর্ম ও স্থান-কাল থাকে না, নির্যাতিতেরও তেমন থাকে না। অপরাধ, অপরাধই — সেটা যার সাথেই সংঘটিত হোক না কেন। নির্যাতিত সকল ক্ষেত্রেই নির্যাতিত, চাই সে যে স্থানেরই হোক।
বাঙালিদের গাজা ও আরাকানের সমপর্যায়ের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি তাদের প্রতি গুরুত্বেও সমতা আনতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কারো প্রতি যেন অবিচার না হয়, এ বিষয়ে লক্ষ রাখা জরুরি। ভূমধ্যসাগরের পাশে অবস্থিত গাজাবাসীদের মতো আরাকানিরাও আমাদের ভাই-মা-বোন। সকলের স্থায়ী শান্তি ও সমাধান নিশ্চিতে বাঙালিদের একতাবদ্ধ ও সমতাভিত্তিক পদক্ষেপই দূর করতে পারে এ দ্বিচারিতার কলুষিত মুখোশ।
লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!