মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

৩৫শে জুলাইয়ের বিভীষিকা

Author

Muhammad Jayed Abdullah, Dhaka university , Dhaka university

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ১২ বার

 

বিবিসি নিউজ বাংলার ৪ঠা আগস্ট, ২০২৪ এর ভয়াবহতা নিয়ে একটা প্রতিবেদনে দেখায় সেদিন –
সকলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাব্বির আহমেদ যোগ দিয়েছেন আন্দোলনে। কারওয়ান বাজারে হঠাৎ অজানা এক স্থান থেকে স্নাইপার শটে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চোখের বা পাশ থেকে গুলি ঢুকে চোখ ঝাঝঁড়া করে বেরিয়ে যায়। এখন অন্ধ জীবনযাপন করছেন; আড়াই মাস বয়সী একমাত্র সন্তানের চেহারাটা দেখার সক্ষমতা হারিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের রাকিব আহমেদ; পুলিশের গুলিতে হারিয়েছেন একটি পা। কৃত্রিম পা লাগিয়ে করছেন মানবেতর জীবনযাপন।
এমন নৃশংস ঘটনা শুধু একটা নয়। ৪ আগষ্ট সারাদিন দেশজুড়ে চলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বাহিনীদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলা। মরণকামড় দিয়ে জেঁকে বসেছিলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাধারণ জনগন – এমনকি অবুঝ পথশিশুদের উপর; বাদ যায়নি বারান্দায় থাকা মায়ের কোলের উৎসুক ৪ বছরের শিশু আব্দুল আহাদও। সেদিন হাসিনার পোষ্য পুলিশ বাহিনী ছাড়াও আন্দোলন দমনে মাঠে ছিলো বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র্যাব। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামীলীগের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও আন্দোলন দমনে মাঠে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
৪ আগস্ট, ২০২৪। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কর্তৃক ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে রাজপথে ছিল জনতার ঢল। ঢাকা ও জেলা শহরগুলোসহ সারা দেশ তখন উত্তাল। পুলিশের মুহুর্মুহু গুলি, টিয়ারশেল ও কাঁদানে গ্যাসের উত্তপ্ততায় রাজপথ তখন রণক্ষেত্র।
আজ ২০২৬-এ বসে ২৪-এর ঘটনাগুলো স্মরণ করলে মনকে বিশ্বাস করানো দায় যে, সোনার বাংলাদেশে বাঙ্গলার দামাল ছেলেদের নিহত হতে হয়েছে তাদেরই স্বজাতিদের হাতে। বইয়ের পাতার ইতিহাসের নৃশংসতা যতটা পীড়া দেয়, চোখে দেখা ইতিহাসের ক্ষতটা তার চেয়েও কঠিন। স্বজাতির দেয়া আঘাত শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি মানসিকভাবে প্রচন্ড নাড়া দেয়। ২৪-এর জুলাই-আগস্টে তাই ঘটেছিল। প্রতিবেশি ভাই, ক্লাসরুমের সহপাঠী, হলের রুমমেট এমনকি সন্তান ও পিতা মুখোমুখি হয়েছিলো রাজপথে। শুধুমাত্র একজন মানুষের দাম্ভিকতা ও স্বৈরাচারী লালসার কারনে সুন্দর এক বাংলাদেশ শকুন খুবলে ছিঁড়ে খেয়েছিল।
দীর্ঘ ক্র্যাকডাউন, হত্যা, গণগ্রেফতার ও ইন্টারনের ব্ল্যাকআউটের পর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ৩রা আগষ্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। পরেরদিন এর প্রভাবে সকাল ১১টা পর্যন্ত রাস্তাঘাটে যানবাহন খুব অল্পসংখ্যক দেখা দিলেও, বেলা বাড়ার সাথে সাথে জনসমাগম বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের পালাবদলের পটভূমিতে অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭১ এর ১লা মার্চ পাকিস্তানি সামরিক সরকার কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে ২রা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন পালিত হয়; যা বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ধাবিত করে। এছাড়া, ১৯২০-১৯২২ সালে পর্যন্ত মাহাত্মা গান্ধী কর্তৃক তৎকালীন ভারত উপমহাদেশেও অসহযোগ আন্দোলন পালিত হয়েছিল।
যে কোনো আন্দোলন সফল হওয়ার পেছনে অসহযোগ আন্দোলনের বেশ প্রভাব রয়েছে। ধর্ম-বর্ণ, জাত-প্রথা, বয়সভেদে সকলকে অংশীদারত্বের আহ্বান জানানো হয়। আন্দোলন সমন্বয়কদের নেতৃত্বগুণের প্রশংসা করতেই হয়। যখন প্রত্যক্ষভাবে স্টেইট বনাম শিক্ষার্থীদের লড়াই চলছে, সাধারন নাগরিকদের সমর্থন জানান দিতে ও আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তারা অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। এতে শেখ হাসিনা বিচলিত হয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের বালাই না করে তার শেষ সম্বলটুকু ব্যবহার করে। অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ করতে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের সকল নেতাকর্মীদের রাস্তায় অবস্থান নিতে আদেশ করে। ফলাফল স্বরূপ, ৪ঠা আগস্ট বাংলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে শহীদের লাশের আহাজারিতে। সেদিন তরতাজা ৯৭টি প্রাণ বিদায় নিয়েছিল আমাদের থেকে।
যদিও ৪ঠা আগস্টের পূর্বেই সাধারণ নাগরিকদের সমর্থন অর্জন করেছিলো এ আন্দোলন। তবে, ৪ঠা আগস্ট ছিলো অগ্নিপরীক্ষার দিন। হাসিনার পতনের এক দফা দাবির স্লোগানে রাজপথ যখন উত্তাল, অন্যদিকে সমন্বয়কদের ফাসির কাষ্ঠের লিস্ট ততক্ষণে লেখা হয়ে গিয়েছিল। কোনোমতে যদি আন্দোলন অসফলতার মুখ দেখে থুবড়ে পড়তো, খুনি হাসিনার মৃত্যু থাবা থেকে বেঁচে ফেরার সাধ্য কারো ছিল না। আন্দোলন সফল করতে ও সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ জানান দিতে অসহযোগ আন্দোলনের বিকল্প ছিল না।
৪ঠা আগস্টের গণজোয়ার ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার সহযোগীদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। এ গণজোয়ারের স্লোগান ছিলো, ‘দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনা পদত্যাগ।’ হাসিনা রেজিম আন্দোলনের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে দুপুর ১২টায় ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়। উচ্চপদস্থ অনেক নেতাকর্মীরা সেদিন দেশ ছাড়েন। ১৭-২৮ জুলাই ইন্টারনের ব্ল্যাকআউটের সময় হাসিনার নৃশংসতা পুনরায় ফিরে আসার আভাস পাচ্ছিল দেশবাসী। কিন্তু, বাংলাদেশি জাতির রক্ত যেন এক স্বচ্ছ স্ফুলিঙ্গ, স্বাধীনতার অগ্নি একবার প্রজ্বলিত হলে তা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তারা দমে যায় না – এ চিরসত্য বাণী হয়তো হাসিনা ভুলে গিয়েছিল।
আন্দোলনকে পূর্ণভাবে দমন ও অংশগ্রহণকারীদের নিঃশেষ করতে হাসিনা শেষ একটা চাল খেলেন। বিকেলে ঘোষণা আসে, আগামী ৩দিন সরকারি ছুটি। অফিস-আদালত সব বন্ধ; যানবাহন চলবে অল্পমাত্রায়। হাসিনার অভিপ্রায় বুঝতে পেরে ৬ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ একদিন এগিয়ে ৫ তারিখ আনা হয়। অসহযোগ আন্দোলনের গণসমর্থনের প্রদীপকে কাজে লাগানোর এটা ছিলো মোক্ষম সুযোগ।
সে সময়ের প্রতিটা দিন, ঘন্টা, মিনিট ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা অদক্ষ প্ল্যান, রক্তক্ষয়ী এ দীর্ঘ আন্দোলন ভেস্তে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। জালিম ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে স্বয়ং খোদায়ী এক রহমত ছিল এ ঘোষণা।
৫ আগস্ট; রণক্ষেত্র বাংলাদেশের পূবাকাশে স্মিত ও চাঞ্চল্যহীন এক সূর্যোদয় হলো, যা অস্তমিত হয়েছিল নতুন এক বাংলাদেশের আগমনী বার্তা নিয়ে। বাংলাদেশি জাতির সেই চিরচেনা রূপ আরো একবার পদধ্বনিত হলো বাংলার রাজপথে ও মাঠে-ঘাঠে। মসজিদ, মন্দির ও উপাসনালয়ে মফস্বলের কৃষক থেকে কোটিপতি, অজপাড়াগাঁয়ের গৃহিণী থেকে কর্পোরেট নারী – সকলেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেজদায় লুটিয়েছিলেন; আবার কেউ বা চোখের কোনের ফোঁটা জল নিয়ে প্রার্থনায় ও কৃতজ্ঞতায় মগ্ন হলেন। বাংলাদেশ মুক্ত হলো; মানচিত্র খুবলে খাওয়া শকুন থেকে রেহাই পেল দেশবাসী।
কিন্তু! একটা ‘কিন্তু’ রয়েই যায়। সেই চোখ হারানো সাব্বির কিংবা এক পা হারানো রাকিব – যার ইচ্ছে ছিল বিদেশে পাড়ি জমাবেন; পরিবারটাকে স্বচ্ছলতার মুখ দেখাবেন। অথচ হাসিনার নির্মমতায় আজ তিনি ঘরবন্দী। আন্দোলনের ক্ষত বয়ে বেড়ানো এ সংগ্রামীদের একটাই দাবি – শেখ হাসিনা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দেশ রক্ষা ও মানবতা প্রতিষ্ঠার এ লড়াইয়ে জীবনের তোয়াক্কা না করে শহীদ ও আহতদের এ দাবি কি দেশ ও জনগণ পূরণ করবে? সংগ্রামীদের এ অবমূল্যায়ন কি আগত প্রজন্মের দেশের প্রতি জীবন দেয়ার ইচ্ছাকে অনাগ্রহী করবে না?
লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!