মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

রাধা- শাস্ত্র- Sufism

Author

মোহাম্মদ নাফিজুর রহমান , Dhaka College

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ১৪ বার

২২.০৯.২০২৬

রাধা-শাস্ত্র-Sufism

অক্ষরবাদীরা প্রায় সময়ই রূপক চরিত্রগুলোকে নিয়ে নানান বিতর্কের সৃষ্টি করে। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশ কয়েকটি সনাতন ধর্মকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্মে রাধার ঐতিহাসিক অস্তিত্বের বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা ও নানাবিধ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। প্রশ্ন করা ভালো , জানার ইচ্ছে প্রশংসনীয়। তবে সমস্যা হলো যারা শুধু অক্ষর বুঝে, তারা ইশকে হাকিকী বুঝেনা। ধর্ম এদের কাছে বরাবরের মতই কেবল আমিত্বের অহংকারের একটা অংশ। ( এমন সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণের মানুষদের , যারা একটা চরিত্রকে শুধু শাস্ত্র দিয়ে বিচার করে)

রাধা কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী শুধু সনাতনী ধর্মতত্ত্বে সীমাবদ্ধ না। সুফি দর্শনের পাশাপাশি বাংলা লোকসাহিত্যেও গভীর আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো সহজে বুঝানোর জন্য রূপক হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায় রাঁধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনীকে।

সুফি দর্শনের মূল ভিত্তি স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যকার প্রেম। একে সুফী দর্শনে বলা হয় “ইশকে হাকিকি” বা বাংলায় বললে ঐশ্বরিক প্রেম। বাংলা অঞ্চলে যখন সুফি মতবাদের প্রসার ঘটে , তখন সুফি সাধকরা এবং কবিরা সাধারণ মানুষকে ঐশ্বরিক প্রেমের ধারণা দিতে গিয়ে স্থানীয় রাঁধা-কৃষ্ণের রূপকটি গ্রহন করেন। সুফি দর্শনে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের ক্ষেত্রে রাধা হলো “আশিক” বা ভক্ত (সে জীবাত্মা,রুহ), যে তার স্রষ্টার প্রেমে মশগুল। অন্যদিকে কৃষ্ণ হলেন “মাশুক” বা পরম আরাধ্য স্রষ্টা ( পরমাত্মা/ওয়াহেদ) ; [বোঝা জরুরি, কৃষ্ণকে এখানে সরাসরি স্রষ্টা বলা হয়নি, রূপক অর্থে রাঁধা যদি আশিক হন তাহলে কৃষ্ণ হলেন স্রষ্টা].

তো রাধার কৃষ্ণের জন্য যে ব্যাকুলতা , তা মূলত স্রষ্টার সাথে মিলনের জন্য রুহের চিরন্তন আকুতিরই প্রতীক।

রাঁধা যেমন লোকলজ্জা , সমাজ সংসার ভুলে কৃষ্ণের বাঁশির সুরে ছুটে যেতেন, সুফি সাধকেরাও ঠিক সেভাবে পার্থিব মোহ ত্যাগ করে স্রষ্টার প্রেমে আত্মনিমগ্ন হন। রাঁধার আত্মবিসর্জন কী প্রকাশ করে জানেন? ” Fana” অর্থাৎ নিজের অহংকার বিলীন করে দিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা।

এই তাৎপর্যের কারণেই লালন শাহ, হাসন রাজা থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলামের বহু গান ও কবিতার রাঁধা-কৃষ্ণকে সুফী প্রেমের রুপক হিসেবে ব্যাবহার করা হয়েছে। সৈয়দ সুলতান নামে একজন কবি ছিলেন মধ্যযুগে, ওনার মত মুসলিম কবিরাও তাদের সাহিত্যে এই চরিত্র দুটিকে আধ্যাত্মিক রূপক হিসেবে খুবই সাবলিল ভাবে উপস্থাপন করেছেন।

অন্যদিকে, রাধা কি ঐতিহাসিক কোনো বাস্তব চরিত্র নাকি নিছকই একটা রূপক চরিত্র এই নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। এটার কারণও খুব স্পষ্ট।

চার বেদের কোথাও ( ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ) কৃষ্ণের প্রেমিকা হিসেবে রাধা চরিত্রের সরাসরি উল্লেখ নেই।তবে ঋগ্বেদে ‘রাধাস’ নামে একটি শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়, যার অর্থ ধন-সম্পদ, সমৃদ্ধি বা সমার্থক কিছুকে বোঝায়। অনেক গবেষক মনে করেন , বেদের এই ‘রাধাস’ শব্দটি পরবর্তীকালে বিবর্তিত হয়ে পুরাণে ব্যক্তি ‘রাধা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কেননা আক্ষরিক অর্থে ‘রাধা’ শব্দের অর্থই হলো—যিনি আরাধনা করেন বা যাঁর আরাধনা করা হয়।

শ্রীমদভগবদ্গীতা ও মহাভারতে কৃষ্ণ একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র, যিনি কূটনীতিবিদ, যোদ্ধা এবং ঈশ্বরের অবতার।

পুরো মহাভারতের কোথাও রাধা বা বৃন্দাবনের কোনো গোপীর সাথে কৃষ্ণের প্রেমের কথা উল্লেখ নেই। গীতায় ভক্তিযোগের কথা বলা হলেও সেই ভক্তির প্রতীক হিসেবে রাধাকে দাঁড় করানো হয়নি।

যেহেতু বেদ, উপনিষদ, মহাভারত বা গীতায় রাধা নেই, তাই রাধাকে ঐতিহাসিকভাবে সত্য কোনো চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়না। তবে এটি একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক রূপক বা কাল্পনিক চরিত্র যা পরে মূলধারায় যুক্ত হয়েছে। রাধা চরিত্রের প্রথম সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায় অনেক পরের রচিত পুরাণগুলোতে, বিশেষ করে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ এবং পদ্ম পুরাণে। পরবর্তীতে ১২শ শতাব্দীতে কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম’ কাব্যের মাধ্যমে রাধা-কৃষ্ণ প্রেম ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়। এরপর শ্রীচৈতন্য দেবের বৈষ্ণব আন্দোলনে রাধা হয়ে ওঠেন কৃষ্ণের আনন্দদায়িনী শক্তির প্রতিমূর্তি।

এবার আসল কথায় আসি, ঐতিহাসিক ও প্রাচীন শাস্ত্রীয় মানদণ্ডে রাধাকে বিচার না করে আধ্যাত্মিক ভক্তির প্রতীক বা রূপক হিসেবেই বেশি গণ্য করা উচিৎ। সুফি সাধক বা বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে রাধার ঐতিহাসিক বাস্তবতার চেয়ে তাঁর আধ্যাত্মিক বাস্তবতা অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে রাধার ঐতিহাসিক অস্তিত্ব থাকা বা না থাকার বিষয়টি এখানে একেবারেই গৌণ। কারণ রাধা হলেন স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ ও অনন্ত প্রেমের চূড়ান্ত প্রতিমূর্তি।

তথ্যসূত্র:

১) বাংলাপিডিয়া (Banglapedia)। নিবন্ধ: বৈষ্ণব সাহিত্য, সুফিবাদ, বাউল এবং সৈয়দ সুলতান।

২) Dasgupta, Shashibhusan. “Obscure Religious Cults”

৩) “Evolution of Radha in Hindu Literature”

Sufi Mysticism in Bengali Folk Songs (JSTOR/Academia)।

 

— নাফিজুর রহমান

লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।