‘ডিজিটাল আসক্তির জালে বন্দি প্রজন্ম’ নিয়ে ইবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৩৩ বার

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ইলেকট্রিক মিডিয়া ও ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পুরো বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির আশীর্বাদে মানুষ আজ ঘরে বসে বসে অনলাইন ব্যবসা, টেলিমেডিসিন সেবা, যেকোনো জায়গা থেকে দেশের শীর্ষ শিক্ষকদের ক্লাসের সুযোগ, মুহূর্তের মধ্যেই সমুদ্রের অতলদেশ থেকে শুরু করে চাঁদ ও অন্যন্য গ্রহ ইত্যাদিসহ সকল ক্ষেত্রে তথ্য সম্পর্কে জানতে পারছে। প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী একদিকে যেমন উন্নতি ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ হচ্ছে ঠিক তেমনি এর উল্টো পিঠ ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে দিন দিন অলস, অকর্মণ্য,পরশ্রীকাতর, সৃজনশীলবিমুখ, মনুষ্যত্বহীন, বিচ্ছিন্ন ও যান্ত্রিক, অস্থির ও ধৈর্যহীন করে দিচ্ছে। ভাইরাসের মতো শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রত্যক বয়সের মানুষই আজ ডিজিটাল ডিভাইস আসক্ত হয়ে পড়ছে। যা ধীরে ধীরে মানুষকে বিবেকহীন পঙ্গুতে পরিণত করছে। পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্য এটি কতটা হুমকিস্বরূপ তার অশনিসংকেতের বার্তা ও ডিজিটাল ডিভাইস আসক্তি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোছাঃ ইসমা খাতুন।
নিশ্চিত হোক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার:
সকালে ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা কোনো না কোনো ভাবে প্রযুক্তির সাথে যুক্ত। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার যেমনি আমাদের জন্য আশীর্বাদ তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের জন্য হুমকিস্বরূপ। যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে গভীর অন্ধকারের দিকে। বর্তমানে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট যেমন সহজলভ্য ও উপকারে আসে তারচেয়ে বেশি সময় নষ্ট করে। ইন্টারনেট আসক্তি বর্তমান সমাজের একটি ভয়াবহ ব্যাধি। আজকাল পড়ার টেবিলের বদলে শিক্ষার্থীদের সময় কাটে বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে। ইন্টারনেট যেন এক রহস্যময় গোলকধাঁধা। অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তির ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিয়মিত ঘুম, মেজাজ খিটখিটে, বাস্তবতার সাথে মিলাতে না পারা সহ নানা রকম ব্যাধি দেখা যাচ্ছে। যা একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করছে। যার ফলে আগামী প্রজন্মের মধ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সৃজনশীলতা। এর থেকে বের হতে না পারলে আগামীর প্রজন্মের মধ্যে এটি মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়বে। তাই পারিবারিক সচেতনতা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা তরুণ প্রজন্মকে এই আসক্তির মায়াজাল থেকে রক্ষা করতে পারি।
মো: আব্দুল্লাহ আল মুনাইম
শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
স্ক্রিনে বন্দি শৈশব:
শিশুদের শৈশব এখন স্ক্রিনের নীল আলোয় বন্দি। শৈশবের সেই রূপকথার তেপান্তরের মাঠের বিশালতার বিপরীতে এখনকার শিশুদের ভবিষ্যৎ সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মোবাইলের পর্দায়। খেলাধুলা, ছুটোছুটি, চাঞ্চল্যে ভরপুর শৈশব আজ আটকে গেছে ভার্চুয়াল জগতের গণ্ডিতে। অভিভাবকদের ব্যস্ততা, অসচেতনতা ও অনলাইননির্ভর শিক্ষা এবং প্রযুক্তির প্রতুলতাই শিশুদের ক্রমশ স্ক্রিনমুখী করে তুলছে। ডিজিটাল আসক্তি ক্রমশ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। শারীরিক সক্রিয়তা কমার পাশাপাশি কমছে শিশুর দৃষ্টিশক্তি এবং মনে রাখার ক্ষমতা। ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অধিক নির্ভরশীলতার ফলে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগও দুর্বল হয়ে পড়ছে, ফলে একাকীত্ব ও অস্থিরতার মতো মানসিক সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব কারণে শিশুর সৃজনশীল চিন্তার জগৎ হয়ে উঠছে আরও সংকীর্ণ। শিশুরা কেবল একটি পরিবার নয়, সর্বোপরি এ দেশের সস্পদ। তারাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। তাদের সুস্থ বিকাশের উপরেই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা রক্ষায় সকলের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রযুক্তির বিরোধিতা না করে, পরিমিত ও প্রয়োজনে ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সচেতন অভিভাবকত্বই পারে শিশুদের স্ক্রিনের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিতে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের লক্ষ্যে এই মুহূর্তে থেকেই আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
আহমেদ রনি
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম:
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার যেমন বেড়েছে সেই সাথে বেড়েছে এর অপব্যবহার এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি শিশু ও কিশোরদের প্রবল আসক্তি। যা ভবিষ্যত প্রজন্মের একটি বড় অংশকে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা থেকে বিমুখ করে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে শিশু বয়স থেকেই তারা টিকটকার কিংবা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বাস্তব ভিত্তিক শিক্ষা অর্জন কিংবা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া তাদের কাছে জটিল ও কষ্টসাধ্য বিষয়ে পরিগণিত হচ্ছে। অতিরিক্ত প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা দিনে দিনে কমিয়ে ফেলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা তৈরি করছে। এজন্য ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে শিশু ও কিশোরদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে এবং প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে। এজন্য অভিভাবকদের সচেতনতা যেমন জরুরি সেই সাথে অল্প বয়সী শিশু কিশোরদের অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা থেকে সরিয়ে অফলাইন ভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রয়োগ করতে হবে এবং হাতে কলমের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রযুক্তি শিক্ষার ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে স্কুলের ভিতরেই কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবস্থা করে তাদেরকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রযুক্তিতে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই সুগঠিত একটি প্রজন্ম ভবিষ্যতে তৈরি হবে।
মোছাঃ আহসানা হাবিবা অরনা।
শিক্ষর্থী, পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
ভার্চুয়াল নয় বাস্তব জ্ঞান চর্চা জরুরি:
আগামী প্রজন্মের ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি। এটি এক দিকে যেমন বর্তমান সময়ের জন্য আশীর্বাদ, অন্যদিকে তেমনি অভিশাপ।
ডিজিটাল প্রযুক্তি মধ্যে বিভিন্ন প্লাটফর্মে মানুষ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফেসবুক, টিকটক, অনলাইন গেইম বর্তমান মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। যা আগামীর প্রজন্মকেও এই সেক্টরগুলোতে এতো বেশি আসক্ত করে ফেলছে যে পাঠ্যবই থেকে তারা এখন অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা জ্ঞান চর্চার পরিবর্তে ডিভাইস আসক্তির ফলে মানসিক ক্ষতিগ্রস্থ এবং চোখসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। টিকটকসহ বিভিন্ন অ্যাপসে তৈরী করছে অসুস্থ জগৎ, আর এই জগতের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে আমাদের আগামীর প্রজন্ম। তারা এই মাধ্যমগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে সময়ে অপচয় যেমন করছে, তেমনই প্রবলভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে ভার্চুয়াল জগতে। আগামীর প্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য এ জগত থেকে বেরিয়ে এনে জীবনমুখী করে গড়ে তোলা দরকার। পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের চর্চা, অভিভাবকদের সচেতনতা ও তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং সর্বস্তরে ডিজিটাল আসক্তির বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
হাফসা পারভীন, শিক্ষার্থী,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
আসক্তি সম্পর্কে সচেতন হোন:
প্রযুক্তির এই যুগে আমরা সকলেই স্মার্টফোন, রিলস, টিকটক, ইনস্টাগ্রামে এতটাই আসক্ত হয়ে যাচ্ছি যে আমরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের মধ্যে দূরত্বের দেওয়াল তৈরি করে ফেলছি। বর্তমান প্রজন্ম খেলাধুলার জন্য অনলাইন গেমসের ভার্চুয়াল জগতেকেই বেছে নিচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এক দশক আগেও এর পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এই ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখলেও এটি প্রকৃতপক্ষে মানুষের সৃজনশীলতার শক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এছাড়াও মানুষ দিনে দিনে তাদের মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলছে। এখন তারা তাদের আবেগ, অনুভূতি, দুঃখ প্রকাশ করে লাইক, কমেন্ট, ইমোজি ও শেয়ারের মাধ্যমে যা বাস্তবে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক অবনতির উপর প্রভাব ফেলে। অনেকে ভিউ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এমন ধরনের ভিডিও বা কনটেন্ট তৈরি করে যা নৈতিক মূল্যবোধ অক্ষয়ের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার্থীরা এখন পড়ার টেবিলে বসলেও তাদের মন থাকে মোবাইলের নোটিফিকেশনে। দুই মিনিট ম্যাসেজ চেক দিতে গিয়ে দীর্ঘসময় কাটিয়ে দিচ্ছে। পরিশেষে এটাই বলব যে, এই আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজেদেরকেই সজাগ হতে হবে। প্রযুক্তির খারাপ দিকগুলো গ্রহণ না করে , প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
সাদিয়াতুননাহার বন্যা,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্হাপনা,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত।
