শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

খাবার আর পানির দখলে বদলে যাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি।

Author

মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৪ বার

  • খাবার আর পানির দখলে বদলে যাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি।
মোছাঃ সোমনা আক্তার
একসময় বিশ্বরাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল ভূখণ্ড দখল, সামরিক ক্ষমতা এবং জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। শিল্পবিপ্লবের পর কয়লা, পরে তেল ও গ্যাসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির নতুন সমীকরণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান সংকট বিশ্বকে নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হবে খাদ্য ও নিরাপদ পানি। যে রাষ্ট্র তার জনগণের খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় তার অবস্থানও হবে তুলনামূলক শক্তিশালী।
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৯.৭ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের চাহিদাও দ্রুত বাড়বে। কিন্তু একই সময়ে কৃষিজমি কমছে, উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, সংরক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থা এবং সবার নাগালের মধ্যে খাদ্য পৌঁছে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পৃথিবীতে খাদ্যের অভাবের পাশাপাশি খাদ্য বণ্টনের বৈষম্যও একটি বড় সমস্যা। একদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না।
খাদ্যের পাশাপাশি নিরাপদ পানির সংকটও দ্রুত তীব্র হচ্ছে। পৃথিবীর অধিকাংশ পানি লবণাক্ত। মানুষের ব্যবহারের উপযোগী স্বাদু পানির পরিমাণ খুবই সীমিত। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এই সীমিত সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন নিয়েও বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় খাদ্য ও পানি ক্রমেই ভূরাজনৈতিক শক্তির অংশ হয়ে উঠছে। যেসব দেশ কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, খাদ্য মজুত রাখতে সক্ষম এবং নিরাপদ পানির উৎস নিয়ন্ত্রণ করে, তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটগুলো দেখিয়েছে, খাদ্যশস্য, সার বা ভোজ্যতেল রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করলে তার প্রভাব মুহূর্তেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে পড়ে -খাদ্য সরবরাহ নিজেই এখন কূটনীতির একটি হাতিয়ার।
বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষিনির্ভর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উত্তরাঞ্চলে খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং নদীভাঙন কৃষি উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি হ্রাস এবং নিরাপদ পানির সংকট ভবিষ্যতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাই খাদ্য ও পানির নিরাপত্তাকে শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।  জলবায়ু-সহনশীল ও উচ্চফলনশীল ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ। পানি ব্যবস্থাপনাতেও একই মনোযোগ দরকার – ড্রিপ ইরিগেশনের মতো সাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার এবং ভূগর্ভস্থ পানির পরিকল্পিত ব্যবহার। খাদ্য অপচয় কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদনের পর সংরক্ষণ ও পরিবহনের দুর্বল ব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয় – কোনো কোনো হিসাবে বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশই মাঠ থেকে থালা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক গুদাম, কোল্ড চেইন এবং কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এই ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কৃষিজমি রক্ষা, শিল্পবর্জ্য দিয়ে নদী দূষণ বন্ধ এবং বন উজাড় রোধেও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। আন্তসীমান্ত নদীর ন্যায্য পানি বণ্টন, জলবায়ু অর্থায়ন, কৃষি প্রযুক্তি বিনিময় এবং বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। খাদ্য ও পানিকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার নয়, মানবিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।
এই সংকট শুধু রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকের একার দায়িত্ব নয়। প্রতিদিনের অভ্যাসে খাদ্য অপচয় কমানো, পানির অপব্যবহার রোধ করা এবং স্থানীয় ও মৌসুমি খাবারকে প্রাধান্য দেওয়ার মতো ছোট ছোট সিদ্ধান্তও দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তরুণ প্রজন্ম যদি এই সচেতনতা রপ্ত করে বড় হয়, তবে আগামী দিনের নীতিনির্ধারণেও এর প্রতিফলন পড়বে। বিশ্ব এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অস্ত্রভাণ্ডার বা অর্থনীতির আকার দিয়ে বিচার করা হবে না। একটি দেশের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করবে তার খাদ্য উৎপাদনের স্থিতিশীলতা, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর। খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর কেবল কৃষি বা পরিবেশের বিষয় নয়,এটি ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানবিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় ইস্যু।
লেখক :-
মোছাঃ সোমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!