শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পড়ার টেবিল থেকে গবেষণাগার: উদ্ভাবনের পথে অদৃশ্য বাধা।

Author

মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৬ বার

পড়ার টেবিল থেকে গবেষণাগার: উদ্ভাবনের পথে অদৃশ্য বাধা
মোছা :সোমনা আক্তার
একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনীতি বা অবকাঠামো দিক দিয়ে  নির্ধারিত হয় নাহ। নির্ধারিত হয় গবেষণাগারের আলোয়, উদ্ভাবনের সাহসে, তরুণদের কৌতূহলে। প্রতিটি বড় আবিষ্কারের শুরু একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকে, আর সেই প্রশ্নের জন্মস্থান একটা সাধারণ পড়ার টেবিল। কিন্তু বাংলাদেশে বেশিরভাগ মেধাবী শিক্ষার্থীর যাত্রা ওই টেবিলেই থেমে যায়। গবেষণাগারে পৌঁছানোর আগেই স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায় অর্থের অভাবে, দুর্বল অবকাঠামোয়, মুখস্থনির্ভর পড়াশোনায় আর নীতিগত জটিলতায়।
বিশ্বে যে দেশগুলো আজ প্রযুক্তি আর অর্থনীতিতে এগিয়ে, তাদের সাফল্যের পেছনে একটাই বড় কারণ-গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য বলছে, বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশ এখনো জিডিপির খুব সামান্য অংশই খরচ করে গবেষণায়-বাংলাদেশে এই হার ০.৩ শতাংশেরও কম। অথচ দক্ষিণ কোরিয়া,  জার্মানি, জাপান- এরা বছরের পর বছর ধরে জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ ঢেলেছে এই খাতে। সেই বিনিয়োগই আজকের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি। মেধার অভাব বাংলাদেশে নেই, এটা বলাই যায়। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, রোবোটিক্স, জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড-সব জায়গায় আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো করছে। প্রশ্ন একটাই এই মেধা কেন যথেষ্ট গবেষণা বা পেটেন্টে রূপ নিচ্ছে না?
একটা বড় কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিজেই। পরীক্ষার নম্বরই এখনো সাফল্যের একমাত্র মাফকাঠি। শিক্ষার্থীরা উত্তর মুখস্থ করতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে না। অথচ গবেষণার প্রথম শর্তই প্রশ্ন করার সাহস। পাঠ্যবইয়ের বাইরে জানা, গবেষণাপত্র পড়া, ল্যাবে হাতে-কলমে কাজ করা এসব এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে বিলাসিতার মতো। অবকাঠামোর অবস্থাও খুব একটা আলাদা না। দক্ষ শিক্ষক থাকলেও আধুনিক গবেষণাগার, ভালো যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপকরণ বা আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার-এসবের ঘাটতি প্রকট। ফলে অনেক গবেষণা শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। একজন শিক্ষার্থীর কৌতূহল ধীরে ধীরে হতাশায় বদলে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় টাকার সমস্যা, যা সব কিছুকে আরও কঠিন করে তোলে। গবেষণা ব্যয়বহুল-সময়, প্রযুক্তি, দক্ষ তত্ত্বাবধান, ধারাবাহিক অর্থায়ন সব লাগে। বাংলাদেশে এই খাতে বিনিয়োগ এখনো যথেষ্ট নয়। তাই অনেক তরুণ গবেষক দেশ ছেড়ে যান উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য। এই ব্রেইন ড্রেইন শুধু ব্যক্তির ক্ষতি নয়, জাতীয় সক্ষমতারও ক্ষতি। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প আর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ও নেই বললেই চলে। উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সরাসরি শিল্পে কাজে লাগে, নতুন প্রযুক্তি হয়, স্টার্টআপ হয়, চাকরি হয়। আমাদের দেশে থিসিস জমা দেওয়ার পর সেটা বেশিরভাগ সময় আলমারিতেই বন্দী থাকে । গবেষণা আর বাস্তব জীবনের এই দূরত্বই উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দেয়।
তবু সুযোগ এখনো ফুরিয়ে যায়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান-এসব খাতে বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা আছে। এটা কাজে লাগাতে হলে স্কুল-কলেজ থেকেই অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা শুরু করতে হবে। শুধু পাঠ্যবই না, ছোট গবেষণা প্রকল্প, বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান ক্লাব ইত্যাদি বিষয়ে  শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতে হবে সত্যিকার অর্থে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক গবেষণাগার লাগবে, গবেষণা অনুদান লাগবে, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য সহায়তা লাগবে। তরুণ গবেষকদের জন্য ফেলোশিপ, ভ্রমণ অনুদান, গবেষণা বৃত্তি-এগুলো বিলাসিতা না প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজন । শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শক্ত অংশীদারত্বও দরকার। কৃষি, ওষুধ, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি-প্রতিটা খাতে বাস্তব সমস্যা সমাধানের যৌথ গবেষণা দেশের কাজে লাগতে পারে। কিন্তু আসল বদলটা দরকার মানসিকতায়। গবেষণাকে বিলাসিতা না ভেবে দেখতে হবে উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে। আজ যে শিক্ষার্থী একটা সাধারণ পড়ার টেবিলে বসে নতুন কিছু জানার স্বপ্ন দেখছে, কাল সেই হয়তো এমন কিছু আবিষ্কার করবে যা বদলে দেবে মানুষের জীবন। এই পথ খোলা রাখা শুধু নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব না-এটা আমাদের সবার অঙ্গীকার।
লেখক :-
মোছা: সোমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।

ই-মেইল :- sumonaakter472192@gmail.com

https://epaper.protidinersangbad.com/?date=2026-07-30
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!