শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও ক্রমবর্ধমান অপরাধ

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৬ বার

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার ছেলে বন্ধুদের সাথে ছবি তোলার জন্য মায়ের আইফোনটি নিয়ে বের হয়েছিল শুক্রবার বিকেলে। কিন্তু পরদিন তার লাশ পাওয়া গেলে জঙ্গলে, আইফোন ছিনিয়ে নিতে হত্যা করা হলো শিশুটিকে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনের বেলা শিক্ষার্থীর লাশ ভেসে উঠল বিশ্ববিদ্যালয় পুকুরে। আগের দিন বিকেলে যে ছেলেটি সহপাঠীদের সঙ্গে ফুটবল খেলল, পরদিন তার নিথর দেহ মিলল পানিতে। ময়নাতদন্তের পর এটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড বলে জানা গেল, মামলাও হলো; কিন্তু দীর্ঘ প্রায় এক বছরেও তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সিআইডি সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা নাকি এখনো ভিকটিমের ফোনের লক পর্যন্ত খুলতে পারেনি!

এই ঘটনার কিছুদিন পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ কক্ষে দিনদুপুরে গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই করা হলো শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনাকে। নিজ বিভাগেরই এক কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে তাঁর করুণ মৃত্যু ঘটে। ঘটনার পর উক্ত কর্মচারী নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ভিকটিমসহ দুজনকে রক্তাপ্লুত অবস্থায় দরজা ভেঙে উদ্ধার করেন প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য ও শিক্ষার্থীরা। অথচ এই চাঞ্চল্যকর মামলার চার্জশীট প্রদানসহ বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।

শুধু এগুলোই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্বৃত্তদের ছুরির আঘাতে শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতার মৃত্যু, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য এক শিক্ষার্থীকে ঝাড়ফুঁকের নামে ধর্ষণের চেষ্টা ও তাতে বাধা দেওয়ায় মা-মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যা, কিংবা রাজপথে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার ঘটনা—প্রতিটিই দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। এর সঙ্গে মিরপুরের আট বছরের শিশু রামিসা হত্যাসহ দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া অগণিত হত্যা ও ধর্ষণের সঠিক বিচার আজ বিচারহীনতার অশুভ চাদরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিখোঁজের ঘটনা বড় একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি শিশু নিখোঁজ মানে একটি পরিবারের মৃত্যু। শিশুর পরিবার তার আদরের সন্তানের জন্য পৃথিবীতে বেঁচে থেকেও সন্তানের শোকে যেন মৃত্যু মানুষের ন্যায় জীবন যাপন করে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে শিশু নিখোঁজের বিষয়ে থানায় জিডি হয়েছে ১৫,৭১৭ জন, এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ উদ্ধার হলেও ২,০৩৮ জন শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে অপরাধের বিচারহীনতার জন্য এরকম ঘটনা ঘটার প্রবণতা বাড়ছে।

প্রশ্ন ওঠে, যদি অতীতে ঘটে যাওয়া অপরাধগুলোর সঠিক ও দ্রুত বিচার হতো, তবে কি কোনো কর্মচারী তার শিক্ষকের ওপর ছুরি চালানোর সাহস পেত? একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া মূলত পরবর্তী আরও দশটি হত্যাকাণ্ডের পথ প্রশস্ত করে দেয়। অপরাধী যখন দেখে যে অপরাধ করেও সে পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন সমাজে অপরাধ করার প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক থাকত এবং প্রতিটি অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যেত, তবে সম্ভাব্য অপরাধীরা অপরাধ করতে ভয় পেত।

যেখানে দেশের রাজনীতিবীদ, স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাই ন্যূনতম নিরাপত্তা পাচ্ছেন না, সেখানে দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে—তা সহজেই অনুমেয়। দেশের বিচার ব্যবস্থা সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত ও রায় দিতে না পারায় অপরাধের চক্র বেড়েই চলেছে।

অন্যদিকে, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় নিরপরাধ মানুষকে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সম্প্রতি একটি হত্যা মামলায় এক গর্ভবতী নারী প্রায় ছয় বছর ধরে জেলহাজতে বন্দি ছিলেন। দীর্ঘ দিন পর মামলায় নিরপরাধ প্রমাণিত হয়ে তিনি মুক্তি পান ঠিকই, কিন্তু তাঁর শিশুসন্তান জন্ম নিয়েছে ও বেড়ে উঠেছে সেই কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার দরুন এক নিষ্পাপ শিশুর শৈশব কাটল জেলে, বঞ্চিত হলো তার মৌলিক অধিকার থেকে। রাষ্ট্র কি পারবে শিশুটির এই হারানো শৈশব ফিরিয়ে দিতে?

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংস্কারের লক্ষ্যে পৃথক কমিশন গঠন করেছিল। বিচার বিভাগ সংস্কারে বিচারপতি শাহ আবু নাইম মমিনুর রহমান এবং পুলিশ সংস্কারে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র সচিব সফর রাজ হোসেনের নেতৃত্বে এই কমিশনগুলো কাজ শুরু করে। মূল লক্ষ্য ছিল সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছ আইন, পৃথক বিচারিক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা। তবে কমিশনগুলোর সুপারিশ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও স্থায়ী আইনি রূপ পাওয়ার জন্য যে সংবিধান সংশোধন, জাতীয় ঐকমত্য ও সুনির্দিষ্ট আইনের প্রয়োজন ছিল—তা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতায় অনেকটাই থমকে যায়। ফলে নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলেও এসব মূল সংস্কারের অনেকগুলোই দীর্ঘমেয়াদে পুরোপুরি কার্যকর করোনি। অনেকে ভেবেছিলেন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারহীনতার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি বদলায়নি। বরং রাজনৈতিক নির্বাচিত সরকার গণমানুষের গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকতে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেনি। যেটুকু করেছে লোক দেখানো এবং নিজেদের স্বার্থে।

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের পেশাদারিত্বে কঠোর হতে হবে। ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। মামলার তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সর্বোচ্চ ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। চাঞ্চল্যকর হত্যা ও ধর্ষণ মামলার বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য ‘বিশেষ প্রসিকিউশন’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আদালতে বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় মূলতবি বা তারিখ বাড়ানো বন্ধ করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

শুধু সংসদে বড় বড় কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক না কেন—দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই অপরাধ দমনের একমাত্র পথ। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে রাষ্ট্রকে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে আসতে হবে।

লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।