নতুন শিক্ষাক্রম ও বাস্তবতা
বাংলাদেশ সরকার বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে আবারো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করতে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অসংখ্যবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রত্যেকবার নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। তবে প্রতিবারের চেয়ে এবারের পরিবর্তনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সম্পুর্ন কাঠামো বদলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শিক্ষক প্রশিক্ষণের নানা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ছাড়িয়ে যাওয়া ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে একটি মহল নিজেদের স্বার্থে এসব ভিডিও গুজব হিসাবে ছড়াচ্ছে । নতুন শিক্ষাক্রমকে বিশ্বের উন্নত দেশের শিক্ষাক্রমের ন্যায় সাজানো হয়েছে। সরকার আগামী বছর থেকে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের কয়েকটি শ্রেণীতে নতুন শিক্ষাক্রম বা কারিকুলাম চালু করতে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রমে দশম শ্রেনীর আগে সব পাবলিক পরীক্ষা তুলে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তন আনা হয়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাতেও। এছাড়াও এসএসসি বা সমমানের আগে কোন বিভাগ পছন্দের সুযোগ থাকছেনা। বরং একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে পছন্দ মতো বিভাগে পড়তে পারবে শিক্ষার্থীরা। চলতি বছর প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে নতুন পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামী বছর বাস্তবায়ন করা হবে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে। এরপর ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে পড়ানোর পাশাপাশি মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে দক্ষতা, সৃজনশীল জ্ঞান ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে শেখাতেই নতুন এই শিক্ষাক্রম চালু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।
তবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকেই এর সমালোচনা করছেন। নতুন শিক্ষাক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমরা উন্নত দেশগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই তারা তাদের শিক্ষাক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষাকেই গুরত্ব দিয়ে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে সুইজারল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাবো যে একটি শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষায় তার জীবনের প্রয়োজনীয় কাজগুলো শিখে থাকে। তার স্কুলে খাওয়া-দাওয়া ঘুমানোর জায়গা থাকে। নিজের প্লেট পরিষ্কার করে খাবার উঠিয়ে নিয়ে খেতে হয়, বই জিনিসপত্র রাখার জন্য নিদিষ্ট লকার থাকে। তার সাইকেল চালানো, সাঁতার শেখার জন্য উপকরণ গুলো স্কুলে পেয়ে থাকে। জৈবিক প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক কাজ-কর্ম গুলো তাদের সিলেবাসে থাকে। আমাদের শিক্ষাক্রমে এসব ব্যবহারিক শিক্ষা যুক্ত করা হয়েছে কিন্তু আমরা কি আমাদের অবকাঠামো গুলো উন্নত দেশগুলোর মতো করতে পেরেছি? সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। রান্না শেখানো হচ্ছে কিন্তু প্রত্যেক স্কুলে কি রান্না করার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ আছে? আমাদের দেশের প্রত্যেক স্কুলের অবকাঠামো ঠিক না করে ব্যবহারিক শিক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করা কি সম্ভব? নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের আগে আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আমাদের শিক্ষকদের এই বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। আমরা ক্লাসে ই-মেইল লেখা হুবহু মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে আসি কিন্তু ই-মেইল পাঠাতে পারি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব শিক্ষকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আমরা কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন ডিগ্রি অর্জন করে থাকি কিন্তু কাজ করতে গেলে পারি না। দক্ষতার চেয়ে আমরা ডিগ্রি অর্জনকেই গুরুত্ব দেই। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে ডিগ্রির অর্জনের চেয়ে আমরা দক্ষ হতে পারবো। বর্তমান শিক্ষাক্রমের দেশে পড়ালেখা করে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ক্রেডিট ট্রান্সফার করতে অসুবিধায় পড়তে হয়। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে সেই ঝামেলা থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি। সেজন্য শিক্ষাক্রমের সংস্কার একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত।
দশম শ্রেনীর আগে কোন পাবলিক পরীক্ষা থাকছে না। শ্রেনী শিক্ষকরা ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও বৃত্ত দ্বারা একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা মূল্যয়ন করবেন। যেখানে সর্বোচ্চ দক্ষ শিক্ষার্থীকে ত্রিভুজ এবং সর্বনিম্ন হলে চতুর্ভুজ দেওয়া হবে। চতুর্ভুজ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উঠতে পারবে না। আগে জিপিএ-৫ এর জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্থ বিদ্যার অসুস্থ প্রতিযোগিতা হতো। ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক কাজে পারদর্শী না হয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লেগে থাকতো। এর জন্য গাইড বই এবং কোচিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়তো। এতে শিক্ষা ক্ষেত্রে কোচিং এবং গাইড বইয়ের বানিজ্য হতো। সরকার এই পদ্ধতি নিয়ে আসার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের কোচিং এবং গাইড বই থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা। বর্তমান শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীরা কি জিপিএ-৫ এর পরিবর্তে ত্রিভুজ পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠবে না এর গ্যারান্টি কোথায়? যেহেতু শ্রেণি শিক্ষকরাই চুড়ান্ত মূল্যায়ন করবেন সেক্ষেত্র স্বজনপ্রীতি মূলক মূল্যায়ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু চুড়ান্ত মূল্যায়ন শিক্ষক করবেন সেজন্য বেশি নাম্বার পাওয়ার আশায় শ্রেনী শিক্ষকের কাছে কোচিং এবং প্রাইভেটের দিকে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকে পড়তে পারে। শিক্ষার্থীদের সঠিক মূল্যায়ন ব্যহত হতে পারে এবং মূল্যায়নে অনিয়ম ও দূর্নীতি বাড়তে পারে। অভিভাবকদের মাঝে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের এস্যাইনমেন্ট এবং গ্রুপের কাজ দেওয়া হচ্ছে ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেরা না করে ইন্টারনেট থেকে হুবহু কপি করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইন্টারনেট এবং ডিভাইস আসক্তি বাড়ছে। বিভিন্ন প্রকার ব্যবহারিক কাজের উপকরণ কিনতে অভিভাবকরা হিমশিম খাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও মফস্বলের শিক্ষার্থীরা ঝড়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। এ সকল বাড়ির কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের পরিবারের উপর শিক্ষার ব্যয় বহন করার চাপ না পড়ে। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার ধরণ নিয়ে অভিভাবকদের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে (এটিএন বাংলা) এক অভিভাবক অভিযোগ করেন যে, ধর্ম শিক্ষায় একজন শিক্ষার্থী কে নাটক করানো হচ্ছে। ধর্ম শিক্ষায় কুরআন হাদিসের আলোকে না শিখিয়ে নাটকের মধ্যে দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে ধর্ম শিক্ষা দেওয়াটা বেকামি। তারা অভিযোগ করেন এই শিক্ষাক্রমের ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বিমুখতা বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার ধরন সম্পর্কে আগের রাতে জানতে পারতেছে ফলে অভিভাবকদের মধ্যে একধরনের উৎকন্ঠা তৈরি হয়েছে।
এসএসসির পূর্ব পর্যন্ত গ্রুপ বিভাজন না থাকায় একজন শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ে পড়তে হবে। এটি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ভাল হলেও দূর্বল শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়ার আশংঙ্কা রয়েছে। একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে বিভাগ পছন্দ করলে ঐ পছন্দকৃত বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান নাও থাকতে পারে। গ্রামে অনেক স্কুল রয়েছে যেগুলোতে বিজ্ঞান এবং বানিজ্য বিভাগের শিক্ষক নেই। মফস্বলের বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষার গবেষনার এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে কারণ শিক্ষকরা যদি পঠিত বিষয়ে দক্ষ না হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের কি শিক্ষা দিবে?
উচ্চ শিক্ষার পরিবর্তন করতে হবে। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তন আনতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে ডিম ভাঁজি শিখিয়ে এনে মুখস্থ বিদ্যার উপর ভর্তি পরীক্ষা নিলে দিন শেষে গাইড বই এবং কোচিংয়ে দিকে শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। বিসিএসসহ সকল চাকুরি পরীক্ষার পরিবর্তন আনতে হবে। একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার নিজ বিভাগের পড়ার চেয়ে বিসিএস এর মুখস্থ বিদ্যার দিকে বেশি গুরত্ব দেয়। ফলে তারা নিজ বিভাগের পড়াশোনা সম্পর্কে ঘাটতি থেকে যায়। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার দক্ষতার উপর বিসিএসসহ সকল নিয়োগ পরীক্ষা নিতে হবে। তাহলে সবাই নিজ নিজ বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। কারিগরি শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। শিক্ষকদের নিয়োগে সচ্ছতা নিয়ে আসতে হবে। উচ্চশিক্ষাসহ সকল প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক এবং অসুদোপায়ে নিয়োগ বানিজ্য বন্ধ করতে হবে। উন্নত দেশের শিক্ষাক্রমের সাথে আমাদের দেশের শিক্ষকদের উন্নত দেশগুলোর মত সম্মান করতে হবে। শিক্ষকদের বেতন এবং সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে যেন জাতির মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকতার পেশাকে বেছে নেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেট বাড়াতে হবে। গবেষণার খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দেশে শিক্ষকতা পেশাকে সম্মান না দিয়ে, ভালো সম্মানী না দিয়ে, ভাল শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে শুধু শিক্ষাক্রম বদলালেই শিক্ষার মান ফিনল্যান্ডের মত করা সম্ভব নয়। শহরের পাশাপাশি গ্রামের শিক্ষার্থীরা যেন সমান সুযোগ সুবিধা পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবেই নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
