জিপিএর দৌড়ে হারিয়ে যাওয়া বাস্তব জ্ঞান

‘শিক্ষা’, এই শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বই, খাতা, পরীক্ষা, রেজাল্ট আর সেই বহুল প্রচলিত তিনটি অক্ষর, জিপিএ। যেন শিক্ষা বলতে এখন আর কিছু নেই, শুধু একটি সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে মানুষের মেধা, যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ। আমাদের সমাজে আজ এমন এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান, সৃজনশীলতা বা দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তার জিপিএ। এই সংখ্যার দৌড়ে ছুটতে ছুটতে আমরা হয়তো অজান্তেই হারিয়ে ফেলছি সেই বাস্তব জ্ঞান, যা মানুষকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত করে তোলে।
একটা সময় ছিল, যখন শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল নৈতিক, সচেতন, দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। কিন্তু এখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য যেন হয়ে গেছে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই একটি শিশুকে শেখানো হয়, ‘ভালো রেজাল্ট করতে হবে।’ কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তাকে বলা হয়, ‘ভালো মানুষ হতে হবে, কিছু শিখতে হবে, বুঝতে হবে।’ ফলে শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে সবাই দৌড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ ঠিক জানে না গন্তব্য কোথায়।
জিপিএর এই দৌড়ের শুরু হয় খুব ছোট বয়স থেকেই। ক্লাসের প্রথম হওয়া, বোর্ড পরীক্ষায় ভালো ফল করা; এসব যেন একজন শিক্ষার্থীর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মা, শিক্ষক, সমাজ- সবাই মিলে একটি চাপ তৈরি করে, যেখানে নম্বরই সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়। একজন শিক্ষার্থী যদি কেবল ৫.০০ পায়, তাহলেই সে মেধাবী; আর যদি একটু কম পায়, তাহলে সে সাধারণ বা ব্যর্থ। এই ধারণা ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে এমনভাবে ঢুকে যায় যে তারা নিজেরাও নিজেদের মূল্যায়ন করতে শুরু করে শুধুমাত্র একটি সংখ্যার মাধ্যমে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জিপিএ কি সত্যিই একজন মানুষের জ্ঞান বা দক্ষতার সঠিক মাপকাঠি? একটি তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় দেওয়া কিছু লিখিত উত্তরের ভিত্তিতে কি একজন মানুষের পুরো বছরের শেখা, তার বোঝাপড়া, তার চিন্তাশক্তি সবকিছু বিচার করা সম্ভব? বাস্তবতা হলো, সম্ভব নয়। কারণ বাস্তব জ্ঞান শুধু বই পড়ে অর্জন করা যায় না; এটি আসে অভিজ্ঞতা থেকে, প্রশ্ন করার সাহস থেকে, ব্যর্থতা থেকে শেখার মানসিকতা থেকে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থ করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা বইয়ের লাইন মুখস্থ করে, গাইডবইয়ের উত্তর পড়ে, কোচিং সেন্টারের সাজানো প্রশ্ন-উত্তর শিখে। তারা জানে কি লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে। কিন্তু তারা খুব কমই জানে, কেন সেই উত্তরটি সঠিক, বা এর বাস্তব প্রয়োগ কী। ফলে পরীক্ষার পর সেই জ্ঞান খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। যাকে আমরা বলি ‘Exam-oriented learning।’ এই শেখার পদ্ধতিতে জ্ঞান স্থায়ী হয় না, বরং এটি একটি সাময়িক প্রস্তুতি, যা শুধুমাত্র পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
এই পরিস্থিতির একটি বড় প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার উপর। যখন একজন শিক্ষার্থী জানে যে পরীক্ষায় নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন আসবে এবং নির্দিষ্ট কিছু উত্তর লিখলেই ভালো নম্বর পাওয়া যাবে, তখন সে নতুন করে ভাবার, ভিন্নভাবে চিন্তা করার বা নিজস্ব মত প্রকাশ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ‘ঠিকভাবে লিখতে পারলাম কিনা’, ‘স্যারের নোটের সাথে মিললো কিনা।’ ফলে ধীরে ধীরে তার সৃজনশীলতা সংকুচিত হয়ে আসে, এবং সে হয়ে ওঠে একটি মেশিন, যে শুধু ইনপুট নেয় এবং আউটপুট দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জিপিএ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো গণিতে বা বিজ্ঞানে চমৎকার ফল করছে, কিন্তু সে যদি বাস্তব জীবনে একটি সমস্যার সমাধান করতে না পারে, তাহলে সেই ফলাফলের মূল্য কতটুকু? ধরা যাক একজন শিক্ষার্থী ব্যবসা বিষয়ে উচ্চ জিপিএ পেয়েছে, কিন্তু সে যদি একটি সাধারণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে তার শিক্ষার কার্যকারিতা কোথায়? বাস্তব জীবন শুধু তত্ত্ব দিয়ে চলে না; এখানে প্রয়োজন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা; যেগুলো GPA দিয়ে মাপা যায় না।
এই সমস্যার পেছনে শুধু অভিভাবকরা নন, আমাদের পুরো সমাজই দায়ী। আমরা নিজেরাই এমন একটি মানসিকতা তৈরি করেছি, যেখানে একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণ করা হয় তার রেজাল্ট দিয়ে। চাকরির ক্ষেত্রে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে- সব জায়গায় জিপিএ একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে এই দৌড়ে নামছে, কারণ তারা জানে এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়লে তারা অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
বাবা-মায়ের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা চাপিয়ে দেন। তারা চান তাদের সন্তান সব বিষয়ে সেরা হোক, সব পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাক। কিন্তু তারা অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে প্রতিটি শিশুর শেখার ধরন আলাদা, আগ্রহ আলাদা, দক্ষতা আলাদা। কেউ হয়তো একাডেমিক পড়াশোনায় খুব ভালো, আবার কেউ হয়তো সৃজনশীল কাজে বা প্রযুক্তিতে বেশি দক্ষ। কিন্তু জিপিএ কেন্দ্রিক এই সমাজে সেই ভিন্নতাগুলোকে খুব কমই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকরা নিজেরাও পরীক্ষামুখী শিক্ষা পদ্ধতিকে উৎসাহিত করেন। তারা শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ’, ‘এই উত্তরটা ভালো করে মুখস্থ করো।’ ফলে শিক্ষার্থীরাও বুঝে যায়, শেখার চেয়ে পরীক্ষায় ভালো করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ একজন শিক্ষকের কাজ শুধু পড়ানো নয়; তিনি একজন পথপ্রদর্শক, যিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখাবেন, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করবেন, নতুন কিছু জানতে আগ্রহী করে তুলবেন।
জিপিএর এই দৌড়ের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ‘মানসিক চাপ’। প্রতিনিয়ত ভালো ফল করার চাপ, অন্যদের সাথে তুলনা, ব্যর্থতার ভয়- এসব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তারা মনে করে, যদি ভালো ফল না করতে পারে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই ভয় তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা হতাশায় ডুবে যায়। শিক্ষা যেখানে আনন্দের হওয়ার কথা, সেখানে এটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে একটি চাপের উৎস।
তবে এর মানে এই নয় যে, জিপিজএ একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এটি একটি সূচক, যা একজন শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট কিছু দক্ষতা বা পরিশ্রমের প্রতিফলন হতে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন এটিকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়। জিপিএর পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীর অন্যান্য গুণাবলী; যেমন নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সামাজিক সচেতনতা- এসবকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তাহলে প্রশ্ন উঠে, এই সমস্যার সমাধান কী? প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী করতে হবে। শুধু তত্ত্বভিত্তিক শিক্ষা নয়, বরং ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রজেক্টভিত্তিক কাজ, দলগত কার্যক্রম- এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষার উপর নির্ভর না করে, শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়া, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতাকে মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, বাবা-মা এবং সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, একটি সংখ্যা একজন মানুষের পুরো যোগ্যতা নির্ধারণ করতে পারে না। আমাদের সন্তানদের শুধু ভালো রেজাল্ট করার জন্য নয়, ভালো মানুষ হওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। তাদের আগ্রহ, দক্ষতা এবং স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেও একটি পরিবর্তন আসা প্রয়োজন। তাদের বুঝতে হবে, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য। GPA গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তুমি কী শিখছো, কীভাবে শিখছো এবং সেই জ্ঞান দিয়ে তুমি কী করতে পারছো।
আমরা যদি এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনই ভাবতে না শুরু করি, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আমরা এমন একটি প্রজন্ম পাবো, যারা পরীক্ষায় খুব ভালো, কিন্তু বাস্তব জীবনে অপ্রস্তুত। যারা মুখস্থ জানে, কিন্তু বুঝতে জানে না; যারা নম্বর পেতে পারে, কিন্তু সমস্যা সমাধান করতে পারে না। তাই এখনই সময় জিপিএর এই অন্ধ দৌড় থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার প্রকৃত অর্থকে নতুন করে ভাবার। কারণ শিক্ষা যদি মানুষ গড়ার জন্য না হয়, তাহলে সেই শিক্ষা কেবল একটি সংখ্যার খেলায় পরিণত হয়, যেখানে জ্ঞান হারিয়ে যায়, আর থেকে যায় শুধু জিপিএ।

